ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু মহারণ নয়—এটি এক সাংস্কৃতিক উৎসবও। আর সেই উৎসবের অন্যতম স্থায়ী অংশ হলো প্রতিযোগিতার অফিসিয়াল সংগীত। ১৯৬২ সালে চিলি বিশ্বকাপ থেকে শুরু হওয়া এই ঐতিহ্য ছয় দশক পেরিয়ে এখন বিশ্বের ফুটবলভক্তদের অনুভূতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বিগত প্রতিটি বিশ্বকাপে একটি করে অফিসিয়াল গান প্রকাশ করা হয়, যা আয়োজক দেশের সংস্কৃতি, সংগীতধারা ও বৈশ্বিক ফুটবলের আবেগকে একসঙ্গে মেলে ধরে। সময়ের সঙ্গে সংগীতের ধারা ও শিল্পীদের পরিধি বদলেছে—স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছেন আন্তর্জাতিক তারকারাও। সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টগুলোতে তো একাধিক গান ও প্লেলিস্টও প্রকাশ করেছে ফিফা।
প্রথম অফিসিয়াল গান ‘এল রক দেল মুন্ডিয়াল’, চিলির ব্যান্ড দ্য র্যাম্বলার্স–এর গাওয়া। স্থানীয়ভাবে ব্যাপক সাড়া ফেললেও এ গানই বিশ্বকাপ সংগীতের যাত্রাপথের ভিত্তি স্থাপন করে। এরপর ১৯৬৬ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে ছিল ‘ওয়ার্ল্ড কাপ উইলি’, লনিন ডোনেগানের গাওয়া স্কিফল ধাঁচের গান। টুর্নামেন্টের মাসকট উইলির নামে তৈরি এ সংগীত ব্রিটিশ ফুটবল সংস্কৃতির বড় প্রতীক হয়ে ওঠে।
১৯৭০ মেক্সিকো বিশ্বকাপে এবং পশ্চিম জার্মানিতে ‘ফুসবল ইস্ট উনজার লেবেন’ উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সালের আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে বিশ্বখ্যাত সুরকার এনিও মোরিকোনের কম্পোজিশন ‘লা মার্চা দেল মুন্ডিয়াল’ ফুটবল সংগীতে নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৯৮২ স্পেন বিশ্বকাপে প্লাসিডো ডমিঙ্গোর গাওয়া ‘এল মুন্ডিয়াল’ স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় হয়।
এরপর ১৯৯০ ইতালি বিশ্বকাপে ‘উন এস্তাতে ইতালিয়ানা’ ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ও আবেগঘন বিশ্বকাপ গান হিসেবে স্মরণীয় হয়ে আছে। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে ড্যারিল হালের ‘গ্লোরিল্যান্ড’ তুমুল আলোচনায় আসে। কিন্তু বিশ্বকাপ সংগীতকে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেয় ফ্রান্স। ১৯৯৮ বিশ্বকাপে রিকি মার্টিনের ‘লা কোপা দে লা বিদা’ এখনও সবচেয়ে সফল বিশ্বকাপ সংগীতগুলোর একটি।
২০০২ কোরিয়া–জাপান বিশ্বকাপে ‘বুম’ (অ্যানাস্টেশিয়া), জার্মানিতে ইল ডিভো ও টনি ব্র্যাক্সটনের ‘দ্য টাইম অব আওয়ার লাইভস’, আর দক্ষিণ আফ্রিকা ২০১০ বিশ্বকাপ উপহার দেয় ইতিহাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় গান ‘ওয়াকা ওয়াকা’। কলম্বিয়ান গায়িকা শাকিরার গাওয়া এই গানটির ১৫ মিলিয়নের বেশি কপি বিক্রি হয়। ২০১৪ বিশ্বকাপে ‘উই আর ওয়ান’, রাশিয়া ২০১৮–তে ‘লিভ ইট আপ’এবং কাতার ২০২২–এর ‘হাইয়া হাইয়া’—সবগুলোতেই ফুটবল সংগীতে আন্তর্জাতিক শিল্পী, রিমিক্স ও বহুভাষিক উপাদান যুক্ত হয়।
সাম্প্রতিক বিশ্বকাপগুলোতে ফিফা একাধিক অফিসিয়াল সংগীত, থিম সং, ফ্যান অ্যান্থেম ও প্লেলিস্ট প্রকাশ করছে। এর লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন সংস্কৃতি ও বহুজাতিক দর্শকের রুচিকে এক মঞ্চে আনা। ছয় দশকের এই যাত্রায় ফুটবল বিশ্বকাপের গান শুধু সংগীত নয়—এটি স্মৃতি, নস্টালজিয়া, আবেগ ও বৈশ্বিক ঐক্যের প্রতীক। খেলাই হোক বা সুর—দুটিই এখন বিশ্বকাপ উদযাপনের অপরিহার্য অংশ।