প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর আধুনিক বিনোদনের ভিড়ে হারিয়ে যেতে বসেছে বাঙালির অন্যতম লোকজ শিল্প যাত্রাপালা। সেই হারিয়ে যাওয়া শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মকে ঐতিহ্যের স্বাদ দিতে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার পাকা ইউনিয়নের গালিমপুর এলাকায় জমিদারবাড়ি ‘গিরিশ ধাম’ প্রাঙ্গণে আয়োজন করা হয় ‘গৌরিমালা’ যাত্রাপালার। নিখাদ প্রেম, রাজা প্রজার সম্পর্ক ও অহংকার ভাঙার পাঠ এই কাহিনীভিত্তিক যাত্রাপালা এবছরও দর্শকদের ব্যাপক সাড়া পায়। স্থানীয় দিনমজুর, কৃষি শ্রমিক ও খেটে খাওয়া মানুষদের নিয়েই পরিবেশিত হয় পালাটি।
শনিবার (৮ নভেম্বর) উপজেলার পাঁকা ইউনিয়নের গালিমপুর এলাকায় জমিদারবাড়ি ‘গিরিশ ধাম’ প্রাঙ্গণে আরশাদ আলীর রচনা ও দেবাশীষ কুণ্ডুর নির্দেশনায় ‘বকুল স্মৃতি থিয়েটার’ এ মঞ্চায়ন করে। অনুষ্ঠানটি মহাবুবুর রহমান সার্বিক তত্বাবধানে গৌরিমালা যাত্রাপালা প্রধান অতিথি হিসেবে উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের (অবসরপ্রাপ্ত) অতিরিক্ত সচিব মলয় কুমার রায়।
স্থানীয়দের মতে, এটি শুধু বিনোদন নয়, শেকড়ের টান ফিরে পাওয়ার সুযোগ। তারা চান, প্রতিবছর এমন সুস্থ সাংস্কৃতিক আয়োজন হোক, যাতে যাত্রাশিল্পীরা আবারও পেশা হিসেবে এই শিল্পকে ধরে রাখতে পারেন। গালিমপুরের শতবর্ষী ‘গিরিশ নাট্যমন্দিরকে কেন্দ্র করে এর আগেও নাচ মহল, সিরাজউদ্দৌলা, টিপু সুলতান, সাগর ভাসা ও পরাজিত সম্রাটসহ বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী যাত্রাপালা মঞ্চস্থ হয়েছে। সেগুলোর সফলতার ধারাবাহিকতায় এবারের আয়োজনও ছিল নিখুঁত পরিপাটি উপস্থাপনা, শুদ্ধ সংলাপ ও নাচ-গানের সমন্বয়ে দর্শকদের মন জয় করে নেয়।
দুপুর থেকেই গালিমপুর এলাকায় শুরু হয় লোকজ উৎসবের আমেজ। খাবারের দোকান, খেলনা ও ছোটখাটো মেলা ঘিরে পুরোনো দিনের গ্রামের মতো পরিবেশ। সন্ধ্যার পর সুশৃঙ্খলভাবে পরিবার পরিজন নিয়ে উপভোগ করতে ভিড় করেন দূরদূরান্ত থেকে আসা শতশত দর্শক।
উপজেলার জিগরী এলাকা থেকে আসা দর্শক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, দেশ থেকে এ ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হারিয়ে গেছে। মা বোন এক জায়গায় বসে এ অনুষ্ঠান দেখছেন। এটা দেখে তার খুব ভাল লাগছে। আয়োজকদের এ ধরনের অনুষ্ঠান পরিচালনা করায় আয়োজকদের তিনি ধন্যবাদ জানান।
উপজেলার পাঁকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও স্থানীয় বাসিন্দা ইশিতারায় বলেন, ছোট বেলায় তারা যে যাত্রাপালা দেখতে পেতেন তা অশ্লীলতাই ভরপুর কালের বিবর্তনে তা হারিয়ে গেছে। সুশীল সমাজ, সাধারণ সব মানুষ, নারী-পুরুষ সবাই মিলে একসঙ্গে যাত্রাপালা দেখছে তার মনে হয় এটা তার দেশের সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে বিশ্বের কাছে একটা অনন্য বার্তা এনে দিয়েছে। একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য এটা একটা অনবদ্য আয়োজন। এতে করে সবাই একসক্সেগ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এবং গ্রাম বাংলার এ ঐতিহ্য আবার ফিরে আসছে এতে করে আমরা সুন্দর ও সাবলীল ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারছি। তিনি বকুল স্মৃতি থিয়েটারকে ধন্যবাদ জানান।
স্থানীয় খুদে শিল্পী অহেনিতা রায় বলেন, অনেক ভালো লেগেছে। বন্ধুদের সঙ্গে নাচ-গান করতে খুব মজা হয়েছে। অন্যান্য শিল্পীদের কণ্ঠেও ছিল আবেগ।
যাত্রাশিল্পীরা বলেন, তারা অনেক ছোট বেলা থেকে যাত্রাপালা করছেন অনেক জায়গায় কিন্তু এখানকার পরিবেশটা খুবই সুন্দর। শিল্পীরা তাদের কষ্টের কথাও বলেন, তারা এখন খুব কষ্টে আছেন। তদের আর কদর ও নাম না থাকায় অনেকে দিনমুজুরী করে, রিকসা চালিয়ে, হোটেলে কাজ করে জীবন চালাচ্ছেন। তাই সরকারের কাছে তাদের আবেদন, তারা যাত্রা শিল্পীরা আবারও পেশা হিসেবে যেনো এই শিল্পকে ধরে রাখতে পারেন।
গৌরিমালা যাত্রাপালার উদ্বোধক জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (অবসরপ্রাপ্ত) মলয় কুমার রায় বলেন, প্রতি বছরের মত এ বছরও ব্যত্যয় হয় নি। গ্রামীণ যাত্রাপালাকে টিকিয়ে রাখার জন্য এই উদ্যোগ সর্ব মহলের প্রশংসা কুড়িয়েছে এ যাবত পর্যন্ত। এ প্রয়াস আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় মাদকের যে করাল ছোবল সে করাল ছোবল থেকে সমাজকে রক্ষার জন্য এ আয়োজন। জনগণ এটাকে ভালোভাবে নেয়। দর্শকেরা এটা প্রাণভরে উপভোগ করে। সকল কলা কুশলী ও সদস্যদের তিনি ধন্যবাদ জানান।
অনুষ্ঠানটির সার্বিক তত্বাবধানের দায়িত্বে থাকা আয়োজক মহাবুবুর রহমান জানান, বকুরস্মৃতি থিয়েটার এর পক্ষথেকে এ যাত্রাপালার আয়োজন করা হয়েছে। ইতিপূর্বে দেখেছি যাত্রাপালায় যে অশ্লীলতা হয়, সেটার বিরুদ্ধে তাদের যুদ্ধ। যাত্রাপালা যে একটা সুস্থ সংস্কৃতি একটা শিল্প এটাকে তারা সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে চায়। অশ্লীলতা পরিহার করে এটাই তাদের যুদ্ধ। তারা এলাকার মানুষের কাছে দারুণ সাড়াও পান বলে তিনি জানান।