বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (ববি) ২৫টি বিভাগে প্রায় ৩ হাজার ৮৪১ জন নারী শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষায় অংশ নিতে তাদের বড় একটি অংশ প্রতিদিন ক্যাম্পাসে উপস্থিত হন। কিন্তু প্রতিদিনই তাদের পোহাতে হয় চরম ভোগান্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি একাডেমিক ভবন ও দুটি প্রশাসনিক ভবনে নারীদের জন্য রয়েছে মাত্র তিনটি শৌচাগার। ফলে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ নিয়ে ক্লাস-পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় তাদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসে দুটি একাডেমিক ভবন ও দুটি প্রশাসনিক ভবন রয়েছে। এসব ভবনে সাতটি অনুষদের অধীনে ২৫টি বিভাগের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২৫টি বিভাগে মোট শিক্ষার্থী ৯,৫৮৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ শিক্ষার্থী ৫,৭৪৫ জন এবং নারী শিক্ষার্থী ৩,৮৪১ জন। পুরো ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ওয়াশরুম রয়েছে মাত্র ১৪টি। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ মাত্র তিনটি। প্রয়োজনের তুলনায় এ সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অধিকাংশ শৌচাগারই অপরিচ্ছন্ন, জরাজীর্ণ এবং ব্যবহারের অনুপযোগী। বেশ কয়েকটি শৌচাগারের বেসিনের কল নষ্ট, সাবান বা হ্যান্ডওয়াশের কোনো ব্যবস্থা নেই। অনেক স্থানে হাত ধোয়ার উপযোগী পরিবেশও নেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখা সূত্রে জানা যায়, একাডেমিক ভবন-১-এর প্রথম, চতুর্থ ও পঞ্চম তলায় শুধু পুরুষদের জন্য একটি করে ওয়াশরুম রয়েছে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় নারীদের জন্য একটি করে বরাদ্দ। ষষ্ঠ তলার ওয়াশরুমটি নারী-পুরুষ যৌথভাবে ব্যবহার করেন। একাডেমিক ভবন-২-এ নারীদের জন্য শুধু পঞ্চম তলায় একটি ওয়াশরুম আছে। প্রথম, দ্বিতীয় ও চতুর্থ তলায় কেবল পুরুষদের। তৃতীয় তলায় ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের সামনের ওয়াশরুমটি দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। ষষ্ঠ তলার ওয়াশরুমটিও নারী-পুরুষ যৌথ।
ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী ইউসুফ আলী তাওহীদ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৌচাগার ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও হতাশাজনক।’
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ২০২৩-২৪ সেশনের শিক্ষার্থী সুমাইয়া সিরাজ সিমি বলেন, ‘বেশিরভাগ শৌচাগারের দরজা ভাঙা, লক নেই, পানি থাকে না, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতার বালাই নেই। কোথাও দাঁড়ালেই তীব্র দুর্গন্ধে শ্বাস নেওয়া দায়। মেয়েদের জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সুবিধা স্যানিটারি ন্যাপকিন ডিসপেনসার, ডিসপোজাল বিন, হ্যান্ডওয়াশ, টিস্যু, জীবাণুনাশক স্প্রে কিছুই নেই। ফলে মাসিকের সময় অনেক মেয়ে চরম বিব্রতকর ও সংকটময় পরিস্থিতির শিকার হয়।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০২০-২১ সেশনের শিক্ষার্থী উম্মে সিরাতুন্নেসা বলেন, ‘শৌচাগার মানে প্রাইভেট জায়গা। কিন্তু এখানে প্রাইভেসি বলতে কিছু নেই। অনেক সময় শৌচাগারে যাওয়ার সময় বা বেরোনোর আগে ছেলেদের দেখে আর যেতে ইচ্ছা করে না। মেয়েদের জন্য পর্যাপ্ত আলাদা ও নিরাপদ শৌচাগার নেই। এটা সত্যিই হতাশাজনক।
কম্বাইন্ড শৌচাগার ব্যবস্থা আমি আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখিনি। আমরা চাই, দ্রুত মেয়েদের জন্য আলাদা, পর্যাপ্ত ও নিরাপদ শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হোক।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট শাখার প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. হারুন অর রশিদ জানান, দুটি একাডেমিক ও দুটি প্রশাসনিক, এই চারটি ছয়তলা ভবনের পরিচ্ছন্নতার জন্য রয়েছেন মাত্র সাতজন কর্মী। প্রতি একাডেমিক ভবনে দুজন করে চারজন, প্রশাসনিক ভবনে তিনজন। এই সংখ্যক কর্মী দিয়ে পূর্ণাঙ্গ পরিচ্ছন্নতা সম্ভব নয়। এ ছাড়া তাদের প্রায়ই ভবনের বাইরের কাজেও লাগানো হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ তৌফিক আলম বলেন, ‘একাডেমিক ভবনগুলোতে ওয়াশরুমের বড় সংকট রয়েছে। নতুন ভবন নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের কষ্ট সহ্য করেই এই শৌচাগারগুলো ব্যবহার করতে হবে।’