বদলির লটারিতেও তদবির!

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অন্তর্বর্তী সরকার নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এরই অংশ হিসেবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে পুলিশকে। সেই আলোকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে বদলিও শুরু হয়েছে। লটারির মাধ্যমে পুলিশে বদলি করা হচ্ছে। জেলার এসপিদের বদলি করা নিয়ে পুলিশের ভেতরে চলছে আলোচনা। এরই মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, বদলির মধ্যেই তদবিরে ইঙ্গিত মিলেছে। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ লোকজন পুলিশের কিছু কর্মকর্তার পক্ষে তদবির করেছেন। এর মধ্যে বিসিএস ২৪ ও ২৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের লটারি না হওয়ায় তদবিরে অনেকেই পছন্দের জেলায় গেছেন বলে পুলিশে কানাঘুষা শুরু হয়েছে। আবার কেউ কেউ আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ভালো অবস্থায়ও ছিলেন বলে তথ্য এসেছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হওয়ার পর তারাও পরিবর্তন হয়ে সুুবিধা নিচ্ছেন। ইতিমধ্যে এসব অভিযোগ খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যাদের বিভিন্ন জেলায় পুলিশ সুপার পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, তাদের মধ্যে কারও কারও অভিজ্ঞতা কম রয়েছে। এ কারণে একাধিক জেলা ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় তাদের দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা নিয়েও সংশয় দেখা দিয়েছে। যেসব জেলা বেশি ঝুঁকিপূর্ণ সেগুলো আওয়ামী লীগের সমর্থক বেশি। তাছাড়া বেশিরভাগ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবস্থাও ভালো নয়। খুন-খারাবিসহ নানা অপরাধ হয়ে আসছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পর পরিস্থিতি ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো। যদিও সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলে আসছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনেক ভালো। তফসিল ঘোষণা হলে পরিস্থিতি আরও ভালো হয়ে উঠবে।

পুলিশ সূত্র জানায়, দেশের মাঠ প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর যে উদ্যোগ অন্তর্র্বর্তী সরকার নিয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হচ্ছে লটারির মাধ্যমে ৬৪টি জেলার পুলিশ সুপার (এসপি) পদে পদায়ন। দীর্ঘদিনের তদবির, প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ থেকে মুক্ত থাকতে সরকার এমন ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে এসপি পদায়নে প্রথম কোনো ম্যানুয়াল লটারি, যা প্রশাসন ও জনমনে এক ধরনের মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। যদিও সরকার এ প্রক্রিয়াকে বলছে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবেই করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মহলে উঠে আসছে নানা তথ্য, যা লটারির আড়ালেও পুরনো সেই ‘তদবিরের সংস্কৃতি’ বহাল থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশেষত, গুরুত্বপূর্ণ ও আর্থসামাজিক দিক থেকে সুবিধাজনক জেলাগুলোর নিয়ন্ত্রণ কারা পাচ্ছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সুবিধাভোগী বলে পরিচিত কিছু কর্মকর্তার পদায়ন নিয়েও আলোচনা হচ্ছে পুলিশ মহলে।

নাম প্রকাশ না করে পুলিশ সদর দপ্তরে কর্মরত ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা গতকাল বৃহস্পতিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৪ ও ২৫ ব্যাচের যারা বিভিন্ন জেলায় নিয়োগ পেয়েছেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ তদবির করে জেলায় গেছেন। তাদের সিনিয়র আখ্যা দিয়ে লটারি করা হয়নি। অনেক কর্মকর্তা আছেন গত সরকারের আমলে সুবিধা নিয়েছেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারা ভোল্ট পাল্টে এখন কৌশলে সুবিধা নিচ্ছেন। ২৭ ও ২৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের লটারি করা হয়েছে। জেলার এসপি নিয়োগ পেয়েছেন ২৪ ব্যাচের ২ ও ২৫ ব্যাচের ৪২ জন। বাকিরা ২৭ ব্যাচের। যদিও লটারি করার ছবি প্রকাশ না করায় গুঞ্জন উঠেছে আসলে কি লটারি হয়েছে? মাস দুয়েক আগে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা নিজ কার্যালয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন সবার সামনে (সাংবাদিকসহ) লটারি করা হবে। পুলিশ সদর দপ্তরসহ ইউনিটগুলোতে আলোচনা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ এমন জেলা আছে যারা নিয়োগ পেয়েছেন তারা কখনো কোনো জেলায় কাজ করেননি। তারা কীভাবে পরিস্থিতি ঠিক রাখবেন, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। আওয়ামী লীগের অনেক ঘাঁটি আছে, ওইসব জেলাই বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর পরিস্থিতি বেশি ঘোলাটে হওয়ার আশঙ্কা আছে। আওয়ামী লীগের সমর্থন বেশির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন আছে বেশ কিছু জেলায়। আবার একাধিক জেলা আছে বিএনপির সমর্থক বেশি। প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি বাইরে গেলে নতুন এসপিরা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন না বলে আমাদের আশঙ্কা আছে। তারপরও আমরা এসব বিষয় নিয়ে বেশ সতর্ক আছি।

