বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, মূলত বাংলাদেশে গণতন্ত্র এখন মৃত। বাংলাদেশে ‘গণতন্ত্র মৃত্যুশয্যায়’ এই কথাটি আগেই বলেছিল ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। প্রতিষ্ঠানটি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ভবিষ্যতের জন্য ‘অশনি সংকেত’ হিসেবে উল্লেখ করে এমন মন্তব্য করেছিল। গত ২০ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পুনর্বহাল করা হয়েছে। বাংলাদেশের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগেও ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোতে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। এই সময়ে কোনো একটি দল পরপর দুবার ক্ষমতায় আসতে পারেনি। ক্ষমতার পালাবদলের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে, ক্ষমতাসীন সরকারের পক্ষেও পুনরায় ক্ষমতায় আসা অনিশ্চিত। ফলে, ২০১১ সালে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। এ বিলুপ্তির প্রধান কারণ ছিল, উচ্চআদালত ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে এবং একটি সাংবিধানিক সংকট দেখা দেয়, যেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। সংকট দূর করতে ১৯৯৬ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সাংবিধানিক রূপ পায়, কিন্তু ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীতে এটি বিলুপ্ত করা হয়।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয় নির্বাচন হয়েছে ১২টি। এর মধ্যে চারটি নির্বাচন হয় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, বাকিগুলো দলীয় সরকার বা সামরিক শাসনের অধীনে। অধিকাংশ নির্বাচনের পরই অভিযোগ উঠেছে কারচুপি আর অনিয়মের। ১২টি নির্বাচনেই জনগণ ক্ষমতাসীন সরকারের ওপর বিরূপ ছিল। এ কারণেই, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ৪টি নির্বাচনেই ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে। পালাবদলের কারণ, ‘বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, একজন সংসদ সদস্যের মাসিক বেতন ৫৫,০০০ টাকা, নির্বাচনী এলাকার ভাতা প্রতিমাসে ১২,৫০০ টাকা, সম্মানী ভাতা প্রতিমাসে ৫,০০০ টাকা, শুল্কমুক্তভাবে গাড়ি আমদানির সুবিধা, মাসিক পরিবহন ভাতা ৭০,০০০ টাকা, নির্বাচনী এলাকায় অফিস খরচের জন্য প্রতিমাসে ১৫,০০০ টাকা, প্রতিমাসে লন্ড্রি ভাতা ১,৫০০ টাকা, মাসিক ক্রোকারিজ, টয়লেট্রিজ কেনার জন্য ভাতা ৬,০০০ টাকা, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ খরচ ১,২০,০০০ টাকা, স্বেচ্ছাধীন তহবিল বার্ষিক ৫ লাখ টাকা, বাসায় টেলিফোন ভাতা বাবদ প্রতিমাসে ৭,৮০০ টাকা। সংসদ সদস্যদের জন্য সংসদ ভবন এলাকায় এমপি হোস্টেল আছে। এছাড়া ২০১৫-২০১৯ সাল পর্যন্ত একজন সংসদ সদস্য প্রতিবছর ৪ কোটি টাকা করে থোক বরাদ্দ পান। এই থোক বরাদ্দের পরিমাণ আগে ছিল ২ কোটি টাকা। এই বরাদ্দের টাকা তিনি যে কোনো উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার করতে পারবেন।’ (সূত্র : বিবিসি বাংলা)। টাকাসহ এত সুযোগ-সুবিধার বিনিময়ে একজন সাংসদের কাছে জনগণ যে সেবা আশা করেছিল, সে সেবা পায়নি। পক্ষান্তরে এত ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে সরকার থেকে যে প্রাপ্তি, সে প্রাপ্তিতে মনে হয় অতৃপ্ত সংসদও। কারণ সাংসদ একা নয়, তার রয়েছে বাহিনী। প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়নসহ বাহিনী পালন অপরিহার্য। এই সংস্কৃতি ঢুকে পড়েছিল স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও। আমার দেখা একটি স্থানীয় সরকারের নির্বাচন চিত্র নিম্নে হুবহু উল্লেখ করা হলো। ‘সকাল ৮টার দিকে খবর পাই, বিশেষ প্রতীক ছাড়া অন্য কোনো প্রতীকের এজেন্ট কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এ ব্যাপারে আমি যেন সাহায্য করি।
