সাদা পোশাকে অভিযান চলছেই

অনলাইন এডিটরস অ্যালায়েন্সের সেক্রেটারি ও দৈনিক ভোরের কাগজের অনলাইন প্রধান মিজানুর রহমান সোহেলকে গত মঙ্গলবার গভীর রাতে নিজ বাসা থেকে আটক করে ডিএমপির সাদা পোশাকের একটি টিম। ওই সময় পুলিশ অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট দেখাতে পারেনি। পরিবারের লোকজন চ্যালেঞ্জ করলে পুলিশ ডিবির জ্যাকেট পরে তাকে মিন্টো রোডে নিয়ে যায়। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর ডিবির হেফাজত থেকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। একই ঘটনা ঘটেছে গত ৭ নভেম্বরেও।

ওই দিন সাদা পোশাকের পুলিশ ওয়ারেন্ট ছাড়াই মিরপুর ১১ নাম্বার সেকশনের একটি বাসা থেকে আবদুস সালাম খান নামের এক ব্যক্তিকে ধরে নিয়ে যায়। পরে তাকে একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেয়। অথচ তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা বা সাধারণ ডায়েরি পর্যন্ত ছিল না।

চলতি বছর ১৮ মার্চ সাভারের রাজ ফুলবাড়িয়ার শোভাপুর এলাকায় সাদা পোশাকে একটি মেসে অভিযান চালাতে গিয়ে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে পুলিশ। তারা কোন সংস্থার পুলিশ সদস্য, তা জানাতে অস্বীকৃতি জানায় বলে অভিযোগ ওঠে। বাড়িটির মালিক নাসির উদ্দিনের ছেলে নাহিদ হাসান বলেন, এর আগে দুবার কয়েকজন ভাড়াটিয়াকে সাদা পোশাকের পুলিশ পরিচয়ে তুলে নিয়ে মারধর করে ৯৫ হাজার টাকা আদায় করে ছেড়ে দেওয়া হয়। মারধরের শিকার আকিব নামের এক ভাড়াটিয়া সাভার মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।

উল্লিখিত তিনটি ঘটনার মতোই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সাদা পোশাকে অভিযান চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও এরকম অভিযান চালিয়ে নিরীহ লোকজনকে আটক করে হয়রানি করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও একই ঘটনা ঘটছে। আটকের পর কাউকে কাউকে ৫৪ ধারার বা অন্য মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আবার ‘অনৈতিক আবদার’ মেটানোর পর ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। কোনো কোনো ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের পরিবারকে জিম্মি করে টাকা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, চলতি বছর ২৪ জুলাই প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিষদের সভায় ফৌজদারি কার্যবিধি (সিআরপিসি) সংশোধনের প্রস্তাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। সভাশেষে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সাংবাদিকদের বলেন, এখন থেকে যে পুলিশ সদস্য গ্রেপ্তার করতে যাবেন, তার যথাযথ আইডেনটিটি থাকতে হবে, নেমপ্লেট থাকতে হবে, আইডি কার্ড সঙ্গে থাকতে হবে এবং চাওয়ামাত্র এসব দেখাতে হবে। গ্রেপ্তারের পর থানায় নিলে পরিবারকে জানাতে হবে। কোনো অবস্থাতেই ১২ ঘণ্টার বেশি আটক রাখা যাবে না, গ্রেপ্তার ব্যক্তি অসুস্থ বোধ করলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। কেন গ্রেপ্তার, কে গ্রেপ্তার করেছে, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তির পরিবারের কার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে সেসব তথ্য লিখিত থাকতে হবে। গ্রেপ্তারকৃতদের তালিকা পুলিশ সদর দপ্তরে থাকতে হবে।

৫৪ ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে আইন উপদেষ্টা বলেছিলেন, পুলিশের সামনে অপরাধ করে থাকলে পুলিশ গ্র্রেপ্তার করতে পারবে। অথবা পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে তাকে গ্রেপ্তার করা যাবে। অনলাইনে বেইল বন্ড এবং ডিজিটাল সমনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই আইনের যথাযথ প্রয়োগ হলে ইচ্ছাকৃতভাবে কাউকে গ্রেপ্তার করে হয়রানি করা বা গ্রেপ্তারের পর অস্বীকার করা কিংবা গুম বন্ধে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও সাদা পোশাকে পুলিশের তৎপরতা কমছে না। বিনা ওয়ারেন্টে বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও যাচ্ছে পুলিশ। থানা পুলিশসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা কৌশলে এসব করছেন। সন্দেহভাজন কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ ও তল্লাশির ক্ষেত্রে ব্যক্তির মর্যাদা ও সম্মানরক্ষায় উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে নির্যাতন-নিগ্রহের ঘটনা ঘটছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম দেশ রূপান্তরকে জানান, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা অভিযান চালালে অব্যশই ইউনিট ও নিজের পরিচয় দিতে হবে। পুলিশের কোনো সদস্য অভিযানের নামে অপকর্ম করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল এক রায়ে হাইকোর্ট ৫৪ ধারার প্রয়োগে স্বেচ্ছাচারিতা না করা, আটক বা গ্রেপ্তারের ক্ষেত্রে পরিচয় দেওয়া, কাউকে নিবর্তনমূলকভাবে আটক না করা, রিমান্ডে নির্যাতন না করা এবং সংশ্লিষ্ট ধারার সংশোধনের তাগিদসহ ১৫ দফা নির্দেশনা দেয়। ২০১৬ সালের ২৪ মে আপিল বিভাগেও এ রায় বহাল থাকে।

