গ্রামে আ.লীগ সক্রিয় টেলিগ্রামে

অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে মাঠের রাজনীতিতে নিষিদ্ধ দলটি। কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীদের অধিকাংশের নামে মামলা, বেশিরভাগ এলাকা ছাড়া হওয়ায় তাদের কার্যক্রম এখন অনলাইনকেন্দ্রিক। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা, উপজেলা পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ করে আলোচনা-সমালোচনাও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। কর্মী-সমর্থকদের চাঙ্গা রাখতে গ্রুপগুলোতে শেখ হাসিনার রায়সহ সমাজের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা, তর্ক-বিতর্ক, ঝটিকা মিছিল নিয়ে আলোচনা হয়। দিনশেষে রাতে সবাই যুক্ত হন গ্রুপগুলোতে। কর্মী-সমর্থকদের সুবিধা-অসুবিধার আলোচনাসহ অন্তর্বর্তী সরকার, বিএনপি, জামায়াত, এনসিপির কার্যক্রম নিয়ে নানা ব্যঙ্গ ও সমালোচনার ঝড় ওঠে রাত্রিকালীন অনলাইন ‘আড্ডায়’। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টিকটকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো সম্পর্কে তৃণমূল পর্যায়ে (গ্রাম এলাকা) আগে থেকেই ধারণা ছিল। অনেকে যুক্ত আছেন উল্লিখিত মাধ্যমগুলোতে। তবে এবার আওয়ামী লীগ তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ভিন্ন একটি মাধ্যমে সক্রিয় করতে শুরু করেছে। প্রচলিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো থেকে বেরিয়ে নতুন করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা যুক্ত হচ্ছেন টেলিগ্রামে। দেশের গোয়েন্দাসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

সূত্র বলছে, টেলিগ্রামে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন ও থানাভিত্তিক ভিন্ন ভিন্ন গ্রুপ করে কর্মী-সমর্থকদের যুক্ত করা হচ্ছে। তাদের চাঙ্গা রাখতে বিভিন্ন ভরসামূলক ভাষণও দেওয়া হয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের কার্যক্রম বিষয়েও সমালোচনা করা হয় ওই গ্রুপগুলোতে।

সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এক সময়ে কেন্দ্রীয় নেতাকর্মীরা টেলিগ্রামের মাধ্যমে যোগাযোগ রাখতেন। এখন তৃণমূলদেরও এ প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হচ্ছে। টেলিগ্রাম অনেক নিরাপদ হওয়ায় এ মাধ্যমটি বেছে নিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। দলের ক্রান্তিকালে কর্মী-সমর্থকের খোঁজখবর না রাখলে দলটি আরও নিঃস্ব হয়ে পড়ার শঙ্কায় সবাইকে টেলিগ্রামে যুক্ত করা হচ্ছে। তবে পুলিশ বলছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও নজর রয়েছে তাদের। 

গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর থেকে মাঠে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা টেলিগ্রামে যোগাযোগ শুরু করেন। গ্রুপ করে সক্রিয় হন দলটির সাবেক মন্ত্রী-এমপিরা, কেন্দ্রীয় নেতারা ও মহানগরীর নেতারা। এ ছাড়া দলটির অঙ্গসংগঠনেরও বিভিন্ন সক্রিয় গ্রুপ ছিল টেলিগ্রামে। এবার সেখানে গ্রামের নেতাকর্মীরাও সক্রিয়। গ্রুপগুলোতে এলাকাভিত্তিক আলোচনা-সমালোচনা, কর্মীদের সুবিধা-অসুবিধা ও নিরাপত্তার বিষয়গুলো তুলে ধরা হচ্ছে। রাত্রিকালীন মিছিল-মিটিংসহ নানা কার্যক্রমের ছবি, ভিডিও দিয়ে উৎফুল্ল রাখার চেষ্টা করা হয় কর্মী-সমার্থকদের। একজন থেকে দুজন, দুজন থেকে চারজন এভাবে এলাকাভিত্তিক সব কর্মীকে টেলিগ্রামে যুক্ত হতে নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে। দ্রুত খবর পৌঁছাতে ও জানতে সক্রিয় থাকছেন সবাই।

আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর এলাকাভিত্তিক ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানার নেতাকর্মীদের নামে মামলা হওয়ায় পলাতক রয়েছেন অনেকে। নিরাপদ স্থানে থেকে এলাকাভিত্তিক রাজনীতি করছেন তারা। মাঠে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর থেকে টেলিগ্রামে গ্রুপ করে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন তারা। দেখা গেছে, দেশের দ্বীপ জেলা ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলার শম্ভুপুর ইউনিয়ন, সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ থানার তারালী ইউনিয়ন, দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার আলোকঝাড়ি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা সক্রিয় টেলিগ্রাম গ্রুপে। প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়ন, থানা ও উপজেলার নেতারা রাত হলেই সেখানে সক্রিয় হচ্ছেন।

