আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২–এ আশুলিয়ার মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় রাজসাক্ষী এসআই শেখ আবজালুল হকের জেরা চলাকালে আজ বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) প্রায় ঘণ্টাখানেক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। প্রসিকিউশন ও স্টেট ডিফেন্স আইনজীবীদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘিরে তর্ক-বিতর্ক শুরু হলে আদালতকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
সকালে বেলা সাড়ে ১০টার কিছু পর দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল—অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং জেলা ও দায়রা জজ নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর—জেরার কার্যক্রম শুরু করেন। আশুলিয়ায় ৬ তরুণের হত্যাকাণ্ড ও মরদেহ পুড়িয়ে ফেলার অভিযোগে সাবেক সাংসদ সাইফুল ইসলামসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় রাজসাক্ষী হিসেবে আদালতে উপস্থিত হন এসআই আবজালুল।
জবানবন্দি শেষে জেরা চলাকালে ডিফেন্স আইনজীবী মিজানুর রহমান তাকে একটি ঘটনার প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন। প্রসিকিউশন মনে করে এ ধরনের প্রশ্ন মামলার পরিধির বাইরে। এতে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে তর্কাতর্কি চলে। শেষ পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল বিষয়টি থামিয়ে জেরা পুনরায় স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনে।
এর আগের দিন আবজালুল ২৩তম সাক্ষী হিসেবে আদালতে তাঁর বর্ণনা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও ঘটনার বিষয়ে পরবর্তীকালে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা তথ্য তিনি আদালতে উপস্থাপন করেছেন। এ সময় তাঁর জবানবন্দি ঘিরে একাধিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলেও প্রসিকিউশন দাবি করে, সাক্ষী তাঁর জানা তথ্য পূর্ণাঙ্গভাবে তুলে ধরেছেন।
আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে সাক্ষ্য দিতে এসে তিনি নিজের পরিচয় তুলে ধরেন এবং প্রায় ৫০ মিনিট ধরে বক্তব্য দেন। গত বছরের ৫ আগস্টের ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী না হলেও, পরবর্তীকালে দায়িত্ব পালনের সময় সহকর্মীদের কাছ থেকে ঘটনাটির বিবরণ জেনেছিলেন বলে জানান তিনি। জবানবন্দির শেষে তিনি আদালতের প্রতি দুঃখপ্রকাশও করেন।
চলতি বছরের ২১ আগস্ট এ মামলায় ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। উপস্থিত আটজন আসামির মধ্যে ৭ জন নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তবে এসআই আবজালুল আদালতে দোষ স্বীকার করেন এবং রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন জানান। তাঁর দোষ স্বীকারোক্তির অংশটুকু রেকর্ড করে আদালত।
মামলার বিভিন্ন ধাপে ইতোমধ্যে সাক্ষ্য দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগী ও তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে আশুলিয়ায় গত বছরের ৫ আগস্ট ঘটে যাওয়া নির্মম ঘটনার বিভিন্ন দিক—যা মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
১৬ আসামির মধ্যে ৮ জন গ্রেপ্তার আছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, সাবেক সাভার সার্কেল এএসপি মো. শাহিদুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা। বাকিরা এখনও পলাতক।
ঘটনার পর ১১ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। মামলার নথিতে রয়েছে শতাধিক পৃষ্ঠার দালিলিক প্রমাণ, অসংখ্য সাক্ষীর বয়ান ও প্রযুক্তিগত তথ্য। এসব বিশ্লেষণ করে ট্রাইব্যুনাল মামলাটি আমলে নেয় এবং বিচার কার্যক্রম শুরু হয়।
আদালতে সাক্ষ্যগ্রহণ চলমান থাকায় পরবর্তীকালে তারিখে নতুন সাক্ষ্য ও জেরা গ্রহণ করা হবে। ট্রাইব্যুনালের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, মামলার জটিলতা ও সাক্ষীদের সংখ্যা বিবেচনায় রেখে বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে সতর্কতার সঙ্গে, যাতে প্রতিটি তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন ও মূল্যায়ন করা যায়।