শোষণমুক্তির স্বপ্নে নতুন ‘যুক্তফ্রন্ট’

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের গণ-আকাক্সক্ষা এ দুই ঐতিহাসিক ভিত্তিকে সামনে রেখে দেশের বামপন্থি দলগুলো ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ নামে এক নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের ঘোষণা দিয়েছে। গত শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও বাংলাদেশ জাসদের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত জাতীয় কনভেনশন থেকে এই মঞ্চের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। ফ্রন্টের মূল লক্ষ্য সুনির্দিষ্ট : গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভোটাধিকার নিশ্চিতকরণ এবং শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ কায়েম করা। বামপন্থি দলগুলোর বৃহত্তর ঐক্য এমন এক সময়ে এলো যখন দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজ কাঠামো গভীর সংকটে নিমজ্জিত। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সর্বশেষ বার্ষিক জরিপ অনুসারে, দেশের ৯৩% মানুষ মনে করে ‘দুর্নীতি’ একটি ভয়াবহ সমস্যা, যা বিদ্যমান ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাহীনতাকে প্রমাণ করে। এই দুর্নীতি-লুণ্ঠন ও নৈরাজ্যের বিপরীতে একটি শক্তিশালী বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি গড়ে তোলা এ উদ্যোগের প্রধান উদ্দেশ্য। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন মেরুকরণ বা ঐক্যবদ্ধ বাম-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সূচনা করতে পারে।

‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ গঠন বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। বামপন্থি বুদ্ধিজীবী ও নেতারা মনে করেন, গতানুগতিক বুর্জোয়া রাজনীতির বৃত্ত ভেঙে বেরিয়ে এসে জনগণের নিজস্ব রাজনৈতিক শক্তি প্রতিষ্ঠার সময় এসেছে। তাদের মতে, ২৪-এর গণঅভ্যুত্থান স্বৈরাচারের পতন ঘটালেও, কাঠামোগত পরিবর্তন এবং জনগণের কাক্সিক্ষত মুক্তি এখনো আসেনি। বরং গত এক দশকে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও পুঁজির কেন্দ্রীভবন উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে গিনি সহগ, যা বৈষম্যের পরিমাপক, তা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে দেশের শীর্ষ ১% ধনী জনগোষ্ঠীর হাতে দেশের মোট আয়ের প্রায় ৪৩% কেন্দ্রীভূত। এ পরিসংখ্যান স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়, মুক্তিযুদ্ধের সাম্যের চেতনা বাস্তবায়নে রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে। উপরন্তু সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্যমতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশ থেকে অর্থ পাচার একটি গুরুতর সমস্যায় রূপ নিয়েছে, যার বার্ষিক পরিমাণ হাজার হাজার কোটি টাকা। এই অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও লুণ্ঠনের রাজনীতির বিরুদ্ধে শ্রমজীবী, কৃষক ও মেহনতি মানুষের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করাই ফ্রন্টের মূল অঙ্গীকার। কনভেনশন থেকে গৃহীত ৭ দফা রাজনৈতিক প্রস্তাব এবং ‘জনতার সনদ’ ফ্রন্টের কর্মসূচির মূল ভিত্তি। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো, জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা এবং নির্বাচনকালীন একটি নিরপেক্ষ ও কার্যকর সরকার কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের এ উদ্যোগ কি দেশে মুক্তিযুদ্ধ চেতনার নতুন উন্মেষ জাগাতে পারে? এই প্রশ্নটির উত্তর এই জোটের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যেই নিহিত। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের কেন্দ্রীয় চেতনা ছিল  ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ও শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতি থেকে রাষ্ট্র বিচ্যুত হয়েছে, যার ফলে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর উত্থান সমাজের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে। এই ফ্রন্টের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা এবং ধর্মাশ্রয়ী গোষ্ঠীর উত্থান প্রতিহত করা। তারা মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনাকে ধারণ করে গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই শুধু জনগণের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। এই জোটের মাধ্যমে যদি শ্রমিক-কৃষক-নারী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলা যায়, তবে তা শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তন নয়, বরং সমাজে একটি ব্যাপক সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনতে পারে। গত বছরের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে যে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের স্পৃহা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য অবসানের দাবি সমাজে প্রবলভাবে বিদ্যমান। এই ফ্রন্ট সেই স্পৃহাকে সাংগঠনিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে বিভিন্ন বিষয়ে। জোটের নাম হিসেবে ‘যুক্তফ্রন্ট’ শব্দটি বেছে নেওয়া হয়েছে, যা দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি ঐতিহ্য বহন করে। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট, যার নেতৃত্বে ছিলেন শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও মওলানা ভাসানীর মতো নেতারা। সেটি ছিল তদানীন্তন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মাধ্যমে বাঙালির স্বায়ত্তশাসন ও জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষার প্রথম বড় বিজয়। এই নাম ব্যবহার করে বামপন্থি দলগুলো জনগণের মধ্যে সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মৃতি এবং বিকল্প শক্তির উত্থানের প্রত্যাশা জাগাতে চাইছে। এই জোটের উদ্যোক্তারা এটিকে শুধু নির্বাচনকেন্দ্রিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখতে চান না। এই ফ্রন্টের ঘোষিত কর্মসূচিতে জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদকে কার্যকরভাবে শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্যকর বিকেন্দ্রীকরণ না থাকলে কেন্দ্রীয় সরকারের দুর্নীতি ও স্বৈরাচারী প্রবণতা সহজে প্রতিরোধ করা যায় না। বাংলাদেশে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকে এবং তাদের নিজস্ব আর্থিক স্বাধীনতা সীমিত। ফ্রন্ট যদি স্থানীয় সরকারগুলোকে সত্যিকার অর্থে স্বশাসিত এবং জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের আন্দোলন গড়ে তুলতে পারে, তবে এটি গণতন্ত্রকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হতে পারে, যা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। যুক্তফ্রন্ট প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো তরুণ সমাজ এবং শিক্ষার্থীদের সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্ম, যারা কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো ঐতিহাসিক ইভেন্টগুলোতে তাদের শক্তি দেখিয়েছে। এই তরুণ সমাজ গতানুগতিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থা হারিয়েছে এবং তারা নীতিভিত্তিক, দুর্নীতিমুক্ত রাজনীতিতে আগ্রহী। বামপন্থি দলগুলোর জন্য মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারা ঐতিহ্যগতভাবে শ্রেণি-সংগ্রাম এবং আদর্শিক রাজনীতির কথা বললেও, তরুণদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা অনেকটা দুর্বল।

গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট যদি কর্মসূচিতে বেকারত্ব নিরসন, শিক্ষাব্যবস্থার মানোন্নয়ন এবং বিজ্ঞানভিত্তিক প্রগতিশীল সমাজ গড়ার সুস্পষ্ট রূপরেখা দিতে পারে, তাহলে বিষয়টি তরুণ ভোটারকে আকৃষ্ট করবে। ফ্রন্টের সফলতার জন্য সাইবার স্পেস ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের বার্তা কার্যকরভাবে পৌঁছানো দরকার। বর্তমান রাজনৈতিক আন্দোলনে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তরুণদের এই অংশগ্রহণ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার নতুন বাহক তৈরি করবে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এই জোটের অন্যতম বৃহৎ চ্যালেঞ্জ হলো রাজনৈতিক অর্থায়ন এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার সংস্কার। বামপন্থি দলগুলোর হাতে বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক সংস্থান থাকে না, যা বর্তমান নির্বাচনী রাজনীতিতে একটি বড় বাধা। বুর্জোয়া দলগুলো প্রায়ই কালো টাকা এবং করপোরেট অনুদান ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রভাব বিস্তার করে। এ প্রেক্ষাপটে, যুক্তফ্রন্টকে অবশ্যই স্বচ্ছ ও নৈতিক উপায়ে গণচাঁদার মাধ্যমে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হবে। এটি জনগণের কাছে আরও  গ্রহণযোগ্য করে তুলবে। উপরন্তু, তারা নির্বাচনী আইন ও পদ্ধতির সংস্কারের দাবি জানিয়েছে, যাতে ভোট কেনাবেচা বন্ধ হয় এবং সমান সুযোগের ক্ষেত্র নিশ্চিত করা যায়। তাদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, নির্বাচন কমিশনকে সত্যিকারের স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং নির্বাচনী ব্যয়কে আইনি কাঠামোর মধ্যে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা। এ ধরনের সংস্কারের আন্দোলন শুধু বামপন্থি দলগুলোর জন্য নয়, বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদন অনুসারে, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন এবং আইনের শাসনের দুর্বলতা গত কয়েক দশক ধরে একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। ফ্রন্ট এই শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করছে। তাদের কর্মসূচির মূল স্লোগান হলো ‘গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ’।

এর অর্থ হলো, শুধু নির্বাচনের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তন নয়, বরং ক্ষমতার ভারসাম্য নিশ্চিত করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদককে) প্রকৃত অর্থে শক্তিশালী করা। এই ফ্রন্টের লক্ষ্য হলো মুক্তিযুদ্ধের চেতনা অনুযায়ী একটি জবাবদিহিমূলক ও বহুত্ববাদী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্থায়ী গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এই ফ্রন্টের সামনে কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ অনেক। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত বামপন্থি দলগুলোর সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং বুর্জোয়া দলগুলোর সঙ্গে তাদের ভোটের ব্যবধান বড় বাধা। এ ছাড়াও বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ প্রভাবিত অর্থনৈতিক নীতির কারণে সৃষ্ট পুঁজিবাদী ধারা এবং সমাজে গেড়ে বসা দুর্নীতি ও মাফিয়াতন্ত্রের জাল ছিন্ন করা কঠিন কাজ। প্রথাগত মিডিয়ার বৃহত্তর অংশে বামপন্থি রাজনীতির স্থান প্রায় সীমিত, যা তাদের আদর্শিক বার্তা বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছাতে বাধা দেয়। উপরন্তু দীর্ঘদিনের ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক শক্তিগুলোর স্থানীয় পর্যায়ে যে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ও পেশিশক্তির প্রভাব রয়েছে, তা সদ্য সংগঠিত এই জোটের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের জন্য প্রায়ই নিরাপত্তাহীনতা ও বাধার সৃষ্টি করতে পারে। যদি ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’  তাদের ‘জনতার সনদ’কে তৃণমূল পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে, তবে এটি শুধু তৃতীয় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করবে না, বরং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ভিত্তিতে একটি শোষণমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নকে আবারও বাস্তবতার কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারবে।

লেখক:  সিইও, ইটিসি ইভেন্টস লিমিটেড

antora00111@gmail.com