খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার সাজিয়ারা শেয়ারঘাটা খাল। খালটি ঘেঁষে নিচু জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে আশ্রয়ণ প্রকল্প। নির্মিত হয়েছে ওপরে লাল ও সবুজ টিনের ছাউনি ও ইটের দেয়ালে সাদা রঙের দুই কামরার ৫৬টি ঘর। মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে ঘরগুলো উপহার দেওয়া হয়েছে ভূমিহীন ৫৬ পরিবারকে। কিন্তু এ আশ্রয়ণে মাত্র আটটি পরিবার ঘরের মধ্যে উঁচু মাচা তৈরি করে বসবাস করছে। বাকি ৪৮টি পরিবার ঘর ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র। উঁচু মাচায় বসবাস বা অন্যত্র না গিয়ে কী করবে? চলতি বছর বর্ষা মৌসুমে আশ্রয়ণের ঘরগুলো বুকসমান পানিতে ডুবে যায়। গত দুই-তিন মাসে জমে থাকা পানি কিছুটা কমেছে, কিন্তু এখনো হাঁটুসমান পানিতে নিমজ্জিত ঘরগুলো। চারদিকে পানি থইথই করছে, বসবাসের জন্য মোটেও উপযুক্ত পরিবেশ নেই।
শুধু জলাবদ্ধতার সমস্যাই নয়; অপরিকল্পিত, দায়সারা ও অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে নির্মিত হওয়ায় প্রতিটি আশ্রয়ণই নানা সংকটে ধুঁকছে। বিশেষ করে ঘরের পলেস্তারা ধসে পড়ছে। দেয়াল ও মেঝেতে ফাটল ধরেছে। ইতিমধ্যে কিছু ঘরের পিলার ও দেয়াল ভেঙে পড়েছে। বর্ষা হলেই টিনের ছাউনি দিয়ে পানি পড়ে। দরজা-জানালা খুলে পড়ছে। অনেক আশ্রয়ণে রয়েছে সুপেয় পানির সংকট, নেই সড়ক ও বিদ্যুৎ। এ ছাড়া আশপাশে নেই কর্মসংস্থানও। এমন নানা অব্যবস্থাপনায় ইতিমধ্যে অনেকেই ছেড়ে গেছে বিনামূল্যে পাওয়া আবাসস্থল। যারা আছেন তারাও এসব যন্ত্রণায় ভালো নেই। তাদের নিরুপায় ও বাধ্য হয়ে টাকা ধারদেনা করে প্রতিনিয়ত ঘর মেরামত করে বসবাস করতে হচ্ছে। ফলে ঘর পেয়ে দরিদ্র মানুষ নিরাপদে মাথা গোঁজার যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেটি ভঙ্গ হয়েছে।
আশ্রয়ণে বসবাসকারী ও অন্যদের অভিযোগ, ভূমিহীনদের আশ্রয় দেওয়ার উদ্দেশে নেওয়া প্রকল্পটি দুর্নীতিতে ডুবেছে। রাজনৈতিক প্রকল্প হওয়ায় ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কথা ছিল, তা যেমন দেওয়া হয়নি, তেমনি নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। যার কারণে দ্রুত সময়ের মধ্যে এমন করুণদশা হয়েছে।
এই চিত্র শুধু খুলনার নয়, সারা দেশের। প্রকল্প চলার সময়ই নানা বিষয়ে অভিযোগ ওঠে। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারণে কয়েকজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়। প্রত্যাহার করা হয় কয়েকজন জেলা প্রশাসককেও। নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ ছাড়াও ভুল স্থান নির্বাচন করা হয়েছে। অর্থাৎ যে স্থানে কখনোই বাড়ি নির্মাণ হতে পারে না, সেখানেই অনেক উপজেলায় আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সেসব ঘর এখন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তাছাড়া রাজনৈতিক বিবেচনায় বরাদ্দ পাওয়ায় অনেকেই সেসব ঘর ছেড়ে অন্যত্র বাসবাস করছেন।