রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুর রহমানের ছেলে তাওসিফ রহমান সুমনের (১৬) মৃত্যুর কারণ অতিরিক্ত রক্তক্ষণ। মরদেহের ময়নাতদন্তের পর সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এই তথ্য জানিয়েছেন।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শুক্রবার (১৪ নভেম্বর) দুপুরে রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রহমান হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এর পরই সন্তানের মরদেহ নিয়ে রওনা হন গ্রামের বাড়ি জামলপুরে।
নিহত সুমনের মরদেহ বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রাখা ছিলও। শুক্রবার সকালে ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের মর্গে তার মরদেহ ময়নাতদন্ত করেন ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক কফিল উদ্দিন এবং প্রভাষক শারমিন সোবহান কাবেরী। এ সময় মর্গের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন নিহত সুমনের বাবা বিচারক আব্দুর রহমান।
ময়নাতদন্ত শেষে ফরেনসিক বিভাগের অধ্যাপক ডাক্তার কফিল উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, ধারালও ও চোখা অস্ত্রের আঘাতে শরীরের তিনটি স্থানে রক্তনালী কেটে যাওয়ায় অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ঘটে। এছাড়াও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ হয়েছিল। এতেই তার মৃত্যু হয়।
অধ্যাপক কফিল উদ্দিন আরও জানান, তাওসিফের ডান ঊরু, ডান পা ও বাম বাহুতে ধারালও অস্ত্রের আঘাত পাওয়া গেছে। এ সব স্থানে গুরুত্বপূর্ণ রক্তনালী কেটে যাওয়ায় বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ ঘটে। এই অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুর প্রধান কারণ।
তাওসিফের গলায় কাল দাগ পড়ার কারণ সম্পর্কে ময়না তদন্তকারী এই চিকিৎসক বলেন, নরম কিছু দিয়ে শ্বাসরোধের চেষ্টা থেকে এমন দাগ তৈরি হতে পারে। তবে এটি মৃত্যুর মূল কারণ নয়। ধারালও অস্ত্রের আঘাত এবং শ্বাসরোধের চেষ্টা একই সময়ে হয়েছে। আর অতিরিক্ত রক্তক্ষরণই তার মৃত্যুও আসল কারণ বলে জানান ডা. কফিল উদ্দিন।
নগরীর রাজপাড়া থানায় দায়ের করা এজাহারে বিচারক আব্দুর রহমান লিখেছেন, এই মর্মে এজাহার দায়ের করছি যে, আমি মহানগর দায়রা জজ, রাজশাহী হিসেবে কর্মরত আছি। গত ১৩ নভেম্বর তারিখ সকাল পৌনে ৯টায় আমি আমার সরকারি গাড়ি যোগে তেরখাদিয়া এলাকায় ডাবতলা নামক স্থানের ১০ তলা বিশিষ্ট ‘স্পার্ক ভিউ’ অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর ৫ম তলার ভাড়া ফ্ল্যাট থেকে রওনা হয়ে আদালতে পৌঁছে যথারীতি দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে থাকি। বেলা ৩ টা ৪২ মিনিটে আমার গানম্যান কনস্টেবল তৌহিদুর রহমান ও ড্রাইভার সবুজ হাসান আমার খাসকামরায় এসে বলে যে, বাসা থেকে আমার স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী (৪৪) আমাকে মোবাইলে না পেয়ে আমার গণ্যমান্য কনস্টেবল তৌহিদুর রহমানকে মোবাইলে জানায় যে, একজন দুষ্কৃতিকারী আমার বাসায় আক্রমণ করে আমার স্ত্রী ও ছেলেকে গুরুতর জখম করেছে এবং জরুরি ভিত্তিতে বাসায় পুলিশ নিয়ে যেতে বলেন। এই সংবাদ পেয়ে আমি তৎক্ষণাৎ চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, রাজশাহী ও রাজশাহী বিচার বিভাগে কর্মরত অন্যান্য বিচারকদের নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলে আমার পার্শ্ববর্তী ফ্ল্যাটের মালিক হাবিবুর রহমান মোবাইলে আমাকে জানায় যে, একজন দুষ্কৃতিকারী আমার স্ত্রী ও ছেলেকে গুরুতর আহত করেছে। তাদেরকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে এবং দুষ্কৃতিকারীকে তারা আটক করে রেখেছেন।
তৎক্ষণাৎ আমি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাই এবং দেখি আমার ছেলে তাওসিফ রহমান জরুরি বিভাগের স্ট্রেচারে মৃত অবস্থায় আছে এবং আমার স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী মারাত্মক জখম প্রাপ্ত হয়ে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি আছে। আমার স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসীর জ্ঞান ফিরলে তার কাছ থেকে জানতে পারি গত ১৩ নভেম্বর তারিখ আনুমানিক দুপুর আড়ায়টার সময় আসামি লিমন মিয়া (৩৫) আমার ভাড়া ফ্ল্যাটে কৌশলে প্রবেশ করে আমার স্ত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো ছুরি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপুর্যপরি আঘাত করে এবং আমার নাবালক পুত্র তাওসিফ রহমান কে ধারালো ছুরি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে উপুর্যপরি আঘাত করে ও শ্বাসরোধ করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে। এরপর বাড়ির মালিক ও দারোয়ান খবর পেয়ে ওপরে এসে আমার স্ত্রীকে গুরুতর জখমী অবস্থায় ও মৃত পুত্রকে ভবনের সাপোর্ট সার্ভিসের সদস্যদের সহযোগিতায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিলে কর্তব্যরত ডাক্তারগণ আমার পুত্র তাওসিফ রহমানকে মৃত ঘোষণা করেন।
