৭৮তম জন্মদিন

সৃষ্টি-কর্মে অনন্য হুমায়ূন আহমেদ

বাংলাদেশের শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল এক নক্ষত্রের নাম হুমায়ূন আহমেদ। দেশের গোটা একটি পাঠবিমুখ প্রজন্মকে বইয়ের প্রতি আগ্রহী করে তোলার দায়ভার তিনি তুলে নিয়েছিলেন নিজের কাঁধে, এবং মৃত্যুর আগে রেখে গেছেন নিজের লেখার এক বিশাল পাঠকগোষ্ঠী। এদেশের আনাচে-কানাচে খুঁজলে এমন অনেক মানুষেরই সন্ধান পাওয়া যাবে, যারা জীবনে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে শুধু একজনের বই-ই পড়েছেন। সেই একজনটিই হলেন হুমায়ূন আহমেদ। কিন্তু তিনি তো শুধু লেখক নন। তিনি নিজের পরিচয়কে কেবল কথাসাহিত্যিকের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখেননি। উপন্যাসের পাশাপাশি ছোটগল্প তো লিখেছেনই, সেইসঙ্গে আত্মপ্রকাশ করেছেন নাট্যকার, গীতিকার, চিত্রনাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও। বলতে দ্বিধা নেই, শিল্প-সংস্কৃতির যে অঙ্গনেই তিনি হাত দিয়েছেন, সেখানেই অনুমিতভাবে সাফল্য ছিনিয়ে এনেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের সিংহভাগ শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের যে সাংস্কৃতিক রুচিবোধ, সেটিও গঠন করে দিয়েছেন তিনিই।

আজ এই ধ্রুবতারার ৭৮তম জন্মদিন। প্রতিবছরই তার জন্মদিন ঘিরে নানা আয়োজন থাকে। তবে এবারের জন্মদিনটা একটু ব্যতিক্রম। এবার রাষ্ট্রীয়ভাবে আরও বড় পরিসরে পালন করছে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। বিষয়টি নিয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, ‘সেলিব্রেটিং বাংলাদেশি লেজেন্ডস’ সিরিজে এবার আমরা উদযাপন করব হুমায়ূন আহমেদকে, এই ১৩ নভেম্বর। আরও বড়, আরও বিস্তৃত আয়োজনে হবে এবারের পর্ব। গান হবে, ছবি দেখানো হবে, আলাপ হবে। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ছাড়াও বর্ণাঢ্য নানা আয়োজনে সবাইকে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানান তিনি।

শোবিজ অঙ্গনেও অন্যরকম এক উদাহরণ হয়ে থাকবেন হুমায়ূন আহমেদ। তিনি নির্মাণের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন নাটক ও চলচ্চিত্র দুই ক্ষেত্রেই। টিভি নাটক নির্মাণ করে যেমন তুমুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন তেমনি সিনেমাতেও তৈরি করেন নতুন ধারা। মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেও লুফে নিয়েছেন বেশ কয়েকটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। দেশের বাণিজ্যিক ঘরানার সিনেমার মতো হুমায়ূন আহমেদের সিনেমা মুক্তি পেলে প্রেক্ষাগৃহে উপচেপড়া ভিড় দেখা যেত। তার নির্মিত সিনেমার বিভিন্ন ডায়ালগ ও গান মানুষের মুখে মুখে ফিরত। তার সিনেমার গান আজও মানুষের হৃদয়ে গেঁথে আছে। ১৯৭২ সালে ‘নন্দিত নরকে’ উপন্যাসের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে আত্মপ্রকাশ ঘটে হুমায়ূন আহমেদের। বাংলা সাহিত্যকে হিমু, মিসির আলিসহ অসংখ্য চরিত্র উপহার দিয়েছেন তিনি। লেখক হিসেবে যাত্রা শুরু করলেও শুধু বইয়ের জগতে সীমাবদ্ধ ছিলেন না তিনি।

চিত্রনাট্যকার, গীতিকার ও চলচ্চিত্রকার হিসেবেও সুনাম ছিল হুমায়ূনের। সাতবার বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতে নিয়েছিলেন। ‘আগুনের পরশমণি’ দিয়ে চিত্রপরিচালক হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে হুমায়ূন আহমেদের। সিনেমাটি তার একই নামের উপন্যাস থেকে নির্মিত। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি। সিনেমাটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের পাকসেনাদের নৃশংসতা, মুক্তিবাহিনীর গেরিলা অপারেশন, সাধারণ মানুষের আতঙ্ক সবকিছু উঠে এসেছে। ১৯৯৫ সালে নির্মিত এ সিনেমায় অভিনয় করেছেন আসাদুজ্জামান নূর, বিপাশা হায়াত, আবুল হায়াত, ডলি জহুর, শিলা আহমেদসহ আরও অনেক খ্যাতিসম্পন্ন অভিনেতা ও অভিনেত্রী। ১৯তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ৮টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার অর্জন করে। নিঃসন্দেহে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে এ সিনেমাটির স্থান শীর্ষ পর্যায়ে।

‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তির চার বছর পর দ্বিতীয় সিনেমায় হাত দেন হুমায়ূন আহমেদ। ১৯৯৯ সালে নির্মিত ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন মুক্তা, জাহিদ হাসান, মেহের আফরোজ শাওন ও মাহফুজ আহমেদ। এই সিনেমায় ‘একটা ছিল সোনার কন্যা’ গান লেখার মাধ্যমে গীতিকার হিসেবে আত্মপ্রকাশ ঘটে হুমায়ূন আহমেদের। ২০০০ সালে হুমায়ূন আহমেদ নির্মাণ করেন তার আরেক সিনেমা ‘দুই দুয়ারী’। এই সিনেমায় অভিনয়ের জন্য অভিনেতা রিয়াজ প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। ২০০৩ সালে মুক্তি পায় ‘চন্দ্রকথা’। এটি হুমায়ূন আহমেদ নির্মিত চার নম্বর সিনেমা। সিনেমার জনপ্রিয় ‘ও আমার উড়াল পক্সক্ষীরে’ গানটি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদ এবং এতে কণ্ঠ দিয়েছেন সুবীর নন্দী।

হুমায়ূন আহমেদের নির্মাণে পাঁচ নম্বর সিনেমা ‘শ্যামল ছায়া’। তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে তার নির্মাণে দ্বিতীয় সিনেমা এটি। এটি নির্মিত হয় ২০০৪ সালে।  ‘তিন বছর পর ২০০৭ সালে হুমায়ূন আহমেদ তৈরি করেন কমেডি সিনেমা ‘নয় নম্বর বিপদ সংকেত’। চলচ্চিত্রটিতে নির্মাতা তার ব্যক্তিগতভাবে পছন্দের বিভিন্ন বিষয় ধারণ করেছেন। ২০০৮ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘আমার আছে জল’ নামের আধুনিক ধাঁচের একটি সিনেমা। এই সিনেমার মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন বিদ্যা সিনহা মিম। সিনেমাটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্মাননাও অর্জন করেছে। তার সর্বশেষ সিনেমা ‘ঘেটুপুত্র কমলা’। যে বছর সিনেমাটি মুক্তি পায় সে বছরেই মৃত্যু হয় এই কথাসাহিত্যিকের (১৯ জুলাই, ২০১২)।