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ঘোষণা করে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় সারা দেশে পাঁচটি পর্যায়ে ২ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯৩ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে জমিসহ ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম পর্যায়ে (প্রথম ধাপে) ৬৩ হাজার ৯৯৯টি, দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫৩ হাজার ৩৩০টি, তৃতীয় পর্যায়ে ৬৯ হাজার ১৩৩টি, চতুর্থ পর্যায়ে ৩৯ হাজার ৩৬৫টি ও পঞ্চম পর্যায়ে ১৮ হাজার ৫৬৬টি ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারি খাসজমিতে তৈরি প্রতিটি ঘরে দুটি কামরা, রান্নাঘর, বারান্দা ও টয়লেট রয়েছে। সেমিপাকা ঘরগুলোর প্রতিটি তৈরি করতে প্রথম পর্যায়ে খরচ হয় ১ লাখ ৭১ হাজার, দ্বিতীয় পর্যায়ে খরচ হয় ১ লাখ ৯০ হাজার, তৃতীয় পর্যায়ে ২ লাখ এবং চতুর্থ ও পঞ্চম পর্যায়ে ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ২ শতাংশ জমিসহ এই ঘর দেওয়া হয়। রাজনৈতিক প্রকল্প বলে বিবেচিত এসব ঘর নির্মাণকাজ সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন। আর প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে সরাসরি উপজেলা পর্যায়ে তদারকি করা হয়।
খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট ও যশোর জেলার আশ্রয়ণের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিয়ম মেনে ঘর নির্মাণ না হওয়ায় প্রথম থেকেই মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নিম্নমানের ইট, রড, খোয়া ও বালু ব্যবহার করা হয়েছে। সিমেন্ট ব্যবহার করা হয়েছে নামমাত্র। কর্মকর্তাদের পরিদর্শনে এসব অনিয়ম ধরাও পড়ে। অনিয়মের অভিযোগে অনেক ঘর ভেঙে নতুন করে ফের নির্মাণেরও নজির রয়েছে।
সরেজমিন খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার সামন্তসেনা আশ্রয়ণে গিয়ে দেখা যায়, রূপসা-কাজদিয়া সড়কের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ১৫টি ঘর। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এগুলো উদ্বোধন করেন স্থানীয় সাবেক সংসদ সদস্য আবদুস সালাম মুর্শেদী। অথচ সেখানে একটি পরিবারও ওঠেনি। ঘরগুলো ঝোপঝাড়ে ঢেকে যাচ্ছে। দরজা-জানালায় মরিচা ধরেছে। ফলে বিপুল অঙ্কের টাকা পানিতে গেছে।
কাজদিয়া গ্রামের বাসিন্দা মফিজুল ইসলামসহ স্থানীয়রা জানান, অনুমতি ছাড়াই রেলের জমিতে ঘর নির্মাণ করা হয়। ঘর নির্মাণের পরই রেল কর্তৃপক্ষ মামলা করে। যে কারণে কোনো পরিবার সেখানে বসবাস করতে পারেনি।
এ উপজেলার দেবিপুর আশ্রয়ণের বাসিন্দা জাহাঙ্গীর হাওলাদার জানান, তাদের আশ্রয়ণে অনেকের ঘরে অসংখ্য ফাটল ধরেছে। সংস্কারেও ফাটল ঠিক হচ্ছে না। এ ছাড়া চারটি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছিল। এর মধ্যে তিনটি অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে দূরবর্তী গ্রাম থেকে সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
ডুমুরিয়া উপজেলার শান্তিনগর আশ্রয়ণ প্রকল্প কমিটির সভাপতি মো. শাহজাহান মোড়ল ও হামিদা বেগম এবং সাজিয়ারা আশ্রয়ণের বাসিন্দা মাজেদা বেগম জানান, আশ্রয়ণে যেন দুর্ভোগের শেষ নেই। প্রকল্পের স্থান নির্ধারণ সঠিক হয়নি। বছরের পাঁচ মাস পানিতে ডুবে থাকে। বসবাসকারীদের হাত ও পায়ে চামড়ায় ঘা হচ্ছে। বসবাসের অযোগ্য এ আশ্রয়ণ ছেড়ে বেশিরভাগ পরিবার ভাড়া বাসায় ও অন্যত্র চলে গেছে। কিন্তু কিছু পরিবার নিরুপায় হয়ে ঘরের মধ্যে উঁচু মাচা তৈরি করে বসবাস করছে।
এ উপজেলার শালতা-ভদ্রা নদীর পাশের আশ্রয়ণের বাসিন্দা মো. মহিউদ্দিন সরদার জানান, আশ্রয়ণে উঠান থেকে ঘরের বারান্দা সামান্য উঁচু। এতে সাপ-পোকা ঘরে উঠে আসে। ফলে রাতে আতঙ্কে থাকতে হয়। এ ছাড়া সড়ক না থাকায় কেউ অসুস্থ হলে হাতে ধরে বা কাঁধে করে মূল সড়কে নেওয়া লাগে।
বাগেরহাট জেলার ফকিরহাট উপজেলার বেতাগা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা শাহিনা বেগম ও মাবিয়া বেগম এবং সুজিত দাশ জানান, তাদের আশ্রয়ণে কিছু ঘরের সঙ্গে টয়লেট নির্মিত হয়নি, রঙও করেনি। দরজা-জানালাও খুলে পড়ছে।
