মামদানির জয় এবং তারপর  

আমেরিকার একটি শহর নিউ ইয়র্ক। এই শহরের মেয়র নির্বাচন সারা বিশ্বে যেন আলোচনার ঝড় তুলেছে। মেয়র হিসেবে যিনি বিজয়ী হয়েছেন, তাকে নিয়েও চলছে তোলপাড়। খোদ মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন নিয়ে মন্তব্য করছেন, ক্ষোভ ঝাড়ছেন, এমনকি মেয়র হিসেবে জোহরান মামদানির বিজয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। মামদানি যে পার্টির সদস্য, সেই পার্টির নাম ডেমোক্রেটিক। ১৮২৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই পার্টির প্রতীক হলো ‘গাধা’। নিউ ইয়র্কের ১১১তম মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন মামদানি। আমেরিকা একটি নিয়মিত নির্বাচনের দেশ। এবারের নির্বাচনের আগে অর্থাৎ ১১০তম মেয়রও ছিলেন একজন ডেমোক্র্যাট। তাহলে এই নির্বাচন এবং মামদানিকে নিয়ে এত উত্তেজনা, বিতর্ক এবং সারা বিশ্বের আগ্রহ কেন? নির্বাচন নিয়ে এই আলোড়ন সৃষ্টির কারণ জোহরান মামদানির ঘোষণা করেছেন যে, তিনি একজন ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্ট। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তার নির্বাচনী বক্তব্য এবং পরিচয়। যদিও পরিকল্পিতভাবে তার ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনা হচ্ছে, কিন্তু এটা তার নির্বাচিত হওয়ার কারণ নয়। সমাজতন্ত্রের প্রতি তার সমর্থন, গাজা এবং ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়ানো, নগরবাসীর সংকট সমাধানে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা এবং ধনীদের ওপর ট্যাক্স বাড়ানোর ঘোষণাকে কিছুটা আড়াল করতেই ধর্মীয় পরিচয় সামনে আনা হচ্ছে।  নিউ ইয়র্কে মুসলিম জনগোষ্ঠী মাত্র ৯ শতাংশ এবং তারা বহুধা বিভক্ত। ফলে শুধু তাদের ভোটের ওপর নির্ভর করে কোনো প্রার্থীর জিতে আসা অসম্ভব। মামদানি ভোট পেয়েছেন ৫৪ শতাংশ এবং তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী পেয়েছেন ৪১ শতাংশ। 

তার মা প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রপরিচালক মীরা নায়ার। জোহরান মামদানির জন্ম উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায়, ১৯৯১ সালের ১৮ অক্টোবর। সদ্য ৩৪ বছরে পা দেওয়া এই রাজনীতিকের বাবা মাহমুদ মামদানি ভারতে জন্ম নেওয়া একজন উগান্ডান শিক্ষাবিদ। তার স্ত্রী রামা দুওয়াজি একজন শিল্পী, গ্রাফিক আর্টস ডিজাইনার।  মামদানির ৭ বছর বয়সে তার বাবা-মা আমেরিকায় স্থায়ী হন। এটুকু জানা থাকলে, মামদানির সম্পর্কে সব জানা হয় না। মামদানির কাজই তাকে নাগরিকদের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। সে কারণেই ১৯৬৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হওয়া মেয়র তিনি। জোহরান মামদানির প্রাপ্ত ভোট ১০ লাখ ৩৩ হাজার ৪৭১। মামদানি নিউ ইয়র্কের প্রায় সব জাতিগত গোষ্ঠীর ভোট পেয়েছেন। শে^তাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, লাতিনো, এশীয় ও অন্যান্য জনগোষ্ঠীর ভোটারদের বড় অংশ তাকে বেছে নিয়েছেন। অপেক্ষাকৃত তরুণদের ভোট বেশি পেয়েছেন তিনি। ৪৫ বছরের নিচের ভোটারদের মধ্যে তার জনপ্রিয়তা ছিল বিপুল। প্রতিদ্বন্দ্বী কুয়োমোর চেয়ে ৪৩ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বে ভোটারদের মধ্যে কুয়োমো ১০ পয়েন্টে এগিয়ে ছিলেন। মামদানির ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান নির্বাচন জুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। তার মুসলিম পরিচয় ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান নিয়ে বিরূপ প্রচার চালানো হলেও, শেষ পর্যন্ত ভোটাররা তাকেই সমর্থন দেন। দেখা যাচ্ছে, ইহুদি ভোটারদের ৩১% ভোট এবং তরুণ ইহুদিদের ৪৪ শতাংশ ভোট পান মামদানি। ইসরায়েলের ভূমিকা যে তরুণদের কাছেও গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না, নির্বাচনে সেটাও দেখা গেল। ফলে মুসলিম, আফ্রিকান, ইন্ডিয়ান ইত্যাদি পরিচয়ের চেয়েও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে তার বক্তব্য ও দৃষ্টিভঙ্গি।  

উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলে অবস্থিত নিউ ইয়র্ক শহর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ  মহানগরের একটি। শহরটি প্রশাসনিকভাবে পাঁচটি প্রশাসনিক অঞ্চলে বিভক্ত,  প্রায় ৮৬ লাখ  লোকের এই শহরের নাগরিকরা নিজেদের নিউ ইয়র্কার বলতেও পছন্দ করে। আমেরিকার সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর নিউ ইয়র্ক। পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশ বা অঞ্চলের মানুষ এখানে তাদের ভবিষ্যৎ গড়তে বসবাস করে। এই শহরের প্রায় ৩৬% অধিবাসীই আমেরিকায় জন্মগ্রহণ করেনি। বহু ভাষা, নানা সংস্কৃতি, নানা বর্ণের ও বহু ধর্মের মানুষ নিয়ে নিউ ইয়র্ক সত্যিই এক বিশ্বনগরী। বলা হয়, এখানে তেল আবিবের চেয়েও বেশি ইহুদি, ডাবলিনের আইরিশ, নাপোলির চেয়েও বেশি ইতালীয় আর সান হুয়ানের চেয়েও বেশি পুয়ের্তোরিকান মানুষ আছে। ধর্ম পালনের দিক থেকে উদার এই নগরের মানুষদের মধ্যে লাতিনো খ্রিস্টান ক্যাথলিক, কৃষ্ণাঙ্গ খ্রিস্টান  প্রোটেস্টান্ট, ইহুদি ও মুসলিমরা সবচেয়ে বড় ধর্মভিত্তিক সম্প্রদায়। গত দুশত বছরের ইতিহাসে নিউ ইয়র্ক মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে সম্পদশালী শহর। শহরটি একসময় নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের রাজধানী, এমনকি সমগ্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেরও রাজধানী ছিল। এখনো নিউ ইয়র্ক শহর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শিক্ষা  কেন্দ্রগুলোর একটি। বিশ্বব্যাপী নিউ ইয়র্ক শহরের রাজনীতি, গণমাধ্যম, বিনোদন ও পোশাকশৈলীর প্রভাব বিশেষ উল্লেখযোগ্য। জাতিসংঘের সদর দপ্তর এখানে, একে তাই আন্তর্জাতিক কূটনীতির কেন্দ্র বলা হয়। নিউ ইয়র্ক শহরের বেশির ভাগ মানুষ গণপরিবহন ব্যবস্থা ব্যবহার করে। নিউ ইয়র্ক সিটি সাবওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম দ্রুতগামী গণপরিবহন ব্যবস্থা।  ৪৭২টি স্টেশন নিয়ে গঠিত এই পাতাল রেল হাডসন নদীর তলদেশ দিয়ে  প্রায় আড়াই কিলোমিটার দীর্ঘ টানেলের মাধ্যমে নিউ জার্সি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সংযুক্ত। বাস এবং সাবওয়ে শ্রমজীবীদের জন্য যেন সাশ্রয়ী থাকে,  সেটাই ছিল তার প্রচারণার প্রধান দিক। মামদানির নির্বাচনী প্রচারে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ব্যয়বহুল শহরের ভোটাররা চায়- সরকার নাগরিকদের ব্যয় সাশ্রয়ের ওপর গুরুত্ব দিক। তার বক্তব্য ছিল, নিউ ইয়র্ক এমন একটি শহর, যেখানে চারজনের মধ্যে একজন দারিদ্র্যের সঙ্গে বসবাস করছে। এটি  এমন একটি শহর, যেখানে প্রতি রাতে পাঁচ লাখ শিশু ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমায়। বিশাল বৈভবের আড়ালে, বৈষম্যের বেদনাদায়ক চিত্র তুলে ধরেছেন তিনি। বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ‘এটি এমন একটি শহর, যা নিজের সেসব বৈশিষ্ট্য হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে, যেগুলো একসময় এটিকে বিশেষ করে তুলেছিল।’ এর প্রেক্ষিতে নির্বাচন সামনে রেখে তার প্রস্তাবনাগুলো ছিল নিউ ইয়র্ক শহর জুড়ে বিনামূল্যে নাগরিকদের জন্য বাস পরিষেবা। শহরের বাড়িভাড়া স্থির রাখা এবং ভাড়াটিয়াদের স্বাচ্ছ্যন্দের প্রতি অবহেলা করা বাড়িওয়ালাদের জবাবদিহির ব্যবস্থা করা। খাদ্যসহ পণ্যসামগ্রীর সাশ্রয়ী মূল্যের ওপর জোর দিয়ে শহরের নিজস্ব মুদি দোকানের চেইন সৃষ্টি করা। ছয় সপ্তাহ থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য সারা শহরে বিনামূল্যে চাইল্ড কেয়ার প্রতিষ্ঠা। শ্রমজীবী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী বাসস্থানের সংখ্যা তিন গুণ বাড়ানো। এ ছাড়া শ্রমিকদের মজুরি ঘণ্টায় ৩০ ডলার করার কথা তিনি বলেছেন। মামদানি মেয়র হিসেবে কতদূর সফল হবেন বা তার প্রতিশ্রুতি কতদূর রাখতে পারবেন, সেটা নিয়ে বেশ সন্দেহ আছে। কিন্তু বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের  কেন্দ্রে নিউ ইয়র্কের নির্বাচনে যে ইশতেহার দিয়ে মামদানি নির্বাচন করেছেন ও নির্বাচিত হলেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফ্রি বাস সার্ভিস, বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ, ধনীদের ওপর ট্যাক্স বাড়ানো, শ্রমিকদের মর্যাদা দেওয়া ও মজুরি ন্যায্য করার যে দাবি, মামদানি তুলে এনেছেন তা পুঁজিবাদের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক শুধু নয়, বিরোধীও। এসব নয়া উদারনীতিবাদের বিরোধী, ফলে  ট্রাম্প বিক্ষুব্ধ ও আতঙ্কিত হয়ে মামদানিকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে গালি দিয়েছে। 

