আমিরুল মুমিনিন হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) ছিলেন সাহসী, ন্যায়নিষ্ঠ, দূরদর্শী ও প্রভাবশালী একজন খলিফা। ইসলাম গ্রহণের আগেও তিনি ছিলেন দৃঢ়চেতা। আর ইসলাম গ্রহণের পর তার সেই দৃঢ়তা ন্যায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। মহান আল্লাহর ভয়, ভালোবাসা, নরম হৃদয় সবই মিলেমিশে তার ব্যক্তিত্বকে এক মহিমান্বিত রূপ দেয়। ইতিহাসে তাকে অমর করে তোলে। এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, তার ভয়ে শয়তান পথ বদলিয়ে অন্যপথ দিয়ে যেত।
সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার হজরত ওমর ইবনে খাত্তাব (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.)- এর কাছে আসার অনুমতি চাইলেন। তখন তার সঙ্গে কুরাইশের কতিপয় নারী কথা বলছিলেন এবং তারা বেশি পরিমাণ দাবি-দাওয়া করতে গিয়ে তার আওয়াজের চেয়ে তাদের আওয়াজ উঁচু হয়। ওমর ইবনে খাত্তাব প্রবেশের অনুমতি চাইলে তারা (নারীরা) উঠে দ্রুত পর্দার অন্তরালে চলে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) তাকে প্রবেশের অনুমতি দেন। ওমর (রা.) ঘরে প্রবেশ করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন হাসছিলেন। ওমর (রা.) বললেন, হে রাসুলাল্লাহ! আল্লাহ আপনাকে সদা হাস্যোজ্জ্বল রাখুন।
রাসুল (সা.) বললেন, নারীদের কাণ্ড দেখে আমি অবাক হচ্ছি। তারা আমার কাছে ছিল অথচ তোমার আওয়াজ শুনা মাত্রই দ্রুত পর্দার অন্তরালে চলে গেল। ওমর (রা.) বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনাকেই অধিক ভয় করা উচিত। তারপর ওমর (রা.) ওই নারীদের লক্ষ্য করে বলেন, হে নিজ ক্ষতিসাধনকারী নারীরা, তোমরা আমাকে ভয় করো, অথচ আল্লাহর রাসুলকে ভয় করো না? তারা উত্তরে বলেন, আপনি রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে অনেক রূঢ় ভাষী ও কঠিন হৃদয়ের।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, হ্যাঁ ঠিকই হে ইবনে খাত্তাব! যে সত্তার হাতে আমার প্রাণ, তার কসম, শয়তান যখনই কোনো পথে তোমাকে দেখতে পায় তখনই তোমার ভয়ে ওই পথ ছেড়ে অন্যপথে চলে যায়। (সহিহ বুখারি ৩৬৮৩) এ হাদিস থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা ও উপদেশ পাওয়া যায়।
কোমল স্বভাবের বরকত : হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন সবচেয়ে বড় দয়ালু, শান্ত ও নম্র। মুখে সর্বদা হাসি লেগে থাকত। নারীরা উচ্চকণ্ঠে কথা বললেও তিনি রাগ করেননি। হাসিমুখে ওমর (রা.)-কে ঘটনাটি জানান। এর থেকে বোঝা যায়, শিক্ষক বা নেতৃস্থানীয়দের নরম আচরণ করতে হয়। এর বরকতে সহজেই মানুষের হৃদয় জয় করা যায়।
হাসির সময় দোয়া করা : হজরত ওমর (রা.) ঘরে প্রবেশ করে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে হাসতে দেখে সুন্দর একটি দোয়া করেন। ‘আদহাকাল্লাহু সিন্নাকা’ অর্থাৎ মহান আল্লাহ আপনাকে সদা হাস্যোজ্জ্বল রাখুন। এটা শেখায় প্রিয় নবীর জন্য দোয়া করা, তার জন্য মঙ্গল কামনা করা ইমানের নিদর্শন। সাহাবিদের নবীপ্রেম ছিল অটুট।
ওমর (রা.)-এর দৃঢ় চরিত্র : ওমর (রা.) ছিলেন কঠোর। কিন্তু তা ছিল ন্যায়ের জন্য। তিনি অন্যায় ও শিথিলতার বিরুদ্ধে ছিলেন অটল। তার উপস্থিতি মানুষকে শৃঙ্খলিত করত। কারণ মানুষ জানত ওমর (রা.)-এর সামনে অন্যায় টিকবে না। তিনি অন্যায়ের সামনে জীবনে কখনো শির নত করেননি।
নারীদের লজ্জাশীলতা : লজ্জা নারীদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে। নারীরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে সহজভাবে কথা বললেও ওমর (রা.) আসার শব্দ শুনে সঙ্গে সঙ্গে পর্দায় চলে গেলেন। এটা থেকে বোঝা যায়, যেখানে প্রয়োজন সেখানে নারীর শালীনতা অবলম্বনই আদব।
ইমানের শক্তি আসল শক্তি : যে মানুষের অন্তরে আল্লাহর ভয় থাকে তার সামনে শয়তান অসহায় হয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোষণা, ‘শয়তান তোমাকে দেখে পথ বদলে নেয়’, এটি ছিল ওমর (রা.)-এর ইমান ও আমলের এক অসাধারণ স্বীকৃতি। এটা থেকে বোঝা যায়, আল্লাহভীতি মানুষের এমন এক ঢাল, যা শয়তানের সব কৌশলকে ব্যর্থ করে দেয়।
লেখক : খতিব ও মাদ্রাসাশিক্ষক
রায়পুর, লক্ষ্মীপুর