রাস্তার দোকানদারির street vending) কথা উঠলেই সবার আগে শহরের জায়গা নিয়ে দরকষাকষির space negotiation) কথা আসে। কোনো গবেষণা ছাড়াই বলা যায় যে কোনো শহরের স্পেস নেগোসিয়েশন অত্যন্ত জটিল এবং আবশ্যিকভাবেই রাজনৈতিক। এখানে ক্ষমতা, পুলিশি নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি, স্থান রাজনীতি সবকিছু একসঙ্গে কাজ করে। নগর ধারণাটি আমাদের কাছে কেমন, তার ওপর নির্ভর করে নগরের রাস্তাঘাট এবং খোলা জায়গাগুলো আমরা কীভাবে ব্যবহার করতে চাই। নব্য উদারনৈতিক অর্থনীতির এ সময়ে নগরের জমিজমা, রাস্তা-ফুটপাত, খেলার মাঠ সব ধরনের জায়গাকে অর্থনৈতিক মূল্যবাহী হিসেবে না দেখে উপায় থাকে না। এ জটিল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে নগর ব্যবস্থাপনা কীভাবে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়ে উঠবে, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজবেন বিশেষজ্ঞরা। আমরা শুধু সমস্যাটি বুঝে নিতে চাচ্ছি। সাধারণ জ্ঞানজাত নগর ব্যবস্থাপনার যে চলকগুলো আমাদের সামনে আসে তা হলো শহরের স্থান ব্যবস্থাপনা, পথচারীর অধিকার, যানবাহন চলাচল, বাজার ও সেবা ব্যবস্থাপনা, অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, জনপরিসরের ন্যায়সংগত ব্যবহার এবং দারিদ্র্য কর্মসংস্থান নীতি। আপাতদৃষ্টিতে যতটা সহজে বলা যায়, একটু খেয়াল করলেই দেখা যায় স্ট্রিট ভেন্ডিং প্রতিটি বিষয়ের সঙ্গেই সরাসরি জড়িয়ে আছে। তাই একে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। স্ট্রিট ভেন্ডিং ব্যবস্থা কতটা জটিল তা বোঝাতেই এ ভূমিকা।
নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়টিকে একেবারেই মেকানিক্যাল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখার চল আছে, যেন এটি মানবিকতাহীন একটি কাজ। এই নৈর্ব্যক্তিকতার দরকারও যে কিছু নেই, তাও বলা যাচ্ছে না। কেননা ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার স্বার্থে কিছু গাণিতিক পদ্ধতি ব্যবহার করতে হয়। তার মানে এই না যে, এই রেগুলেটরি সিস্টেমের কাজ হলো বই দেখে শুধু বলপ্রয়োগ করতে থাকা। এ ব্যবস্থাপনার প্রথম এবং প্রধান কাজ মানুষের জন্য কিছু সার্ভিস তৈরি, মানুষের জন্য কাজের জায়গা তৈরি এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা। এখন যদি এমন হয় যে আমরা কোনো সার্ভিস দিতে পারছি না, তাই কোনো রেগুলেশনেও যাব না। তোমরা যথেচ্ছ যা করার করো, তাহলে দাঁড়ায় গোটা সিস্টেমকে এক ধরনের ইনফরমাল ম্যানেজমেন্টের হাতে, একটি করাপশন নেটওয়ার্কের আওতায় ছেড়ে দেওয়া। পরে যখন মনে হবে সব নিয়ন্ত্রণ তো চলে গেল, জনগণের জায়গাগুলো ব্যবসায়ীরা নিয়ে নিল, তখন বুলডোজার নিয়ে হাজির হবে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ততদিনে সেই স্থানের একটি সিস্টেম দাঁড়িয়ে গেছে এবং অনেক গরিব মানুষের জন্য জায়গাটি রুটি-রুজির উপায় হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে সেই জায়গা দখলমুক্ত করতে চাইলে, মানবিকতার প্রশ্নটি সামনে আসে। আবার কর্তৃপক্ষই অনেক ক্ষেত্রে মানবিকতার গেইম দেখিয়ে একটি করাপশন নেটওয়ার্কের অংশ হয়ে যেতে পারে।
