জনমুখী প্রশাসন কবে?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রশাসনের নিজস্ব স্বাধীনতা রয়েছে। যদিও তা ভিন্নমাত্রার, যা মূলত সেই দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ইতিহাস এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নির্ভর করে অগ্রসর হয়। আমরা ঔপনিবেশিক ধাঁচের প্রশাসন থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন দেশের উপযোগী প্রশাসন গড়ার জন্য কোনো বড় ধরনের সংস্কার করিনি। সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশগুলোয় প্রশাসন পরিচালিত হয় সংসদীয় প্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে, যা শতভাগ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পরিচালিত হয়। এটি সত্য, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপের কারণে প্রশাসনের স্বাধীনতা প্রভাবিত হয়েছে দীর্ঘদিন। রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং দলীয় স্বার্থের কারণে প্রশাসনিক সংস্কার বা উন্নয়নে বিভিন্ন চড়াই-উতরাই হয়েছে। যেমনটি হয়েছে আমাদের দেশে। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের হাত অদৃশ্য শিকলে বন্দি রাখে ক্ষমতাসীন বিভিন্ন দল। তখন প্রশাসন চাইলেও এর শিকল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে না। যদি কেউ সাহসও করে, হয়তো পরবর্তী দিনগুলো হয়ে ওঠে তার জন্য ভয়ংকর, যা এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

আমাদের দেশে বলতে গেলে কোনো প্রশাসনিক সংস্কার হয়নি। যার মাধ্যমে সরকারি সংস্থার কাঠামো, পরিচালন বা কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি করে কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা বাড়ানো যায়। এর মূল লক্ষ্য আধুনিক, দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলা। যেটি জনগণের চাহিদা ও কল্যাণে নিবেদিত থাকবে। অথচ এমনটি হয়নি। প্রশাসনে কর্মরত ব্যক্তিদের দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বাড়ানো এবং কাজের মান উন্নত করার কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। যে কারণে বরাবরই প্রশাসন থেকেছে নিজস্ব স্বার্থোদ্ধারের চেষ্টায়। ফলে বর্তমানে প্রশাসন গুরুত্বপূর্ণ ক্রসরোডে রয়েছে। এখন ভুল শুধরে গতিপথ বদলানো ছাড়া বিকল্প নেই। কিন্তু প্রশাসন আগের পথেই হাঁটছে। অথচ ক্রসরোড থেকে সোজা না গিয়ে ডান বা বাঁয়ে ঘুরে খাসলত বদলানোর সুযোগ ছিল। প্রশাসন সঠিক পথে না থাকায় জনগণের আস্থা হারিয়েছে। গত ৮ আগস্ট প্রশাসন নিয়ে একটি সেমিনার আয়োজন করে অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা’ নামের ওই সেমিনারে মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন মিয়া থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মুখ্য সচিব সরাসরি বলেছেন, ‘প্রশাসন মিস ডাইরেক্টড। একটি ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠান। রাজনীতিকরা তাদের প্রয়োজনে এখানে নিয়ে গেছেন। প্রশাসনের একটি নতুন ইমেজ তৈরি করার এটাই সময়। আরেকটি রাজনৈতিক সরকার এলে তা হাতছাড়া হবে। বিগত বছরগুলোয় প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থ না দেখে ব্যক্তিস্বার্থ প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনে সংকট দেখা দেবেই।’

প্রশাসনে চলমান বিভিন্ন সংকট প্রসঙ্গে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশিদ বলেন, ‘অনেক ধরনের পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় পার হচ্ছে। কিছু সংকট দূর হয়েছে। আরও চেষ্টা চলছে। সব সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নযোগ্য নয়। সরকার সবকিছু বিবেচনা করছে।’ তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘জনগণের সঙ্গে আমলাতন্ত্রের সম্পর্ক ভালো করবেন রাজনীতিবিদরা। তারা জবাবদিহির কাজটি করবেন জনগণ এবং আমলাদের মধ্যে। যেহেতু রাজনীতিবিদরা তা করতে পারছেন না, সেজন্য বোঝাপড়াও সহজ হচ্ছে না। আমলারাও নিজেদের ক্ষমতাটুকু হাতেই রাখছেন।’ সাবেক সচিব এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘অন্তর্র্বর্তী সরকারও আগের পথই অনুসরণ করেছে। দৃষ্টান্তমূলক কোনো সংস্কার জনগণের সামনে আনতে পারেনি। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই যদি প্রশাসনে গ্রেডিং করে দোসর চিহ্নিত করতে পারত, তাহলে আস্থা ফেরত আসত।’ আসলে জনগণের দুর্দশা লাঘব এবং সরকারি সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাকে সহজ ও ত্বরান্বিত করতে আমলাতন্ত্রের কাঠামো পুনর্গঠন জরুরি। দেশের সাংবিধানিক ধারাকে অব্যাহত রাখতে, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রশাসনকে অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে গণতান্ত্রিকভাবে, যাতে দেশের সর্বসাধারণ হয় প্রশাসনের মালিক, ক্ষমতাসীনরা নন।