মাঠ দখলের পাঁয়তারায় উত্তেজনা

বরিশালের ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব মাঠে হঠাৎ অস্থায়ী ঝুপড়ি ঘর ও সাইনবোর্ড বসানোর ঘটনায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গত সোমবার গভীর রাতে মুসলিম ইনস্টিটিউট জামে মসজিদের নাম দিয়ে সাইনবোর্ড টানিয়ে মাঠের মধ্যে একটি ছোট টিনশেড ঘর নির্মাণ করা হয়। গতকাল মঙ্গলবার ভোরে সেখানে ফজরের নামাজ হয়। পরে জোহরের নামাজের সময় স্থানীয়রা বিষয়টি নজরে আনেন। স্থানীয়রা জানান, মাঠের মধ্যে হঠাৎ এমন স্থাপনা তৈরির ফলে শুধু জমির মালিকানা ও ব্যবহারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি, বরং দীর্ঘদিন ধরে সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ক্রীড়া কর্মকা-ের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই ক্লাবের মর্যাদা এবং সম্মানও সংকটে পড়েছে।

মাঠের একাংশে রয়েছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এবং বঙ্গবন্ধু অডিটরিয়াম, যা ২০১৪ সালে বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্মাণ শুরু করেছিল। তবে নানা জটিলতার কারণে কাজ এখনো পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। স্থানীয়রা বলছেন, হঠাৎ করে মাঠের ব্যবহার নিয়ে এমন পদক্ষেপ, যা এলাকার মানুষ এবং ক্লাবের সদস্যদের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে উপেক্ষা করে রাতের অস্থায়ী নির্মাণ এক ধরনের দখলের আভাস দিচ্ছে।

গতকাল ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্লাবের সাবেক নেতারা দ্রুত মাঠে এসে নির্মাণ কাজ বন্ধ করেন।

মুসলিম সোসাইটির সভাপতি অধ্যাপক আব্দুর রব দাবি করেছেন, মাঠের জমিটি তাদের মালিকানাধীন এবং মসজিদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য তারা ছোট ঘর ও সাইনবোর্ড স্থাপন করেছেন। তিনি বলেন, তিনি সভাপতি হিসেবে এখানে মসজিদের কার্যক্রম চালাবেন। মসজিদ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন মাসুমও বলেন, মুসলিম সোসাইটির মালিকানাধীন জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হচ্ছে, এখানে কারও বাধা দেওয়ার অধিকার নেই। তবে তারা কেন ২০২৩ সালের উচ্ছেদের সময় দাবি উত্থাপন করেননি, তা স্পষ্ট নয়। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে গভীর রাতে তৎকালীন সিটি মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ ক্লাবটি ভেঙে দেন। এরপর ক্লাবের পক্ষ থেকে আন্দোলন হয়।

মাঠ ও ক্লাবরক্ষা কমিটির সদস্য ডা. মনীষা চক্রবর্তী জানান, সিটি করপোরেশন অবৈধভাবে ক্লাব ভেঙেছিল। আদালতের রায়ে উচ্ছেদ অবৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ক্লাবকে পাঁচ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। সেই সময় মুসলিম সোসাইটি কোনো দাবি করেনি।

স্থানীয়রা জানায়, যেখানে ঝুপড়ি ঘরটি তৈরি হয়েছে, একসময় সেখানে ক্লাবের মূল ভবন ছিল। ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি পূর্বঘোষণা ছাড়া ভবনটি ভেঙে দেওয়া হয়। ক্লাব সদস্যদের অভিযোগ, এটি ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি ভেঙে দেওয়ায় ক্রীড়াঙ্গনে নেতিবাচক বার্তা যায়।

সাবেক সভাপতি শফিকুল আলম গুলজার বলেন, ‘উচ্ছেদের নামে ক্লাবটি নিশ্চিহ্ন করা হয়েছে, ভেতরের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ও আসবাব রক্ষা করা যায়নি।’

সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আহসান কবির হাসান বলেন, ‘২০১৪ সালের পর নানা জটিলতায় নতুন কমিটি হয়নি।’

মোহামেডান ক্লাব একসময় বহু খ্যাতনামা নেতার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়েছিল, যেমন সাবেক রাষ্ট্রপতি আব্দুর রহমান বিশ্বাস, কর্মকর্তা লকিতুল্লাহ, বিডি হাবিবুল্লাহ ও বর্তমান বিসিবি পরিচালক আলমগীর হোসেন আলো। ক্লাব রক্ষায় আন্দোলনও হয়েছে। ২০২৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি টাউন হল চত্বরে উন্মুক্ত সংবাদ সম্মেলন করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন অ্যাডভোকেট আমিন উদ্দিন মোহন।

বরিশাল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ব্রিটিশ আমলে জাতীয় জাগরণের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৩৭ সালে জমিদার সৈয়দ ফজলে রাব্বীর দানকৃত জমিতে ১৯৪২ সাল থেকে ক্লাবের কার্যক্রম শুরু হয়। দলিল ও বিএস খতিয়ানেও জমিটি ক্লাবের মালিকানায় স্বীকৃতি পায়। ক্লাবটি প্রথমে মুসলিম যুবকদের খেলাধুলার কেন্দ্র হলেও পরে সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের জন্য উন্মুক্ত হয়। ১৯৩৮ সালে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের অনুপ্রেরণায় কলকাতা মোহামেডানের সঙ্গে একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ হয়েছিল।

বর্তমানে মাঠ রক্ষায় গঠিত ১০১ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি উচ্চ আদালতে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে লড়াই চালাচ্ছে। তবে সর্বশেষ ঝুপড়ি ঘর ও সাইনবোর্ড টানানোর বিষয়ে সিটি করপোরেশন বা প্রশাসনের কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।