খুলনা মহানগর রেলওয়ে মার্কেটের পাশে নির্জন এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে প্রাচীন ভবন। যার চারপাশে গাছপালা, বনজঙ্গল ও নীরবতা। ভিতরে প্রবেশ করলেই অজান্তেই ছুঁয়ে যায় অতীতের গল্প সঙ্গে হালকা ভয়ের অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে শরীরে। এটি খুলনার ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। খুলনার প্রথম পাকা দালান চার্লির কুঠি বাড়ি। নগরায়নের প্রারম্ভের সাক্ষী হিসেবে বিবেচিতও বটে। তবে সংরক্ষণের অভাবে প্রায় আড়াই শতাব্দী পুরানো এই দালানটি আজ বিলুপ্তের পথে। তবে ইতিহাসবিদরা মনে করছেন, দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে এটি হারিয়ে যাবে প্রাচীন এই স্থাপনাটি।
ইতিহাসবিদদের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭৯৫ সালে ব্রিটিশ নীলকর বন্ড যশোরের রূপিয়াতে প্রথম নীল কারখানা স্থাপন করেন। এরপর ১৮০১ সালে খুলনার দৌলতপুরে নীলকর এন্ডারসন প্রথম নীলকুঠি স্থাপন করেন। ১৮৪১ থেকে ১৮৪৬ সালের মধ্যে শহরের কেন্দ্রস্থলে রেলওয়ে হাসপাতাল রোডে নির্মিত হয় চার্লির কুঠি বাড়ি। এটি খুলনার নগরায়নের প্রারম্ভের সাক্ষী হিসেবে বিবেচিত।
জানা গেছে, দোতলা বাংলো ধাঁচের এই কুঠি বাড়ির নির্মাণে ব্যবহার করা হয়েছে ইট, বালু, চুন-সুরকি, লোহার খাম্বা ও কাঠের পাটাতন। ছাদের ওপর টালির পরতে মাটির ঢালাই এবং নিচে হার্ডবোর্ড। নিচতলায় চারটি এবং ওপর তলায় তিনটি কক্ষ রয়েছে। সামনে প্রশস্ত বারান্দা, যেখানে কাঠ ও লোহার রেলিং প্রাচীন সৌন্দর্যের নিদর্শন বহন করছে। তবে দীর্ঘদিনের অবহেলায় দুটি সিঁড়ি ভেঙে পড়েছে। দোতলার কাঠের মেঝও ঝুঁকিপূর্ণ।
এ সম্পর্কে প্রক্তন অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, চার্লির কুঠি বাড়ি যেহেতু খুলনার প্রথম পাকা দালান। তাই এর বিশেষ ঐতিহাসিক গুরুত্ব রয়েছে। ইংরেজরা নীল চাষের নামে যে অত্যাচার করতো, তা এখান থেকেই হতো। পরবর্তী সময়ে এটি রেলের গুরুত্বপূর্ণ ভবন হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে। এই সব ঐতিহাসিক গুরুত্বকে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
তিনি আরও বলেন, ১৮৮৪ সালে কলকাতা থেকে খুলনা পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত হওয়ার পর এই বাড়িটি ইন্ডিয়ান জেনারেল নেভিগেশনের অ্যান্ড রেলওয়ে কোম্পানির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হত। ভারত বিভক্তির পর এটি নেভিগেশনের কার্যালয় হিসেবে চালু থাকলেও, এখন এটি খুলনার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী সালাউদ্দিন ও বিপ্লব হোসেন জানান, বর্তমানে কুঠি বাড়ির ভেতর-বাহিরে স্থায়ী দোকানঘর ও বসতবাড়ি গড়ে ওঠায় মূল স্থাপত্যের অনেকটাই ধ্বংসপ্রাপ্ত। বর্ষায় ছাদ ও দেয়াল আরও ভঙ্গুর হয়। কাঠের মেঝ ও সিঁড়ির ক্ষয় দিনে দিনে বাড়ছে।
বিষয়টি নিয়ে খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, বাবা-দাদা আমাদের জানিয়েছেন এটাই শহরের শুরুর নিদর্শন। কারণ চার্লির কুঠি বাড়ি কেবল পুরানো ইট ও কাঠ নয়। এটি খুলনার নগর গঠনের প্রাথমিক ধাপ এবং সামাজিক ইতিহাসের দৃষ্টান্ত। শহরের পরিচয় রক্ষা, পর্যটন বিকাশ ও শিক্ষামূলক প্রয়োজনে দ্রুত ও কার্যকরী সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ না হলে এটি কেবল স্মৃতির পাতায় সীমিত হয়ে যাবে। তাই এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নতুন প্রজন্মকে জানানো প্রয়োজন। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উচিত দ্রুত এটিকে তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে আসা।
এ ব্যাপারে খুলনা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর আঞ্চলিক পরিচালক লাভলী ইয়াসমিন বলেন, চার্লির কুঠি বাড়িটি আপাতত সংরক্ষণের কোন পরিকল্পনা নেয়। তবে পরিদর্শন করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।