দুই দিনের পার্থ টেস্টে শরফুদ্দৌলার সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে 

পেসারদের দাপটে ভাস্বর পার্থ টেস্ট মাত্র দুদিনেই জিতে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। ট্রাভিস হেডের ১২৩ রানের ইনিংসে ভর করে ইংল্যান্ডের দেয়া ২০৫ রান ২ উইকেট হারিয়েই তুলে ফেলে অজিরা। 

অথচ এই অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে ইংল্যান্ডের ১৭২ রানের জবাবে ১৩২ রান করেছিল মাত্র। কিন্তু ইংল্যান্ডকে দ্বিতীয় ইনিংসে ১৬৪ রানে গুটিয়ে দিয়ে ম্যাচটাকে নাগালের মধ্যে নিয়ে আসেন অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক (৩ উইকেট, ম্যাচে মোট ১১), স্কট বোল্যান্ড (৪) ও অভিষিক্ত ব্রেনডন ডগেট (৩+২)। 

ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংসে জেমি স্মিথকে টিভি আম্পায়ার বাংলাদেশের শরফুদ্দৌলাকে আউটের সিদ্ধান্ত নিয়ে বির্তক তৈরি হয়েছে। স্কোরবোর্ডে তখন ১০৪–৬। স্টার্কের বাউন্সার পুল করতে গিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন জেমি স্মিথ। বল অ্যালেক্স ক্যারির গ্লাভসে জমতেই জোরালো আবেদন—কিন্তু মাঠের আম্পায়ার নীতীন মেনন আউট না দেয়ায় সিদ্ধান্ত যায় তৃতীয় আম্পায়ার শরফুদ্দৌলার কোর্টে। বাংলাদেশের এই আইসিসি এলিট প্যানেল আম্পায়ারের সামনে তখন দুই দেশের কোটি ভক্তের চোখ, আর তাঁর এক সিদ্ধান্ত ঘুরিয়ে দিতে পারে ম্যাচের গতি। প্রথম রিপ্লেতেই রিয়েল-টাইম স্নিকোতে একটি মৃদু শব্দ শোনা যায়। সেই মুহূর্তেই ড্রেসিংরুমের পথে হাঁটা শুরু করেন স্মিথ। যেন তিনিও বুঝেছিলেন—বল ব্যাটে লেগেছে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই ফুটেজ ধীর করা হলে দেখা যায়, 'স্পাইক' দেখা দিচ্ছে বল ব্যাট পার হওয়ার এক ফ্রেম পর! এখানেই শুরু বিভ্রান্তি। ইংলিশদের হতভম্ব করা প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে একের পর এক রিপ্লে ঘুরিয়ে দেখেন শরফুদ্দৌলা। তারপর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলেন, 'আমি সন্তুষ্ট, বল ব্যাটে লেগেছে। নীতীন, তোমার সিদ্ধান্ত বদলাতে হবে।'

সিদ্ধান্ত শুনেই গ্যালারিতে ইংলিশ দর্শকদের প্রচণ্ড ক্ষোভ। কেউ চিৎকার করে—'সেম ওল্ড অজিস, অলওয়েজ চিটিং!' এমনকি ব্রিটিশ মিডিয়া টেলিগ্রাফ সরাসরি লিখে দেয়—'রিডিকিউলাস ডিসিশন'. পাঁচ মিনিটেও কোনো স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি।” বিবিসি স্পোর্টের ধারাভাষ্যকার ও প্রতিবেদক হেনরি মোয়েরান তাঁর এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘স্মিথের হাঁটা ইঙ্গিত দেয় সে হয়তো বলে (ব্যাট) লাগিয়েছে। কিন্তু এতটুকু ইঙ্গিত সিদ্ধান্ত দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। হতে পারে প্রযুক্তিটা ঠিকমতো সমন্বিত ছিল না। কিন্তু যদি টিভি আম্পায়ার তাঁর সিদ্ধান্ত এই তথ্যের ভিত্তিতেই নিয়ে থাকেন, তাহলে ইংল্যান্ডের ক্ষুব্ধ হওয়াটা একেবারেই স্বাভাবিক।’

শরফুদ্দৌলার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় জেমি স্মিথ ও ব্রাইডন কার্স

আইসিসির টানা পাঁচবারের বর্ষসেরা সাবেক আম্পায়ার এবং সর্বকালের অন্যতম সেরা আম্পায়ার সাইমন টউফেল শরফুদ্দৌলার পাশে দাঁড়ান। অস্ট্রেলিয়ান সংবাদমাধ্যম চ্যানেল সেভেনকে তিনি বলেন, 'যখন আমরা বিশ্বজুড়ে দুই ধরনের এজ ডিটেকশন (বল ব্যাটে লেগেছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার প্রযুক্তি) প্রযুক্তি ব্যবহার করি, তখন এই সমস্যা দেখা দেয়। আমরা মূলত হক-আই আলট্রা এজ ব্যবহার করি। অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যারা রিয়েল টাইম-স্নিকো (আরটিএস) ব্যবহার করে। সীমিত অভিজ্ঞতা দিয়ে আরটিএস কীভাবে ব্যবহার করবেন, সিরিজে (আম্পায়ারিংয়ের সময়) সেটা বোঝা কঠিন। কিন্তু আরটিএসের চূড়ান্ত প্রমাণ নীতি অনুযায়ী, যদি বল ব্যাট পার হয়েও একটি ফ্রেম পর্যন্ত স্পাইক দেখা যায়, তবে সেটা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়। আর এই ঘটনায় ঠিক এটাই দেখা গিয়েছে।’

ব্যাখ্যায় টউফেল আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত, যতটা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হতো, তিনি (শরফুদ্দৌলা) তত দ্রুত সিদ্ধান্ত দিতে চাননি। আর ট্র্যাকে (আরটিএস সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা) মানুষেরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে তাকে (ফুটেজ) দেখানোর, ধীর করেছে (ফুটেজ), ঘুরিয়েও দেখিয়েছে। আমার মতে, সঠিক সিদ্ধান্তই নেওয়া হয়েছে। (বল) ব্যাট পার হয়ে এক ফ্রেম পর স্পাইক দেখালে ব্যাটসম্যান অবশ্যই আউট।’

এই প্রথম অ্যাশেজ সিরিজে আম্পায়ারিং করবছেন শরফুদ্দৌলা। সিরিজের দ্বিতীয় টেস্টে ফিল্ড আম্পায়ার হিসেবে থাকবেন তিনি। ২ ডিসেম্বর থেকে ব্রিসবেনে শুরু হবে এই টেস্ট।