প্রবাসীরা কেন দেশি রাজনীতিতে জড়ান

প্রবাসীরা সাধারণ বাংলাদেশে রাজনৈতিতে জড়ান না। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তাদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। কিন্তু কেন তারা রাজনীতিতে জড়ান? নিউইয়র্কে বিএনপি, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বললে তারা দাবি করেন, অন্য দেশের নাগরিকত্ব নিলেও তারা নিজ দেশের উন্নয়নের জন্য, অর্থাৎ বাংলাদেশের স্বার্থে এই রাজনীতি করছেন। কিন্তু সাধারণ চোখে দেখলে ব্যক্তি ও দলের নেতাদের স্বার্থ সেখানে বড় বিষয় বলে মনে হয়। আর ব্যক্তিস্বার্থের ক্ষেত্রে বড় লক্ষ্য থাকে নিজ দেশে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া বা ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা।

নিউইয়র্কে একাধিক প্রবাসী সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলেও এমন ধারণা পাওয়া যায়। অনেক উদাহরণ দেশের মানুষের কাছেও আছে। ২০২৩ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের টিকিটে মেয়র নির্বাচিত হন যুক্তরাজ্যপ্রবাসী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। বিলেত থেকে এসে তার মেয়র প্রার্থী হওয়ার ঘটনায় খোদ আওয়ামী লীগের সিলেটের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন, জানিয়েছিলেন প্রতিবাদ। কিন্তু সে সময় স্থানীয় নেতাকর্মীদের সেই ক্ষোভ-প্রতিবাদ আমলে নেয়নি আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশ ছেড়ে আবার লন্ডন চলে গেছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী।

দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর লন্ডন থেকে বিএনপির অনেকেই এখন দেশে। শুধু যুক্তরাজ্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় বসবাসকারী বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত অনেকেই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার চিন্তা থেকে বাংলাদেশমুখী হয়েছেন বলে দলটির সূত্রে জানা গেছে। এরই মধ্যে অন্তত ৫ জন প্রবাসী নেতা।

যুক্তরাষ্ট্রের চিত্র বলতে গিয়ে নিউইয়র্কের একাধিক সাংবাদিক জানান, বিদেশে থেকে দেশি রাজনীতিতে সম্পৃক্তদের একটা অংশের কাছে দেশে সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষা করাটা বড় বিষয়। দেশের বড় কোনো দলের সঙ্গে যুক্ত থাকলেই সেটা সম্ভব বলে তাদের ধারণা।

প্রবাসে যারা দেশের কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেই দল ক্ষমতায় গেলে তাদের জন্য তদবির করা সহজ- বলছিলেন নিউইয়র্ক বসবাসকারী একাধিক বাংলাদেশি। তারা বলেন, দেশে মন্ত্রী, এমপিদের সঙ্গে দেখা করা বেশ কঠিন। কিন্তু দলের নেতারা যখন নিউইয়র্কে আসেন, তখন সেখানকার সমর্থকেরা তাদের সংবর্ধনা দেওয়াসহ যথেষ্ট সময় দিয়ে থাকেন। এগুলোও এক ধরনের বিনিয়োগ। সেই নেতারা মন্ত্রী-এমপি হলে অতীতের বিনিয়োগের প্রতিদান পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে অনেকে তদবির বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়েন।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোয় নাগরিকত্ব পেয়ে যারা বসবাস করছেন, তাদের একটা বড় অংশ ওই দেশগুলোর মূলধারার রাজনীতিতে যেতে পারেন না বা সেভাবে অবস্থান তৈরি করতে পারেন না। তাদের অনেকে সেখানকার কমিউনিটিতে প্রভাব তৈরি করা এবং দেশে সুবিধা পাওয়ার ব্যক্তিস্বার্থ থেকে দেশি রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। একেবারে রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করেও অনেকে দেশি রাজনীতিতে যুক্ত রয়েছেন। তবে সেই সংখ্যাটা অনেক কম। এমন ধারণা পাওয়া যায় প্রবাসীদের অনেকের সঙ্গে কথা বলে।

আরেকটি অংশ আছেন, যারা অবৈধভাবে ওই দেশে যান, তারা রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে আবেদন করেন। তারা তাদের অবস্থানের কারণে দেশি রাজনীতির সঙ্গ যুক্ত হন। দলগুলোরও স্বার্থ রয়েছে। কোনো কোনো দলের জন্য ডোনেশন বা আর্থিক সহায়তা পাওয়ার একটা বিষয় রয়েছে বলে পর্যবেক্ষকেরা বলছেন।

এসব কারণেই প্রবাসীরা মূলত বিদেশে রাজনীতিতে জড়ান। এটি করতে গিয়ে তারা বিভিন্ন সময়ই যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশগুলোয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনে প্রবাসীদের দলাদলি এমনকি সংঘর্ষে জড়ান এমন অভিযোগ রয়েছে। সর্বশেষ অন্তবর্র্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সফরসঙ্গী এনসিপি নেতা আখতার হোসেনের ওপর নিউইয়র্কে ডিম নিক্ষেপ বা হেনস্তা করার ঘটনায় সেখানে দেশি রাজনীতির উত্তাপ ছড়িয়েছে।

তবে এমনটি হওয়া উচিত নয় বলে রাজনৈতিক পক্ষ, বিশেষজ্ঞরা এমনকি সাধারণ প্রবাসীরাও মনে করেন। তাদের কথা হচ্ছে রাজনীতি রাজনীতির জায়গায় থাকবে। বিদেশের মাটিতে দেশের সম্মান রাখার দায়িত্ব প্রবাসীদেরই।