নগরের দরিদ্র মানুষ কীভাবে জটিল রাজনৈতিক-অর্থনীতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তার একটি উদাহরণ দিই। একটি কাল্পনিক রাস্তা মেরামতের দৃশ্য কল্পনা করুন। ধরুন মিরপুর, মোহাম্মদপুর বা যাত্রাবাড়ীর কোনো বাজারসংলগ্ন রাস্তা মেরামতের জন্য খোঁড়াখুঁড়ি চলছে। যেদিন থেকে খননকাজ শুরু হয়েছে, সেদিন থেকেই সেখানে কোনো গাড়ি চলতে পারছে না, কিন্তু মানুষ হেঁটে যেতে পারছে। রাতারাতি দেখা গেল, অসংখ্য অস্থায়ী দোকানপাট গজিয়ে উঠেছে রাস্তায়। ফুটপাতে যারা ছিল তারা তো আরও জায়গা দখল করলই, নতুন লোকজনও এলো। রাস্তাটি খুব অল্প সময়ের মধ্যে জমজমাট বাজারে রূপান্তরিত হলো। এতই ব্যস্ত হয়ে উঠল যে, রাস্তা মেরামতের কাজ ব্যাহত হলো এবং শেষে স্থগিত হয়ে গেল। গোটা রাস্তায় একটি লোকাল ইনফরমাল ইকোনমি তৈরি হলো, কিন্তু কিছু মানুষ কাজের জায়গা পেল। কেন কাজটি স্থগিত হয়ে গেল চোখের আন্দাজে মনে হলো. ভাঙাচোরা রাস্তার ইকোনমি বেশ বড় হয়ে গেছে। রাস্তা মেরামতের সুযোগে খরচ বেড়ে গেছে। মানে, মসৃণ রাস্তার চেয়ে ভাঙা রাস্তা এখানে অর্থনৈতিকভাবে বেশি লাভজনক। লাভজনক হয়তো স্থানীয় ইকোনমির জন্য; গোটা শহরের হিসাবে হয়তো বিরাট ক্ষতি। কিন্তু স্থানীয় লোকজন কেন সেটা বুঝতে চাইবে? এর ফলে দিনের পর দিন সেই রাস্তায় বাজার বসতে থাকল। স্থানীয় লোকজন একসময় অতিষ্ঠ হলো এবং সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করল। তারাও চেষ্টা তদবির করল, কিন্তু বাজারের লোকজন একাট্টা হয়ে রাস্তার কাজ করতে দিতে নারাজ। এভাবেই চলছিল। কিন্তু কতদিন? এমন করে তো ফেলে রাখা যায় না। এক সময় সিটি করপোরেশন বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হলো এবং সব ভেঙে রাস্তা নির্মাণ শেষ হলো। এমন একটা কেইসেও মানবিকতার কথা ওঠে, কিন্তু খুব একটা পাত্তা পায় না। এখানে মানবিকতার দোহাই খাটে না। কিন্তু মানবিকতার দোহাই এখানে গরিব লোকজন দেয় না। ঢাকাকে বুঝতে হলে, এটাও বুঝতে হবে যে, শহরের গরিব মানুষ তাদের শ্রম বিক্রি করে খায়। তাদের বিপন্নতা বিক্রি করে না। যারা করে, তারা অন্য লোক। তাদের ভিন্ন ব্যবসা। আবার বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় যে লোকটা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বাদাম বিক্রি করে তাকে আপনি বলপ্রয়োগ করে সরাতে পারেন না। এটা মানবিকতার ব্যাপার। এটি আমাদের জনপরিসরের সৌন্দর্য এবং ঐতিহ্যের অংশ। যখন দেখবেন, ফুটপাত দখল হয়ে বড় মার্কেটের দোকানের চেয়েও বড় পুঁজির দোকান গজিয়ে উঠছে, তখন সেটা আলাদা কথা। যে কোনো বড় ইন্টার সেকশনে যেখানে প্রচুর মানুষ উঠবে, নামবে, হাঁটবে সেখানে মানবিকতার দোহাই দিয়ে ব্যবসা করতে দেওয়া যায় না। পথচারীর হাঁটার জায়গা রাখতেই হবে। নইলে শহর অচল হয়ে পড়বে। আসলে সবার আগে বুঝে নেওয়া দরকার, স্ট্রিট ভেন্ডিং বলতে আমরা কী বুঝি। ‘হকার’ শব্দটা পড়লেই যে চিত্র ভেসে ওঠে, তা নির্ভর করে আপনি শহরের কোন জায়গায় থাকেন, আপনার দৈনন্দিন চলাচল কেমন। ‘স্ট্রিট ভেন্ডিং’ বলতে আমরা একটি ইউনিক বা এক্সক্লুসিভ সংজ্ঞা দিতে পারি না। ঢাকা শহরের স্ট্রিট ভেন্ডরদের জন্য কোনো একক, সর্বজনস্বীকৃত সংজ্ঞা নেই। এটাই এই ব্যবস্থার জটিলতাকে প্রমাণ করে। আমরা সাধারণত ফুটপাতে বসা দোকান বা মোবাইল বিক্রেতাকে কল্পনা করি, কিন্তু বাস্তবে এটি বহুমাত্রিক শহুরে জীবন ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির গভীরে রোপিত একটি বিস্তৃত পরিসর। ঢাকায় স্ট্রিট ভেন্ডর হতে পারে ভ্যানগাড়িতে সবজি বেচা নারী, বাসস্ট্যান্ডে পানি বিক্রি করা কিশোর, গুলিস্তানের ফুটপাতে জুতার দোকানদার, অথবা নিউ মার্কেট মোড়ের চটপটি ফুচকা বিক্রেতা।