ব্যাপারটি আমার কাছে খুবই খারাপ লাগে। আমি অপরাপর প্রতীকের এজেন্টদের সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রের দিকে রওনা হই। তখন সকাল সাড়ে ৮টা। এজেন্টসহ আমার পেছনে পেছনে রওনা হয় শতাধিক ভীতসন্ত্রস্ত মানুষ। কেন্দ্রের কাছে যেতেই, বিশেষ প্রতীকের লিডার এগিয়ে আসেন, আমার সঙ্গে কথা বলার জন্য। ‘এজেন্টদের ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না কেন’ জানতে চাইলে বলেন, ‘এজেন্ট দিতে হবে আমাদের কথা মতো। নয়তো কেন্দ্রে গণ্ডগোল হবে। আপনি কি চান কেন্দ্রে গণ্ডগোল হোক।’ আমি প্রতিবাদ করে বলি, ‘এজেন্ট হয় প্রার্থীর কথামতো।’ ‘প্রার্থীর কথামতো এজেন্ট দিতে গেলেই গণ্ডগোল হবে, কেন্দ্রে যাতে গণ্ডগোল না হয় সে দায়িত্ব নিয়েছি আমরা। সরকারের কড়া নির্দেশ, শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করা। শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন করার জন্য যা যা করতে হয় সবকিছু করার দায়িত্ব আমাদের’। এ কথার পর আমি বলতে বাধ্য হই, ‘সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ হবে প্রতিপক্ষের লোকজনকে কেন্দ্রে ঢুকতে না দিলে মাথাও নেই ব্যথাও নেই’। বিশেষ করে বিশেষ প্রতীকের একজনের নাম ধরে বলেছি আমরা ‘অমুককে’ এজেন্ট হিসেবে কিছুতেই কেন্দ্র প্রবেশ করতে দেব না। এক কথায় অমুক প্রতীকের কোনো এজেন্ট এ কেন্দ্রে চাই না। এ জন্য যা যা করতে হয় সব করতে প্রস্তুত। জোর করে ঢুকতে চাইলে, আমার লাশের ওপর দিয়ে ঢুকতে হবে’। এমন কথা বলতেই পায়ের কাছে নত হয়ে, ‘আপনার দুটি পায়ে পড়ি, আমাকে বেয়াদব বানাবেন না, আপনি আপনার ভোটটা আপনার মনমতো দিয়ে যান, কেউ কিচ্ছু বলবে না’। কাল থেকে যে কয়টি ছেলে আমার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছে তারা আমার মতো কথার প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, উচিত কথা বলতে গিয়েও সংকুচিত হয়ে পড়ে। আমার গাঁয়ে আমার ছেলেদের কারণে জনগণ, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করতে পারছে না দেখে পাথর হয়ে যাই। আমি ভোট দিয়ে বাড়ি আসার পর, গাঁয়ের ভোট দিতে না পারা লোকজন বাড়তে থাকে। তারা আমাদের উঠানে জড়ো হতে শুরু করে। সবাই ভোটকেন্দ্র থেকে ফিরে এসে এ মর্মে অভিযোগ করেন যে ‘ভোট দিতে গিয়েছিলাম, দিতে পারিনি। আঙুলে কালি লাগিয়ে বলে, যাও তোমার ভোট দেওয়া হয়ে গেছে’। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরিস্থিতির বর্ণনাসহ বসে বসে টাস্কফোর্স প্রধান (নির্বাচনী) বরাবর দরখাস্ত লিখি। নির্বাহী কর্মকর্তা, ওসি, কন্ট্রোলরুমসহ বিভিন্ন স্থানে টেলিফোন করি। টেলিফোন করে, ‘ভোটাররা যাতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে’ এ মর্মে কাতর অনুরোধ জানাই। কর্তৃপক্ষের কেউ কেউ ‘ব্যবস্থা নিই, নিচ্ছি’ বলে আশ্বাসও দেয়। সমবেত জনতা জোর করে ভোটাধিকার প্রয়োগের উদ্যোগ নিয়েছিল। বারণ করেছি। কারণ, নির্বাচনী নতুন আইনে ব্যালট পেপার কিংবা ব্যালট বাক্স রক্ষার জন্য গুলি করা জায়েজ। এনকাউন্টার করে মারার সমর্থনে অতিরিক্ত একটা গুলি খরচ করতে হয়, যা অনেক সময়ই জোগাড় করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। নির্বাচনী কেন্দ্রের এনকাউন্টারে মৃত ব্যক্তির পাশে গুলি কিংবা পিস্তলের পরিবর্তে কয়েকটা ব্যালট পেপারই যথেষ্ট। তাই সংক্ষুব্ধ ভোটারদের বলেছি, ‘কর্তৃপক্ষ আসছে, তোমাদের ভোট প্রয়োগের ব্যবস্থা না করে যাবে না’। বেলা ২টার পরে স্পিডবোটে করে যখন আর্মিসহ ম্যাজিস্ট্রেট আসেন তখন ভোট কাটা প্রায় শেষ।
