সিলেটের সীমান্তবর্তী তিনটি উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর নিয়ে গঠিত সিলেট-৪ নির্বাচনী আসন। এ আসনে বিএনপি এখনো দলের প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী গত বুধবার রাতে গণমাধ্যমের কাছে দাবি করেন, দলের পক্ষ থেকে তাকে প্রার্থী মনোনীত করা হয়েছে। যদিও গতকাল শনিবার পর্যন্ত এ ব্যাপারে কেন্দ্রীয় বিএনপি কোনো ঘোষণা দেয়নি। কিন্তু দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই গত শুক্রবার থেকে সিলেট-৪ নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণায় নেমেছেন আরিফ। নিজেকে দল ‘মনোনীত প্রার্থী’ দাবি করে আরিফের এই প্রচারণায় ওই আসনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশায় দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা ৭-৮ জন প্রার্থী ও তাদের সমর্থকরা ক্ষুব্ধ। বিশেষ করে গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের একাধিকবারের চেয়ারম্যান, সিলেট জেলা বিএনপির উপদেষ্টা আবদুল হাকিম চৌধুরীর অনুসারীরা গত বৃহস্পতিবার রাতে নির্বাচনী এলাকার বিভিন্ন স্থানে মিছিল করেছেন। তারা ‘মানি না মানবো না, স্থানীয় ছাড়া মানবো না, হাকিম ছাড়া মানবো না’ ইত্যাদি সেøাগান দেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী হিসেবে আরও রয়েছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, সিলেট মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা সামসুজ্জামান জামান প্রমুখ। সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে শক্ত অবস্থানে থাকা এসব প্রার্থীদের মধ্যে শুধু হাকিম চৌধুরীর বাড়ি ওই নির্বাচনী এলাকায়। অন্যরা এই নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দা নন। যে কারণে নির্বাচনী এলাকায় তারা ‘অতিথি প্রার্থী’ হিসেবে পরিচিত। তবে আরিফুল হক চৌধুরী নিজেই নিজেকে দলের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়াটাকে তারা কেউই মেনে নিতে পারছেন না। প্রত্যেকেই বলছেন, ‘উনি (আরিফ) যেটা করছেন তা দলের চেইন অব কমান্ডে পড়ে না। দলের একটা সিস্টেম আছে। সে অনুযায়ী দলের হাইকমান্ড প্রার্থী ঘোষণা করবে।’ মনোনয়নপ্রত্যাশী সব প্রার্থীই বলছেন, এ ব্যাপারে কেন্দ্র থেকে তাদের কিছুই জানানো হয়নি। তাই মনোনয়ন প্রত্যাশায় তারা গণসংযোগসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন।
সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট-১ (নগর ও সদর উপজেলা) আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমাকে হয় সিলেট-১ আসনে প্রার্থী দিতে হবে অথবা আগামী সিটি নির্বাচনে মেয়র পদের প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। না হলে দলকে আসসালামু আলাইকুম (বিদায় অর্থে) বলে দেব।’ কিন্তু বিএনপি সিলেট-১ আসনে মনোনয়ন দিয়েছে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরকে। মনোনয়ন না পেয়ে পরদিনই ঢাকায় ছুটে যান আরিফুল হক চৌধুরী। ঢাকায় অবস্থান করেই মোবাইল ফোনে একাধিক গণমাধ্যমের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ‘বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করেছেন। দুদিন ঢাকায় অবস্থান করে সিলেটে ফিরে তিনি নির্বাচনী প্রচারণাও শুরু করেছেন।
এদিকে আরিফুল মনোনয়ন পাচ্ছেন এমন খবরে বৃহস্পতিবার রাতে কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে আবদুল হাকিম চৌধুরীর অনুসারীরা তাৎক্ষণিক মিছিল-সমাবেশ করেন। তারা স্থানীয় প্রার্থী হাকিম চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়ার জন্য দলের হাইকমান্ডের প্রতি দাবি জানায়।
দলীয় সূত্র জানায়, আবদুল হাকিম চৌধুরী স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত তিনি গোয়াইনঘাট উপজেলার নন্দিরগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন। পরে তিনি দুই দফা গোয়াইনঘাট উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। সবশেষ উপজেলা নির্বাচনে তিনি দলের সিদ্ধান্ত মেনে আর প্রার্থী হননি। হাকিম চৌধুরী গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক ছিলেন। পরে তিনি উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি জেলা বিএনপির উপদেষ্টা।
গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুব আলম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আবদুল হাকিম চৌধুরী জনপ্রতিনিধি হিসেবে এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। দলেরও একজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষ। এই নির্বাচনী এলাকার মানুষ এবার তাকেই প্রার্থী হিসেবে চায়।’
মনোয়নপ্রত্যাশী আবদুল হাকিম চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি দলের সিদ্ধান্তের প্রতি সবসময়ই শ্রদ্ধাশীল। দল যে সিদ্ধান্ত দেবে তা মেনে নেব। তবে এবার এই নির্বাচনী এলাকার নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা আমাকে প্রার্থী হিসেবে চাচ্ছে। গত কয়েক মাস আমি এলাকায় কাজ করে সাধারণ মানুষের ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। তারা আমাকে ভালোবাসায় আবদ্ধ করেছেন।’
প্রার্থিতা প্রসঙ্গে আরিফুল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক চেয়ারপারসন ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আমাকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হতে বলেছেন। আমি তাদের নির্দেশনা মতো কাজ করছি।’