প্রত্যেকের কাজের ধরন, বিনিয়োগ, দক্ষতা, স্থায়িত্ব, জায়গার ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক পর্যন্ত ভিন্ন। কেউ নির্দিষ্ট জায়গায় প্রতিদিন বসেন; কেউ চলমান রাস্তা, গলি, গাড়ির জানালাও তাদের দোকান। কারও পুঁজির পরিমাণ দুই তিন হাজার; কারও আবার এক লাখ টাকারও বেশি। এমন বৈচিত্র্যের কারণে ‘স্ট্রিট ভেন্ডর’ বলতে কাকে বোঝাবে, তা নির্ভর করে গবেষক, নীতিনির্ধারক অথবা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গির ওপর। কেউ এটিকে জীবিকা সংগ্রাম হিসেবে দেখেন, কেউ দেখেন অনানুষ্ঠানিক নগর বাজার, আবার কেউ দেখেন অবৈধ দখল বা বিশৃঙ্খলা হিসেবে। ফলে স্ট্রিট ভেন্ডিংকে এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা বিভ্রান্তিকর। যেখানে স্ট্রিট ভেন্ডিং নিয়ে বোঝাপড়াতেই ঘাটতি আছে, তাকে ম্যানেজ করতে যাওয়া অবশ্যই কঠিন এবং দুরূহ। ঢাকার নর্থ সিটি করপোরেশন একবার একটি সিভিল সোসাইটি অর্গানাইজেশনকে নিয়ে স্ট্রিট ভেন্ডর ম্যানেজমেন্ট করতে চেয়েছিল। সিটি করপোরেশন পার্শ্ববর্তী দেশের উদাহরণ থেকেও বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেছিল। স্ট্রিট ভেন্ডর ম্যানেজমেন্টের যে ফর্মুলা বা মডেলগুলো আমরা পাই, সেগুলো তৈরি হয়েছে সেই শহরের ইকো সিস্টেম মাথায় রেখে। সেই শহরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, জনঘনত্ব, মানুষের আকাক্সক্ষা এগুলো ছাড়াও আরও বহু ফ্যাক্টর সেখানে কাজ করে। কোনো বিচার- বিবেচনা ছাড়া কোনো মডেল অন্য জায়গায় বসিয়ে দেওয়া যায় না। যারা এমন চেষ্টা করে, তারা শহরকে শুধুই ইট-কাঠ-পাথরের সমষ্টি মনে করে। তারা ভুলে যায়, ঢাকা শহরের মতো শহরের প্রাণ হলো, এখানকার মানুষ।
আমাদের শহরের ইনফরমাল ইকোনমি নিয়ে অ্যাকাডেমিক লেখাপত্র প্রচুর। কিন্তু সেগুলোর কোনো বাস্তব প্রয়োগ দেখা যায় না। বলা হয়, ঢাকা গবেষণার জন্য যতটা উপযুক্ত, কোনো ইস্যুকে সমাধান করার জন্য ততটা উপযুক্ত নয়। সরকারি এবং বেসরকারি তথ্য-উপাত্ত থেকে দেখা যায়, ঢাকা শহরে অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজের সঙ্গে যুক্ত আছে প্রায় আশি শতাংশ মানুষ। প্রশ্ন থাকে যে, শহরের মূল ইকোনমিই যেখানে অপ্রাতিষ্ঠানিক, যেখানে অধিকাংশ মানুষ সেই ইকোনমিতে যুক্ত, তাকে অপ্রাতিষ্ঠানিক বলা হবে কেন? এটাই তো মূলধারা। অর্থাৎ, অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজ। এই বলাটাই এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান। ধরে নেওয়া হয়, বানের জোয়ারের মতো মানুষ ঢাকায় আসতেই থাকবে, তারা যেভাবে পারবে কাজ খুঁজে নেবে; কিন্তু শহর তাদের কোনো দায়িত্ব নেবে না। একে গ্লোবাল রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও ভাবা জরুরি। আমাদের শহর যা উৎপাদন করে, তার বড় অংশই উন্নত শহরের চাহিদা পূরণের জন্য। উন্নয়ন এবং জিডিপির দোহাই দিয়ে সব সরকার এটা হতে দিয়েছে। এখন আর লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না। মোদ্দা কথা, স্ট্রিট ভেন্ডিং-এর বৈচিত্র্য এবং স্থানিক রাজনীতি সম্পর্কে বোঝাপড়া বাদ দিয়ে নগর ব্যবস্থাপনা এ ইস্যুর কোনো কূলকিনারা করতে পারবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, নগর ব্যবস্থাপনার পরিপ্রেক্ষিতে স্ট্রিট ভেন্ডর কেবল সমস্যা নয় জীবন ও জীবিকার একটি বড় উত্তর। এই সিস্টেমকে গোটা শহরের ইকোলজির মধ্যে একটি সিমবায়োটিক সিস্টেম হিসেবে বুঝতে হবে। কারণ ঢাকার মতো ঘন, অসম এবং রাজনৈতিকভাবে জটিল শহরে ‘স্ট্রিট ভেন্ডিং’ নিজেই একটি গতিশীল, পরিবর্তনশীল, প্রতিনিয়ত অভিযোজিত হতে থাকা নগর বাস্তবতা। যাকে বোঝার জন্য, একাধিক দৃষ্টিকোণ একসঙ্গে প্রযোজ্য।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও সমাজ গবেষক
shahriarfarhad@gmail.com