ডিজিটাল যুদ্ধে ঘূর্ণায়মান বিশ্ব রাজনীতি

বিশ্ব প্রযুক্তির পরিবর্তনশীল দাবার ছকে চীন এমন চাল দিয়েছে, যা শক্তির ভারসাম্য নতুন করে নির্ধারণ করতে পারে। বেইজিং তার রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে পরিচালিত সব ডেটা সেন্টারগুলোকে বিদেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপ ব্যবহার ও ক্রয় বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে। এটি শুধু বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং প্রযুক্তিতে এক ধরনের স্বাধীনতার ঘোষণা। বহুদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র চিপের সরবরাহকে কূটনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছিল।  এবার সেই প্রভাবের ভিত নড়ে গেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বৈঠকের পরই নেওয়া এই পদক্ষেপ হঠাৎ নয়, বরং দীর্ঘ পরিকল্পনার ফল। এখন থেকে চীনের সব নতুন রাষ্ট্রীয় ডেটা সেন্টারে ব্যবহার হবে হুয়াওয়ে বা আলিবাবার মতো স্থানীয় প্রসেসর। যে কেন্দ্রগুলোতে এখনো মার্কিন চিপ চালু আছে, সেগুলোর অডিট ও ধাপে ধাপে বাদ দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হবে। বার্তাটি স্পষ্ট, চীনের ভবিষ্যৎ এআই অবকাঠামো গড়ে উঠবে চীনা প্রযুক্তিকে কেন্দ্র করে। দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের নিয়ন্ত্রক অবস্থান ধরে রেখেছিল। তাইওয়ান থেকে সিলিকন ভ্যালি, সবখানেই আমেরিকান প্রযুক্তির ছাপ ছিল। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন প্রসেসর, বিশেষ করে প্রতিরক্ষা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় ব্যবহৃত চিপ সরবরাহ সীমিত করে চীনের উত্থান আটকে রাখার আশা করেছিল ওয়াশিংটন। কিন্তু এই পদক্ষেপের কারণে পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবার নিজস্ব সুবিধার্থে আমদানি নির্ভরশীলতা থেকে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে একসময় চীনা বাজারের প্রধান খেলোয়াড় এনভিডিয়া ও এএমডির মতো কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে বৃহত্তম প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্র হারাতে বসেছে। যুক্তরাষ্ট্র শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বিশ্বব্যাপী প্রভাবের অবস্থানও হারাচ্ছে। ওয়াশিংটনের বহু নীতিনির্ধারক বিশ্বাস করতেন, চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ মানে বেইজিংয়ের প্রযুক্তিগত সীমা নির্ধারণ। এখন দেখা যাচ্ছে, সেই সীমা কার্যত অদৃশ্য হয়ে গেছে।

স্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর শিল্প গড়ে তুলতে বেইজিং বহু বছর ধরে বিপুল বিনিয়োগ করছে। দৈনন্দিন ইলেকট্রনিকসের জন্য ব্যবহৃত চিপ থেকে শুরু করে সামরিক প্রযুক্তির উন্নত প্রসেসর সব ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা তৈরির চেষ্টা করেছে তারা। যা কখনো ওয়াশিংটনের চোখে ‘অকার্যকর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ’ বলে মনে হলেও এখন বাস্তবে ফল দিচ্ছে। ফলাফল পরিষ্কার। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির সাম্প্রতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে মার্কিন হার্ডওয়্যার ছাড়াই চীনা এআই মডেলগুলো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এর অর্থ সফটওয়্যার উদ্ভাবন, অ্যালগরিদম প্রশিক্ষণ এবং শক্তিশালী ডেটাসেটের মাধ্যমে চীন সেই ব্যবধান কমিয়ে ফেলছে, যা যুক্তরাষ্ট্র অনৈতিকভাবে বাড়াতে চেয়েছিল।  চীনের সিদ্ধান্তকে বৃহত্তর ‘অ্যালগরিদমের সার্বভৌমত্ব’ নীতির অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সব কম্পিউটিং অবকাঠামোর পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে বেইজিং। লক্ষ্য দুটি বহিরাগত চাপ থেকে নিরাপত্তা এবং আত্মনির্ভরতার প্রতীক হিসেবে নতুন করে জাতীয় শক্তি প্রদর্শন। পরিহাসের বিষয় হলো, প্রযুক্তিগত দমনমূলক নিষেধাজ্ঞা চীনকে ধীর করেনি বরং উদ্ভাবনের গতি বাড়িয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও গভীর। এআই-প্রযুক্তির বিশ্ব প্রতিযোগিতা এখন এমন পর্যায়ে, যেখানে পারস্পরিক নির্ভরতার বদলে আত্মনির্ভরতায় রূপান্তরিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন, উভয়ই নিজেদের ডিজিটাল অবকাঠামো আলাদা করে গড়ে তুলছে। পারস্পরিক সন্দেহ ও নিরাপত্তার জন্য তারা নিজস্ব কোড, চিপ ও অ্যালগরিদমের ভিত্তি তৈরি করছে।