দক্ষিণাঞ্চলের একটি উপজেলার ছাত্রলীগের এক আহ্বায়ক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কর্মী-সমর্থকদের খোঁজখবর, সুবিধা-অসুবিধা নিতেই টেলিগ্রামে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা হয়। দলের ভালো সময়ে কর্মীদের পাশে থাকার চেয়ে খারাপ সময়ে তাদের পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ। কর্মী-সমর্থকদের খোঁজ নেওয়ার মধ্যেই দলকে চাঙ্গা রাখা হচ্ছে। আর আওয়ামী লীগ করা কোনো পাপের কিছু নয়। দলের খারাপ সময় ভালো সময় আসবে। দলকে ভালোবাসতে হলে সবার আগে কর্মীদের খোঁজ নেওয়া জরুরি বলে আমি মনে করি।’

এদিকে টেলিগ্রামে ‘ধানমন্ডী ৩২ নম্বর...’ নামের একটি গ্রুপে সবশেষ গতকাল শুক্রবার টানা চার ঘণ্টা ধরে চলে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ভার্চুয়াল আলোচনা। এই গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৩৬ হাজার ৮৩৭ জন। সবসময় সক্রিয়া দেখা যায় দুই-তিন হাজার সদস্য। দলীয় কার্যক্রম, শেখ হাসিনার রায় নিয়ে আলোচনা, হাসিনার দেশে ফেরা ও বর্তমান সরকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয় গ্রুপটিতে।

গতকাল সন্ধ্যায় ‘ধানমন্ডী ৩২ নম্বর...’ গ্রুপে এমএ তাহের নামে আওয়ামী লীগের এক কর্মী পোস্টে উল্লেখ করেন, ‘সত্যিই কি কাউন্টডাউন শুরু? ৩০ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারত-বাংলাদেশ এবং ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে কী কী ঘটে খেয়াল রাখুন। সেসব ঘটনার বাস্তবতায় ৬ ডিসেম্বর তারিখে ৪৫টা দেশের রাষ্ট্রদূতদের এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়ার সামনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জননেত্রী শেখ হাসিনা যদি দেশে ফেরার তারিখ ঘোষণা করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চেয়ে ভাষণ দেন, অথবা ৭ থেকে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে যদি যমুনা ঘেরাও হয় এবং তিনি যদি বাংলাদেশে ফিরে আসেন এবং ড. ইউনূস যদি গ্রেপ্তার হন অথবা পালিয়ে যান, আমি কিন্তু অবাক হবো না। সরকার ভূমিকম্প হবার কাল্পনিক ভয় দেখিয়ে সবাইকে ৭ ডিসেম্বরের মধ্যে ঢাকা ত্যাগ করার কথা বলছে। তাতে কি কাজ হবে? আগামী ২-৩ দিনের মধ্যে যে কর্মসূচি আসছে, তাতে পরিস্থিতি এ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। রাজনীতিতে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটবে এবং শেখ হাসিনা বীরের বেশে ফিরে আসবেন বাংলাদেশে।’

মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর অনলাইন প্ল্যাটফর্মকেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের বেশ কার্যক্রম দেখা যায়। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক, টেলিগ্রাম, এক্সসহ (সাবেক টুইটার) বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম দলটির নেতাকর্মীরা সক্রিয় হয়। এরপরই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের কার্যক্রম বন্ধের পদক্ষেপ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর অ্যাকাউন্ট, পেজ ও গ্রুপ  ‘ব্লক’ করতে দেশের ইন্টারনেট সেবা দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিঠি দেয় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সম্পর্কিত কনটেন্ট সরিয়ে নিতে বলা হয়। বিটিআরসিকে চিঠি দেয় জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা এজেন্সি। এ চিঠি পর্যন্তই থেমে যায় সরকারের কার্যক্রম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিটিআরসি সিনিয়র সহকারী পরিচালক আবদুল হালিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অনলাইনকেন্দ্রিক আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এর পরবর্তী খবর আমার জানা নেই। তবে গত অক্টোবরে টেলিগ্রামকে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের বিষয়গুলো উল্লেখ করে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, ‘আমাদের সাইবার টিম সবসময় অ্যাকটিভ রয়েছে। নিষিদ্ধ গোষ্ঠীর অনলাইন-অফলাইন যেকোনো কার্যক্রমেই আমাদের একাধিক টিমের নজর রয়েছে।’