গোয়েন্দা সূত্র জানায়, গোয়েন্দা রিপোর্টের তথ্যনুযায়ী গোপালগঞ্জ, মাদারীপুর, শরীয়তপুর, ফরিদপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল, রাঙ্গামাটি, কিশোরগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, রাজবাড়ী, যশোর, বরিশাল, গাজীপুর, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ঢাকা জেলা, খুলনা, বান্দরবান, পাবনা, রাজশাহী, সিরাজগঞ্জ, মাগুরা, সিলেট, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, খাগড়াছড়ি, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা জেলাগুলো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এসব জেলার সদ্য নিয়োগ পাওয়া পুলিশ সুপারদের বেশি কষ্ট করতে হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। দলমত নির্বিশেষে অপরাধীদের ধরতেও বলা হয়েছে। তবে নতুন এলাকা হওয়ায় পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্য সদস্যদের সমস্যা হওয়ার শঙ্কা আছে। গত সোমবার প্রধান উপদেষ্টার বাসভবনে লটারির ড্র হয়। লটারির সময় কয়েকজন উপদেষ্টা, ভারপ্রাপ্ত আইজিপি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। ১৫ বছর ধরে পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পোস্টিং থেকে বঞ্চিত ছিলেন এমন অনেক কর্মকর্তা এবারের লটারির তালিকায় স্থান পাননি বলে অভিযোগ উঠেছে। বাদ পড়া ওই অংশটি ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে। তাদের অভিযোগ, যোগ্য ও নিষ্ঠাবানদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক বিবেচনায় ‘ফিট লিস্ট’ করা হয়।

তবে দুদিন আগে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানিয়েছেন, এসপি পদে পদায়নের জন্য প্রথমে মেধাবী ও যোগ্য কর্মকর্তাদের বাছাই করা হয়েছে। এরপর জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, আয়তন ও গুরুত্বের ভিত্তিতে জেলাগুলোকে ‘এ’, ‘বি’, ও ‘সি’ তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এ প্রক্রিয়ায় মেধাবীরা কেউ বাদ পড়েননি এবং লটারি স্বচ্ছ হয়েছে।

পুলিশসংশ্লিষ্টরা জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পুলিশে ব্যাপক রদবদল করে বর্তমান সরকার। নির্বাচন সামনে রেখে রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও থানার ওসিদের রদবদল করার পরিকল্পনা নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর। তাদের বদলি করা নিয়ে নানা ধরনের নাটকীয়তা হয়েছে। গত বছরের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের ওপর গুলিবর্ষণ ও অতিরিক্ত বল প্রয়োগের ঘটনার পর পুলিশের সংস্কারের বিষয়টি সামনে আসে। পুলিশ সংস্কার কমিশনের সুপারিশেও পুলিশকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের বিষয়টি সামনে এসেছে। পাশাপাশি বেশ কিছু সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি পুলিশ কমিশন গঠন করে কমিশনের অধীনে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। পুলিশ কর্মকর্তারাও চাচ্ছেন পুলিশের নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি কমিশনের অধীনেই হোক। সাবেক পুলিশ কর্মকর্তারাও পুলিশ কমিশন গঠনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে অভ্যুত্থানের পরও এখনো পুলিশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সমস্যার মধ্যেই আছে। পুলিশের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, বিগত সরকারের ছত্রছায়ায় একশ্রেণির দলবাজ, লাইনবাজ, ঘুষখোর পুলিশ কর্মকর্তার ছত্রছায়ায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়োগ বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্য হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য হয়েছে। আমরা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে আর ব্যবহৃত হতে চাই না। এসপি পদায়নের পরের ধাপে থানার ওসি নিয়োগও লটারির ভিত্তিতে করা হবে। আগামী রবিবার ওসিদের বদলির প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। এজন্য সৎ, নিরপেক্ষ ও যোগ্য পরিদর্শকদের তালিকা এরই মধ্যে ইউনিটপ্রধানদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। সেখানেও যদি একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে বিতর্ক এড়ানো কঠিন হয়ে যাবে।