বিরাট বিরাট হাউজিং প্রকল্প, বিশাল অ্যাপার্টমেন্টে অসংখ্য ফ্ল্যাট তৈরি করছে পুঁজিপতিরা। কিন্তু কিনবে যারা, সেই নাগরিকদের এত টাকা কোথায়? ফলে এগিয়ে এলো ব্যাংক। তারা স্বপ্ন দেখায়, চাহিদা তৈরি করে। তোমার কি একটা বাড়ি হবে না? নিজের বাড়ি, নিজের গাড়ি না থাকলে জীবনের কী মূল্য? সাধারণ মানুষ বলে, সেটা তো ঠিক। কিন্তু নুন আনতে পান্তা ফুরায়, এমন অবস্থা আমাদের। বাড়ি-গাড়ি তো অনেক দূরের স্বপ্ন। ব্যাংক বলে, সেই দূরের স্বপ্নকে কাছে আনতেই আমরা তোমাদের পাশে। লোন নাও, বাড়ি কেনো, গাড়ি কেনো। এরপর বাড়ি হয়, গাড়ি হয়, জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু লোনের কিস্তি শোধ হয় না। আবার ঋণ শোধ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ির মালিকানাও পাওয়া যায় না। কাগজ থাকে ব্যাংকের কাছে। এখানে আবার আরেক সমস্যা। ঋণগ্রহীতা মরে গেলে কী হবে? ব্যাংকের কাছে কাগজের কী মূল্য, যদি কিস্তির টাকা না আসে। এই শোধ দিতে না পারা ঋণের কারণে, ২০০৭-০৮ সালে অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল।  বাড়ি আছে, ব্যাংকে বাড়ির দলিল আছে শুধু ঋণ শোধ দেওয়ার টাকা নেই মানুষের হাতে। ফলে দেউলিয়া হয়ে গিয়েছিল অনেক ব্যাংক। এক মহামন্দার কবলে পড়েছিল আমেরিকা। 

পুঁজিবাদী দর্শন বলে শ্রমিকরা কাজ করে না। তারা অদক্ষ, উৎপাদনশীলতা কম, টাকা উড়ায়, যা পায় তাই খেয়ে শেষ করে ফেলে।  সঞ্চয় করে না, তাই গরিব। অর্থাৎ সে গরিব, তার নিজের দোষে। এই গরিবদের খাদ্য, চিকিৎসা, বাসস্থানে সহায়তা দিলে তারা আরও অলস হয়ে পড়বে। ধনীরা কারখানা করে, ব্যবসা করে, ব্যাংকের মালিক তারাই দেশ চালায়। এদের ওপর ট্যাক্স বসালে, তারা সমস্যায় পড়বে আর অর্থনীতি দুর্বল হবে। ফলে এদের সহায়তা কর, সুবিধা দাও। পুঁজিবাদ এবং নয়া উদারনীতিবাদের এই নীতিতে আমেরিকার অর্থনীতি চলে। প্রকারান্তরে ধনী আরও ধনী হয়, শ্রমিক এবং স্বল্প আয়ের মানুষ আরও কষ্টে পড়ে। মামদানি উদারনীতির এই দর্শনে, একটা ধাক্কা দিয়েছেন। যদিও মামদানির কে নো কথা নতুন না। আমেরিকার সমাজতন্ত্রীরা এই কথা বলছে। ২০০৮ সালের মন্দা, ২০২০ সালের করোনা এবং ২০২২ সালের ইউক্রেন- রাশিয়া যুদ্ধের ফলে এখন কথার সত্যিকারের তাৎপর্য নিউ ইয়র্কবাসী তাদের জীবন দিয়ে বুঝতে পেরেছে। ফলে মামদানির কথা তারা গ্রহণ করেছে। এর সঙ্গে আর একটি বিষয় কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মামদানি বিভিন্ন সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সম্মান দিয়েছেন। এই নির্বাচনে সমাজতন্ত্রের কথা যেভাবে উচ্চারিত হয়েছে, তা আমেরিকার শাসকগোষ্ঠী এত সহজে ভুলে যাবে না। ফলে পদে পদে বিরোধিতা মোকাবিলা করেই মামদানিকে পথ চলতে হবে। এ বিজয়ের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে নাগরিকদের আকাক্সক্ষা। এখন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতর থেকে, মামদানি কতদূর তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন সেটাই দেখবে বিশ্ব।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

rratan.spb@gmail.com