হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় কোরআনের সংরক্ষণ ছিল মুখস্থ ও আংশিক লিখিত অবস্থায়। প্রতিটি আয়াত নাজিল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাহাবিদের মুখস্থ করিয়ে দিতেন এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত লেখকদের নির্দেশ দিতেন তা লিখে রাখতে। কোরআনের আয়াতগুলো কোথায় স্থাপন করতে হবে, কোন সুরার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে তাও তিনি বলে দিতেন। এভাবেই কোরআনের সংরক্ষণ নিশ্চিত হয়, তবে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থরূপ তখনো তৈরি হয়নি।
নবীজির ইন্তেকালের পর মুসলিম উম্মাহর সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়। ইয়ামামার যুদ্ধে বহু হাফেজে কোরআন সাহাবি শহীদ হন। এতে আশঙ্কা দেখা দেয় যে, যদি এভাবে আরও হাফেজ শহীদ হতে থাকেন, তবে কোরআনের কিছু অংশ হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রস্তাব দেন কোরআনকে একত্রে সংকলনের জন্য। প্রথমে খলিফা হজরত আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহু দ্বিধাগ্রস্ত হন। তিনি মনে করলেন, যেহেতু রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরআনকে একত্রে গ্রন্থ আকারে সংকলন করেননি, তাই তার উদ্যোগ নেওয়াটা হয়তো ঠিক হবে না। কিন্তু হজরত ওমরের যুক্তি তাকে সন্তুষ্ট করল। অবশেষে তিনি সাহাবিদের মতামত নিলেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন যে কোরআন একত্রে সংকলন করা জরুরি।
এই কাজের জন্য নিয়োগ দেওয়া হলো নবীজির সাহাবী ও বিশিষ্ট কারি জায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহুকে। কারণ তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওহি লিখিয়েদের অন্যতম ছিলেন, অসাধারণ স্মৃতিশক্তি ও প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। তাকে দায়িত্ব দিয়ে বলা হলো, কোরআনের প্রতিটি আয়াত দুই সাক্ষীর প্রমাণ ছাড়া লিখবেন না। অর্থাৎ যেসব সাহাবি মুখস্থ করেছিলেন, তাদের বয়ান এবং লিখিত দলিল উভয় দিক থেকে যাচাই করতে হবে।
জায়েদ ইবনে সাবেত রাদিয়াল্লাহু আনহু কাজ শুরু করলেন। প্রতিটি আয়াত যাচাই করে, সাহাবিদের মুখস্থের সঙ্গে মিলিয়ে, লিখিত নথির সঙ্গে মিলিয়ে তিনি সংগ্রহ করলেন। এভাবে একত্রে সংকলিত হলো পূর্ণ কোরআন। এটি তখন খলিফা আবু বকরের কাছে রাখা হলো। তার মৃত্যুর পর হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট সংরক্ষিত থাকে। তার ইন্তেকালের পর তা তার কন্যা হাফসা রাদিয়াল্লাহু আনহার কাছে থাকে। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী এবং কোরআনের নির্ভরযোগ্য হাফেজা।
পরবর্তী সময় হজরত ওসমান ইবনে আফফান রাদিয়াল্লাহু আনহুর খেলাফতের সময় আবার একটি নতুন পরিস্থিতি দেখা দেয়। ইসলামের বিস্তৃতি ঘটল, দূরদূরান্তে মানুষ ইসলাম গ্রহণ করল। তারা নানা অঞ্চলে বসবাস করতে শুরু করল। ফলে উচ্চারণ ও কেরাতের ভিন্নতা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। অতঃপর বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত উচ্চারণভেদ, পাঠভেদ বা লিখিত ভিন্নতা দূর করে একটি নির্দিষ্ট পাঠরীতি এবং লিখনশৈলীকে সরকারিভাবে নির্ধারণ করা হয়। এরপর কয়েকটি অনুলিপি তৈরি করে বিভিন্ন প্রদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। অন্যসব অনুলিপি ধ্বংসের নির্দেশ দেওয়া হয়, যেন কোথাও বিভ্রান্তি না থাকে। ফলে পুরো মুসলিম উম্মাহ একই লিখিত ও পাঠরীতি অনুসারে কোরআন পাঠ করতে থাকে।
লেখক : ধর্মীয় নিবন্ধকার