গত ৪ ডিসেম্বর, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন নয়াদিল্লিতে ২ দিনের জন্য দশম সরকারি সফরে পৌঁছান। এটা এমন এক সফর, যা সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ পরিস্থিতি ঘনীভূত হওয়ার পর এটি তার প্রথম ভারত সফর। এমন এক সময়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হলো, যখন দুই দেশই নিষেধাজ্ঞা, শুল্কবৃদ্ধি এবং দ্রুত পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাণিজ্য-পরিবেশের মধ্যে নিজেদের অবস্থান নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে। প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, মহাকাশ কর্মসূচি, অর্থনৈতিক সংযোগ ও বাণিজ্য সহজীকরণ এই সফরের আলোচ্যসূচিতে থাকলেও এর বৃহত্তর প্রেক্ষাপট ছিল পশ্চিমা চাপ মোকাবিলায় দুই মিত্রের কৌশলগত সমন্বয় শক্তিশালী করা। পুতিনের উপস্থিতিতে, নয়াদিল্লিতে ভারত-রাশিয়া শীর্ষ সম্মেলনের সময়, মেক ইন ইন্ডিয়ার অধীনে প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং যৌথ উৎপাদনসহ গভীর সামরিক সম্পর্ককে জোর দেওয়া হয়েছে। রাশিয়া হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেডে পঞ্চম প্রজন্মের স্টিলথ ফাইটারের স্থানীয় উৎপাদনের প্রস্তাব দিয়েছে, যার লক্ষ্য পর্যায়ক্রমে ৪০-৬০% দেশীয়করণ, ইঞ্জিন প্রযুক্তি এবং স্টিলথ উপকরণ স্থানান্তর করা। অতিরিক্ত প্রস্তাবগুলোতে ল্যানসেট স্ট্রাইক ড্রোন এবং রাশিয়ান-উৎপাদিত সরঞ্জামের খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহ বিলম্ব মোকাবিলায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। সম্প্রতি রাশিয়ার নিম্নকক্ষ দুমা যে সামরিক সহযোগিতা চুক্তি অনুমোদন করেছে, তা দুই দেশের সশস্ত্র বাহিনীর যৌথ মহড়া ও মানবিক অভিযানে ব্যাপক সুবিধা দেবে এবং পরস্পরের ভূখণ্ডে সৈন্য বা সরঞ্জাম মোতায়েনের আইনগত কাঠামো তৈরি করবে।
‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগের আওতায় ভারত বহু আগেই বিদেশি প্রতিরক্ষা কোম্পানিকে দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হতে উৎসাহিত করেছে। দুবাই এয়ারশোতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক রোসোবরোন এক্সপোর্ট তাদের অস্ত্র ব্যবস্থা ভারতের সঙ্গে প্রযুক্তিগত অংশীদারত্ব বৃদ্ধির আগ্রহ স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ডেনিস আলিপভ ইতোমধ্যে নিশ্চিত করেছেন যে, যৌথ উৎপাদন নিয়ে আলোচনায় অগ্রগতি হয়েছে। ভারতের সামরিক আধুনিকায়নের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের সঙ্গেও এসব উদ্যোগ সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে। ভারতের জন্য রুশ প্রযুক্তির প্রবেশাধিকার বজায় থাকা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মতো অন্যান্য শক্তির সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনও গুরুত্বপূর্ণ। রাশিয়ার জন্য, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার চাপে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মতো নির্ভরযোগ্য অংশীদার ধরে রাখা এক কৌশলগত সাফল্য। দুই দেশের সামরিক ও শিল্প ক্ষমতার সমন্বয় ২১ শতকের প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বের এক শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে উঠতে পারে। রসকসমসের প্রধান দিমিত্রি বাকানভ জানিয়েছেন ইঞ্জিন নির্মাণ, মানব মহাকাশযাত্রা, জাতীয় কক্ষপথ স্টেশন এবং রকেট জ্বালানি উৎপাদনে যৌথ কাজের ‘ভালো খবর’ ঘোষণা হবে। যৌথ বিবৃতিতে মানব মহাকাশযাত্রা, উপগ্রহ নেভিগেশন এবং গ্রহ অনুসন্ধানে গভীরীকরণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। রসকসমস ভারতের গগনযান মানব মহাকাশ মিশনে যৌথভাবে কাজ করছে, যার মধ্যে অ্যাস্ট্রোনট প্রশিক্ষণ, লাইফ-সাপোর্ট সিস্টেম এবং ডকিং প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্ত। ভারতের জাতীয় কক্ষপথ স্টেশন স্থাপনে রাশিয়ান প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়ার আলোচনা হয়েছে যা চন্দ্রমিশন এবং মঙ্গল অনুসন্ধানকে সমর্থন করবে।
রাশিয়া কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং ভারত-মার্কিন শুল্কবৃদ্ধির চাপে থাকায় এ বছরের আলোচনায় অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। রাশিয়ার ‘ফাস্টার পেমেন্ট সিস্টেম’ (এসবিপি)-কে ভারতের ইউনিফাইড পেমেন্টস ইন্টারফেস (ইউপিআই)-এর সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়েও দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের ৯০ শতাংশ বাণিজ্য রুপি ও রুবলে সম্পন্ন হয়, মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর কৌশলের অংশ হিসেবে। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, রাশিয়া ভারতের সঙ্গে আর্থিক সহযোগিতায় যা সম্ভব, সবই ভাগ করে নিতে প্রস্তুত। বৈশ্বিক অস্থিরতার সময় এ ধরনের আর্থিক সমন্বয় দুই দেশকেই স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে। ভারত-রাশিয়া আন্তঃসরকার কমিশন, যা বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সহযোগিতা নিয়ন্ত্রণ করে এবারের বৈঠকে বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণে একটি বড় ফোরামের ভূমিকা পালন করেছে। বর্তমানে রাশিয়া ভারতে ৬৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে, যেখানে ভারত রপ্তানি করে মাত্র ৫ বিলিয়ন ডলার। ভারত চাইছে যন্ত্রপাতি, খাদ্যপণ্য ও কাঁচামাল রাশিয়ায় রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে। উভয় দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ডলার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এবার পুতিনের সফর বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনের ঐতিহ্যে ফিরে আসা নির্দেশ করছে। রাশিয়ার জন্য এই সফর ছিল দক্ষিণ এশিয়ায় একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদারকে আরও দৃঢ়ভাবে পাশে পাওয়া, অর্থনৈতিক সহযোগিতা বহুমুখী করা এবং বহুমেরুর বৈশ্বিক কাঠামোর দাবি জোরালো করার সুযোগ। আর ভারতের জন্য উন্নত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বাড়ানো ও বিশ্ববাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি করা এর মূল লক্ষ্য ছিল।
পুতিনের ভারত সফর নিছক আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক কার্যক্রম ছিল না। নিষেধাজ্ঞা, শুল্কবৃদ্ধি এবং বৈশি^ক অনিশ্চয়তার এ সময়ে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের দৃঢ়তা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিল। পরিবর্তনশীল বিশ্বের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ভারত ও রাশিয়া আবার ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের দিকে এগোচ্ছে, যা ভবিষ্যতের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
writemah71@gmail.com