উল্লেখ্য যে, ইতোপূর্বে আসামি আমার স্ত্রীকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়ায় তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকার জালালাবাদ থানায় ৬ নভেম্বর তারিখে আসামির বিরুদ্ধে জিডি দায়ের করেছিলেন।
এজাহার দিতে দেরি হওয়ার কারণ সম্পর্কে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, একমাত্র পুত্র সন্তানের মৃত্যু, স্ত্রীর চিকিৎসা ও ঘটনার আকস্মিকতায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত থাকায় আত্মীয় স্বজনের সাথে আলাপ আলোচনা শেষে কিঞ্চিৎ বিলম্বে আমার আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মাহবুব উল আলম এর মাধ্যমে মামলা রুজুর নিমিত্তে এজাহার প্রেরণ করলাম।
এ দিকে, বৃহস্পতিবার বিকেলেই এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই রহস্য উদঘাটনে মাঠে নামে পুলিশ। একমাত্র হামলাকারী আটক হওয়ায় পুলিশ প্রাথমিকভাবে বেশ কিছু তথ্য উদঘাটন করতে পেরেছে। এই হামলার একমাত্র অভিযুক্ত লিমন এটা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে যে, হামলাকারী লিমন নিহতের পরিবারের পূর্ব পরিচিত। ৬ তারিখ সাধারণ ডায়েরির সূত্র ধরে কিছু তথ্য পাওয়ার আশা করছে পুলিশ। এখন মুলত তার এই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠা এবং খুনের কারণ নিশ্চিত হতে চায় পুলিশ। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় লিমন চিৎকার করে বেশ কিছু কথা বলেছে। সেখানে সে দাবি করেছে, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনে কাজ সকার সুবাদে প্রায় ৫ বছর আগে থেকেই বিচারক আব্দুর রহমানের স্ত্রীর সাথে তার পরিচয়। চিৎকার করে তিনি বেশ কিছু আপত্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তাও বলেন। তবে, লিমনের এসব কথা আমলে না নেয়ার এবং গণমাধ্যমে প্রচার না করার আহবান জানিয়েছেন রাজশাহী মহানগর পুলিশ। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান গণমাধ্যমে বার্তা পাঠিয়ে এই আহবান জানান।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার গাজীউর রহমান জানান, আসামি লিমন মিয়াকে হাসপাতালে রেখেই চিকিৎসা চলছে। তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হবে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের পরে ঘটনার প্রকৃত রহস্য উদঘাটন করা যাবে। তিনি বলেন এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে বিভিন্ন দিক নিয়েই কাজ করছে পুলিশ। সিলেটে গত ৬ নভেম্বর যে জিডি হয়েছে সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে।
গত ৬ নভেম্বর নিহতের মা তাসমিন নাহার লুসী জালালাবাদ থানায় যে জিডি করেছিলেন তাতে তিনি লিমনের হামলার শিকার হওয়ার আশংকা করেন। জিডিতে তিনি উল্লেখ করেন, লিমন মিয়ার সঙ্গে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন এর সদস্য হওয়ায় তার সাথে আমার পরিচয় হয়। পরিচয় হওয়ার পর সে মোবাইল নাম্বার নেয়। তার পরিবার আর্থিকভাবে কিছুটা দুর্বল হওয়ায় প্রায় সময় সে আমার কাছ থেকে আর্থিক সহযোগীতা নিত। একটা পর্যায়ে বিবাদী প্রতিনিয়ত আমার কাছে সহযোগিতা চাইলে আমি সহযোগিতা করতে অপারগতা প্রকাশ করি। এতে সে তার মোবাইল থেকে আমাকে মোবাইলে ফোন করে হুমকি দেয়। লুসী তার জিডিতে বলেন, সর্বশেষ গত ৩নভেম্বর সকালে লিমন তার মেয়ের ফেইসবুক ম্যাসেঞ্জারে কল করে আমাকে ও আমার পরিবারের লোকজনদের প্রাণে হত্যা করবে বলে হুমকি প্রদান করে। এসব বিষয় গুরুত্ব দিয়ে দেখছে পুলিশ। লিমন হাসপাতাল থেকে ছাড় পেলে পুলিশ তার কাছ থেকে হত্যা রহস্য উদঘাটনে জিজ্ঞাসাবাদ করবে বলে জানান পুলিশ কর্মকর্তা গাজীউর রহমান।
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার বিকেলে রাজশাহী নগরীর রাজপাড়া থানাধীন ডাবতলা এলাকায় রাজশাহী মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক আব্দুর রহমানের বাসায় ঢুকে তার ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। নিহতের নাম তাওসিফ রহমান সুমন (১৬)। হামলাকারীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বিচারকের স্ত্রী তাসমিন নাহার লুসী (৪৪) গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন হামলাকারী লিমন মিয়া (৩৫) নিজেও। লিমন মিয়ার বাড়ি গায়পান্ধা জেলায়। লুসী ও লিমন মিয়াকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শঙ্কর কে বিশ্বাস জানান, আহত তাসমিন নাহার লুসী ও লিমন মিয়ার শারীরিক অবস্থায় এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।