কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফাঁসির রায়ের পর এবার দলের আরেক শীর্ষ নেতা ওবায়দুল কাদেরের মামলার বিচারের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। জুলাই-আগস্টে মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদনও সম্পন্নের পথে। শিগগির আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখায় প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি মাসেই মামলাটি বিচারের প্রক্রিয়ায় আসতে পারে বলে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন শাখা ও তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তাদের বক্তব্যের সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়াও যাদের আসামি করা হচ্ছে তারা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান।
গত বছর ১৫ জুলাই কোটাবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। আগের দিন সংবাদ সম্মেলনে ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা পাবে না তো কি রাজাকারের নাতিপুতিরা পাবে’ শেখ হাসিনার এমন মন্তব্যের পর ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ও আন্দোলন হয়। পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ছাত্রলীগই যথেষ্ট।’ দলের দুই শীর্ষ নেতার এমন বক্তব্যের পরপর আন্দোলন স্বতঃস্ফূর্ততা পায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার ঘটনা ঘটে। হামলায় আহত সাধারণ শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা প্রদানেও ছাত্রলীগের বাধা দেওয়ার জোরালো অভিযোগ ওঠে। ওবায়দুল কাদেরের ওইদিনের ছোট বাক্যটিই কোটাবিরোধী আন্দোলনকে গণঅভ্যুত্থানে পরিণত করে এবং সরকার পতনের উপলক্ষ তৈরি করে।
প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার দায়িত্বরতদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মাসেই ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট সাতজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রস্তুত করে প্রসিকিউশনে দাখিল করা হবে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এতে ওবায়দুল কাদের ও আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের উসকানি, প্ররোচনা, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা প্রদানে বাধা প্রদানসহ বেশ কিছু অভিযোগ আনা হচ্ছে।
তদন্ত সংস্থার দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে গত ২৭ নভেম্বর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ওবায়দুল কাদেরসহ আসামিদের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনটি প্রায় প্রস্তুত। ১৫ দিনের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে তা প্রসিকিউশনে দাখিল করা হবে। তবে আসামিদের বিরুদ্ধে কতটি অভিযোগ রয়েছে বা অন্য কোনো বিষয়ে বিস্তারিত বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামীম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘তদন্ত শেষ হলেই প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।’ ট্রাইব্যুনালের অন্য প্রসিকিউটর মোহাম্মদ মিজানুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের মামলাগুলো আস্তে আস্তে বিচারের পর্যায়ে আসবে। শিগগির কয়েকটি মামলার অভিযোগ আমরা পেয়ে যাব বলে আশা করি।’
ওবায়দুল কাদের ও অন্য আসামিদের মামলায় ডিজিটাল সাক্ষ্য (অডিও-ভিডিও রেকর্ড) সংগ্রহের বিষয়টির তদারকি করছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউর তানভীর হাসান জোহা। তিনি বলেন, জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের সময় মামলার সাত আসামির ভূমিকা বিষয়ে অডিও-ভিডিও রেকর্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের কাছে বার্তা দেওয়া হয় গত আগস্টে। যুবলীগের সভাপতি ফজলে শামস পরশের বিষয়টিকে ‘জরুরি’ উল্লেখ করা হয়। তানভীর হাসান জোহা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অডিও-ভিডিও রেকর্ড প্রস্তুত আছে। যেকোনো সময় তা হস্তান্তর করা হবে।’
অডিও রেকর্ডে আন্দোলনের সময় ওবায়দুল কাদেরের কিছু কথোপকথন পর্যালোচনা করা হয়েছে বলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অভ্যুত্থানের এক মাসের বেশি সময় ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে আওয়ামী লীগের শীর্ষ ও মধ্যমসারির নেতাদের অন্তত ৩০টি কথোপকথনের অডিও রেকর্ড হাতে এসেছে। কথোপকথনের তালিকায় আছেন শেখ হাসিনা, তখনকার আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা আজমসহ বেশ কয়েকজন।’
ব্যারিস্টার জোহা বলেন, ‘জুলাই-আগস্টে আওয়ামী লীগের যে কয়জন নেতা ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দলীয় কার্যক্রম ও বৈঠকে বেশি থাকতেন, তাদের একজন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তখনকার পরররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। সাবেক এ মন্ত্রীর মোবাইল ফোন থেকে ওবায়দুল কাদের, শেখ হাসিনা ও আরও কয়েকজন শীর্ষ নেতা, মন্ত্রী, পুলিশের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে কথা বলতেন এমন কিছু কল রেকর্ড পাওয়া গেছে।’
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার অসংখ্য কল রেকর্ড পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তার কথার মধ্যে এক ধরনের আক্রমণাত্মক ও উগ্র মনোভাব ছিল। হত্যার নির্দেশনা, উসকানি ও প্ররোচনার পাশাপাশি অনেক অগুরুত্বপূর্ণ কথাও তাকে বলতে শোনা গেছে। কিন্তু ওবায়দুল কাদেরের বেলায় দেখা গেছে, তিনি ধীরস্থির। খুব স্বাভাবিকভাবে কথাবার্তা বলেছেন, যার প্রায় সবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিস্থিতি কোনদিকে যাচ্ছে তার সবই তিনি আঁচ করতে পেরেছেন বলে আমাদের মনে হয়েছে। যেসব উপাদান থাকলে মানবতাবিরোধী অপরাধ হয়, তার সবই ওবায়দুল কাদেরের কথোপকথনে পাওয়া গেছে। তবে, তদন্তের স্বার্থে অনেক কিছুই আমরা এখন প্রকাশ করছি না।’
একটি কল রেকর্ডের কথোপকথন পর্যালোচনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রসিকিউটর জোহা বলেন, “জুলাই অভ্যুত্থানের কোনো এক সময় ফোনের ওপাশ থেকে মির্জা আজম দুজন সংসদ সদস্যের নাম উল্লেখ করে ওবায়দুল কাদেরকে বলছেন, ‘ফুয়েল লাগবে ভাই, যা ছিল শেষ।’ জবাবে ওবায়দুল কাদের বলছেন, ‘সালমান তো (সালমান এফ রহমান) এক দিয়েছে’।” তিনি বলেন, “আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, ‘ফুয়েল’ বলতে আসলে আন্দোলনকে দমাতে মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের ক্যাডারদের যে টাকা দেওয়া হয়েছে, তাকেই বোঝানো হয়েছে। আর ‘এক’ বলতে আমরা বুঝতে পেরেছি এক কোটি টাকা। এরকম বেশ কিছু কথোপকথনের রেকর্ড আমাদের হস্তগত হয়েছে।”