ওই বছরের ১০ নভেম্বর আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তব্য নিয়ে বলা হয়, নাগরিকের সম্মান রক্ষা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে উঁচুমানের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে হবে। সংবিধানে স্বীকৃত নাগরিকের অধিকারের সুরক্ষা দিতে হবে। কিন্তু এ নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না। প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন থানার সাদা পোশাকের টিমের বিরুদ্ধে অপকর্মের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, পটপরিবর্তনের পরও সাদা পোশাকে অভিযান চালানো হচ্ছে, তা সত্য। এ নিয়ে আমরা অনেক অভিযোগ পাচ্ছি। পুলিশের সব ইউনিটকে বলে দেওয়া হয়েছে সাদা পোশাক বা ওয়ারেন্ট ছাড়া অভিযানে যাওয়া যাবে না। সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগ থাকলে সম্মানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানাতে হবে। অভিযানের সময় নিজ ইউনিট ও পরিচয় দিতে হবে। এসব কেউ মানছেন আবার কেউ মানছেন না।

নাম প্রকাশ না করে দুজন ভুক্তভোগী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিনা পরোয়ানায় কাউকে আটক কিংবা গ্রেপ্তার নিয়ে উচ্চতর আদালতের রায়ে সতর্কমূলক নির্দেশনা থাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আটক বা গ্রেপ্তারের কৌশল পাল্টেছে। আটকের পর গ্রেপ্তার না দেখিয়ে মাদক বা অন্য কোনো মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা বা জিডি না থাকা সত্ত্বেও মাদক মামলায় ফাঁসিয়ে দিয়েছে। পুলিশের আচরণ আগের মতোই আছে বলে মনে হচ্ছে।

অবসরে যাওয়া পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, থানার পুলিশের সিভিল টিম গঠনের বা সাদা পোশাকে অভিযান চালানোর এবং আটক করার আইনগত ভিত্তি নেই। পুলিশের সাংগঠনিক কাঠামোতে থানার পুলিশের সিভিল টিম বলতে কিছু নেই। থানা এলাকায় নজরদারির জন্য ওসি নিজ থানার আয়তন অনুসারে সিভিল টিম গঠন করেন। তারা রাতের বেলায় বেশি তৎপর থাকেন বলেই সন্দেহভাজনদের আটকের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠছে। কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে পুলিশ অভিযান চালাতে পারবে যদিও।

তিনি বলেন, থানা-পুলিশের বাইরে সিআইডি, ডিবি, এসবি সাদা পোশাকে কাজ করে। অনেক সময় অপরাধী গ্রেপ্তার করতে গোয়েন্দা সংস্থাকে সাদা পোশাকে কাজ করতে হয়। কিন্তু আটকের সময় পরিচয় নিশ্চিত করতে হয়। যাকে আটক করা হবে তার কাছে পরিচয় জানাতে হবে। দ্রুত আদালতে হাজির করতে হবে। সাদা পোশাকের অপব্যবহার হয় বলেই সাদা পোশাক নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। যারা সাদা পোশাকে কাজ করেন তাদের সবার যার যার বিভাগের নিজস্ব লোগোসহ জ্যাকেট আছে। এটা ব্যবহার করতে হবে।

সাংবাদিক মিজানুর রহমান সোহেল ফেসবুকে লিখেছেন, ‘গত রাত (মঙ্গলবার) ১২টার দিকে ডিবিপ্রধান আমার সঙ্গে কথা বলবেন, এ অজুহাতে পাঁচ-ছয়জন ডিবি সদস্য জোর করে বাসা থেকে আমাকে তুলে নিয়ে যায়। নিয়ে আসামির খাতায় আমার নাম লেখা হয়। গারদে আসামিদের সঙ্গে আমাকে রাখা হয়। কিন্তু কেন আমাকে আটক করা হলো তা আমি জানতাম না, যারা আমাকে তুলে নিয়েছে তারাও কিছু বলতে পারেননি। অনেক পরে বুঝতে পারলাম, সরকারের একজন উপদেষ্টার ইশারায় মাত্র নয়জন মোবাইল ফোন ব্যবসায়ীকে মনোপলি ব্যবসা করার সুযোগ দেওয়ার জন্য আমাকে আটক করা হয়েছিল। আমার সঙ্গে আবু সাঈদ পিয়াসকেও আটক করা হয়। তিনি এখনো ডিবি কার্যালয়ে আছেন।’

সংবাদ সম্মেলন বন্ধ করাই তাদের উদ্দেশ্য ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আজ বুধবার (গতকাল) এনইআইআর নিয়ে ডিআরইউতে মোবাইল হ্যান্ডসেট ব্যবসায়ীদের সংগঠন বিজনেস কমিউনিটি বাংলাদেশের (এমবিসিবি) প্রেস কনফারেন্স করার কথা ছিল। আমি সংগঠনটির মিডিয়া পরামর্শক। প্রেস কনফারেন্স বন্ধ করাই তাদের প্রধান টার্গেট ছিল। সেটা এখন দেশের সবাই জেনে গেল।’

মিজানুর রহমান সোহেলের স্ত্রী সুমাইয়া সীমা সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ সদস্যরা কোনো পরোয়ানা দেখাতে পারেননি।’