কেন্দ্রে ভোটার ছিল না বললেই চলে। ‘উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে’ মর্মে প্রিসাইডিং অফিসারের রিপোর্ট নিয়ে ফিরে যাওয়ার পথে আমাদের লিখিত দরখাস্তটি দিতে চেয়েছিলাম। ম্যাজিস্ট্রেট সাহেব তিলেক মাত্র ভ্রুক্ষেপ না করে হনহন করে চলে যান।’ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর, বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য পাঠানো ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই) এবং ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) কারিগরি মূল্যায়ন মিশন (টেকনিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট মিশন বা টিএএম) তাদের ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে যুক্তরাজ্য-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ) চলতি বছরের ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘গণতান্ত্রিক’ কিংবা ‘ত্রুটিপূর্ণ গণতান্ত্রিক’ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম ছিল না। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের বড় বড় সংবাদপত্রগুলো ক্ষমতাসীন সরকার, রাষ্ট্রীয় সংস্থা এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে কিছু মাত্রায় সমালোচনা করতে পেরেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নির্বাচনটিকে ‘প্রহসন’ এবং ‘সাজানো’ বলে আখ্যা দেওয়া হয়, তৎসঙ্গে বলা হয় বাংলাদেশে গণতন্ত্র ‘মৃত্যুশয্যায়।’ জনগণের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির গরমিলের কারণে বারবার সরকার বদল হয়।
বাংলাদেশে গণতন্ত্র ‘মৃত্যুশয্যায়’ থাকাকালে, নির্বাচন বঞ্চিত মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ জমতে থাকে। গণতন্ত্রের মুমূর্ষু অবস্থা দেখে শুরু হয়, সরকারি দলের মাথাব্যথা। এই কারণে ২০১১ সালে মাথাটাই কেটে ফেলা (তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল) হয়। বছরের পর বছর সঞ্চিত ক্ষোভ জমতে জমতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভূমিকম্প সৃষ্টি হয়। এই ভূমিকম্প ২০১১ সাল থেকে সঞ্চিত ক্ষোভের প্রকাশ। ক্ষমতা থেকে তারা উৎখাত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সমূলে নয়। সাধারণ জনগণ অপেক্ষায় আছেন, তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির গরমিলের শুরু হলেই শুরু হবে আবার উত্থান। যারা ক্ষমতায় আসবেন তাদের জন্য অগ্রিম অশনি সংকেত আজকের স্বর্গ-নরকের গল্প। স্বর্গ-নরকের গল্পটি হলো একজন জ্ঞানী ঋষিকে নিয়ে। যিনি ভগবানকে জিজ্ঞাসা করেন- স্বর্গ এবং নরকের মধ্যে পার্থক্য কী? উত্তরে ভগবান বলেন, মৃত্যুর আগে স্বর্গ-নরক দেখার সুযোগ নেই। তবে স্বর্গীয় রাজ্য এবং নারকীয় রাজ্য দেখার সুযোগ আছে। নারকীয় রাজ্য হলো এমন এক রাজ্য, যেখানে মানুষ একে অপরের প্রতি ঈর্ষাপরায়ণ ও স্বার্থপর। তারা নিজের খাবার থাকা সত্ত্বেও, অন্যের খাবার কেড়ে নিতে ব্যস্ত থাকে। আর স্বর্গীয় রাজ্য হলো এমন এক রাজ্য যেখানে মানুষ একে অপরের প্রতি দয়ালু, সহানুভূতিশীল এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের চাহিদা পূরণ করে। তারা একে অপরের যতœ নেয় এবং তৃপ্ত থাকে। ভগবান ঋষিকে নারকীয় রাজ্যে নিয়ে যান, যেখানে তিনি দেখেন যে বিশাল ভোজসভায় যথেষ্ট খাবার থাকা সত্ত্বেও মানুষ একে অপরের খাবার কেড়ে নিচ্ছে। এরপর ঋষিকে স্বর্গীয় রাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন তিনি দেখেন যে, সেখানে মানুষ একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল ও মানবীয়। একজন অন্যজনের প্রতি খাবার এগিয়ে দিচ্ছে। একে অপরের প্রতি সদয় এবং তৃপ্ত। এ গল্পের মূল বিষয় হলো, একই পরিস্থিতিতে মানুষ কীভাবে তাদের চিন্তা ও আচরণের মাধ্যমে নিজেদের মধ্যে স্বর্গ বা নরক তৈরি করতে পারে। একই পরিবেশ, খাবার এবং সুযোগ থাকা সত্ত্বেও, মানুষের আচরণই নির্ধারণ করে যে- তারা নরকে না স্বর্গে বাস করবে। আধ্যাত্মিক অর্থে স্বর্গ বা নরক কোনো স্থান নয়, বরং মানসিক অবস্থা। ভালো কাজ এবং ইতিবাচক চিন্তাভাবনা জীবনে স্বর্গ নিয়ে আসে, আর নেতিবাচক চিন্তাভাবনা ও কাজ নরক সৃষ্টি করে।
লেখক: আইনজীবী ও কথাসাহিত্যিক
adv.zainulabedin@gmail.com