উপজেলাটির শুভদিয়া আশ্রয়ণের বাসিন্দা নাজমুল সরদার, আলামিন ও রাবেয়া বেগম জানান, তাদের আশ্রয়ণে ঘর নির্মাণের সময় বালুর সঙ্গে সিমেন্টের পরিমাণ খুবই কম ব্যবহার হয়েছে। অনেক ঘরের মেঝেতে ইট না বিছিয়ে বালুর ওপর হালকা সিমেন্টের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। যার কারণে ঘরের মেঝে ফেটে ও উঠে গিয়ে শুধুই বালু বের হচ্ছে। ঘরের দেয়ালে ফাটল ধরেছে এবং পলেস্তারা খসে পড়ছে। ঘরের দেয়াল ফেটে ভেঙেও পড়েছে। নিরুপায় ও বাধ্য হয়ে টাকা ধারদেনা করে নিজ খরচে মেরামত করে বসবাস করছেন তারা।
এ আশ্রয়ণটিতে দুই দফায় ১৩১টি ঘর নির্মিত হয়। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ঘর ফাঁকা রয়েছে। ঘর ফাঁকা পড়ে রয়েছে কেন জানতে চাইলে তারা জানান, রাজনৈতিক বিবেচনায় অনেকেই ঘর পান। পরে তারা ঘরে ওঠেনি। এ ছাড়া অনেক ঘর যার নামে বরাদ্দ হয়েছে, সেই পরিবার থাকে না, অন্য পরিবারের লোকজন বসবাস করে বলে তারা জানান।
সাতক্ষীরা জেলার তালা উপজেলার শালিখা আশ্রয়ণের বাসিন্দা ইউসুফ গাজী, লাইলী বেগম ও খুশি খাতুন জানান, ঘরের ছাউনির টিন যেনতেনভাবে লাগানো হয়েছে, ঠিকমতো সেট হয়নি। স্ক্রুর পরিবর্তে তারের কাঁটা (ছোট পেরেক) ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে সামান্য বর্ষা হলেই পানিতে ঘরে টেকা যায় না। রাতে বর্ষা হলে সারারাত জেগে থাকতে হয়। এ ছাড়া ঘরগুলো শালিখা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে।
এ আশ্রয়ণের বাসিন্দা আসমা বেগম ও রোজিনা বেগম জানান, তাদের দুটি ঘরের পিলার ফাটল ধরে ভেঙে পড়েছে। এ ছাড়া পাশের নদী খননের মাটি আশ্রয়ণে ফেলা হয়েছে। এতে অনেক ঘরের বড় অংশ মাটিতে ঢেকে গেছে। ফেলানো মাটির চাপে কয়েকটি পানি ট্যাংক চ্যাপ্টা হয়ে গেছে।
জালালপুর আশ্রয়ণের বাসিন্দা রোজিনা বেগম জানান, তাদের আশ্রয়ণে নয়টি ঘর রয়েছে। এর মধ্যে ছয়টি ঘরে কেউ থাকে না। কারণ, এসব ঘরের মালিকদের নিজের জমি ও ঘর রয়েছে। সেখানেই তারা বসবাস করে। ফলে দীর্ঘদিন ঘরগুলোতে কেউ বসবাস না করায় ঝোপঝাড় ঢাকা পড়েছে। দরজা-জানালায় মরিচা ধরেছে এবং প্লাস্টার খসে পড়ছে।
এ প্রসঙ্গে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রকল্পটি রাজনৈতিক প্রকল্প হওয়ায় ব্যাপক লুটপাট হয়েছে। ডিজাইন ও এস্টিমেট অনুযায়ী ঘর নির্মাণ হয়নি। এ ছাড়া দলীয়করণ, স্বজনপ্রীতি ও আত্মীয়করণ হয়েছে। যাদের ঘর প্রয়োজন নেই, তারাও ঘর পেয়েছেন। পরে তারা ঘরে ওঠেনি। অনেক ঘর বিক্রিও হয়েছে। তিনি আরও বলেন, সম্ভাব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন দরকার ছিল। ভৌগোলিক ও প্রাকৃতিক কারণে প্রকৌশল জ্ঞানের সঙ্গে স্থানীয় লোকায়েত জ্ঞান ব্যবহার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেটি করা হয়নি। এ কারণে আশ্রয়ণের বাসিন্দারা পড়েছে চরম বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগে। তাই লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার।
বিষয়টি নিয়ে খুলনা বিভাগীয় কমিশনার (ভারপ্রাপ্ত) মো. ফিরোজ শাহ্ বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পসংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দেখাশোনা করেন। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ইউএনওদের সঙ্গে মিটিং করব। এরপর আশ্রয়ণে খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।