প্রযুক্তির এ সংঘাতের সূচনা ২০২২ সালে, যখন যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে চীনের কাছে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন চিপ ও উৎপাদনযন্ত্র রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ফলে এআই গবেষণা, সামরিক সিমুলেশন কিংবা বৃহত্তর মেশিন-লার্নিং প্রকল্প সবকিছুতে চীন বাধাগ্রস্ত হয়। কিন্তু সেই বাধাই একসময় হয়ে ওঠে বিকল্প শক্তি গড়ার অনুপ্রেরণা।  হুয়াওয়ে নিষেধাজ্ঞার পর আবার উঠে দাঁড়ায় নিজস্ব এআই প্রসেসর নিয়ে। আলিবাবা বৃহত্তর ক্লাউড ডেটা প্রক্রিয়াকরণের জন্য নিজস্ব চিপ উন্মোচন করে। আরও অসংখ্য স্টার্টআপ রাষ্ট্রীয় পুঁজির সহায়তায় প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়। ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন চীনা সেমিকন্ডাক্টর খাত ধীরে ধীরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে, তা হলো স্বাধীনতা। চীনের নেতৃত্ব এই পরিবর্তনশীল পরিস্থিতিকে শুধু প্রযুক্তিগত রূপান্তর হিসেবে দেখে না, এটি জাতীয় পুনর্জাগরণের অংশ। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে এই প্রযুক্তিগত স্বাধীনতাকে তুলনা করছে তাদের প্রাচীন কিং রাজবংশের ‘স্বনির্ভরতার আন্দোলন’-এর সঙ্গে, যে সময় প্রযুক্তিতে দক্ষতাই ছিল সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখার প্রতীক।

চীনের এই পথচলায় সে আর একা নয়। রাশিয়াও প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতার পথে হাঁটছে। মস্কোর সাম্প্রতিক কৌশলগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ দেশীয় যন্ত্রাংশে নির্মিত হয়েছে। ইউরেশিয়ার বিভিন্ন দেশে একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে পশ্চিমা প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণকে পাশ কাটিয়ে নিজস্ব পথ তৈরি করা।  ওয়াশিংটনের কাছে এই বিকল্প ব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া অর্থনৈতিক ক্ষতি ও কৌশলগত সতর্কবার্তা দুটোই। যুক্তরাষ্ট্রের মনে করার কারণ নেই যে, উচ্চতর প্রযুক্তিতে তার আধিপত্য চিরস্থায়ী। একই সঙ্গে আমেরিকা নিজেও নির্ভরতা সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে ‘রেয়ার আর্থ’ প্রক্রিয়াজাতে, যেখানে চীনই এখনো অপ্রতিদ্বন্দ্বী। যুক্তরাষ্ট্রের উৎপাদিত স্মার্টফোন থেকে যুদ্ধবিমান সবকিছুর মূল উপাদান এই খনিজ পদার্থ। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ৮০% রেয়ার আর্থের আমদানি চীন থেকে করতে হয়েছে। আগামী প্রতিযোগিতা কে কত চিপ বিক্রি করছে তা নয়, বরং কে নিয়ন্ত্রণ করবে ভবিষ্যতের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার স্থাপত্য সেটিই মুখ্য প্রশ্ন। চীনের ‘অ্যালগরিদমের সার্বভৌমত্ব’ ধারণাটি সরাসরি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে আমেরিকার দীর্ঘদিনের সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবস্থাপনার শক্তিকে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজের প্রযুক্তি শিল্পকে চীনা হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করতে চাইছে, আর চীনও ঠিক একই কাজ করতে চাইছে উল্টো দিক থেকে। বিশ্ব প্রযুক্তিগতভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ছে, যেখানে প্রত্যেকে গড়ে তুলছে অদৃশ্য দেয়াল। বেইজিংয়ের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত শুধু একটি নীতিগত ঘোষণা নয় বরং এক যুগান্তকারী সংকেত। চীন আর প্রযুক্তির আমদানিকারক নয়। তারা এখন মান নির্ধারণের ক্ষমতাসম্পন্ন বৈশি^ক উদ্ভাবক। দশকের পর দশক প্রথমবারের মতো, ওয়াশিংটনকে এমন এক প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হয়েছে যে কিনা শুধু প্রতিযোগিতাই করতে শেখেনি, বরং নিজস্ব সিলিকনের ওপর ভরসা করে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক

writemah71@gmail.com