মোহাম্মদপুরে মা-মেয়েকে হত্যা

হত্যার পর স্কুলের পোশাক পরে বেরিয়ে যায় ঘাতক আয়েশা

মোহাম্মদপুরের প্রিপারেটরি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিসা বিনতে আজিজ (১৫) যখন গভীর ঘুমে তখন শিক্ষক বাবা এম জেড আজিজুল ইসলাম মেয়েকে এক পলক দেখে সকাল ৭টায় স্কুলের উদ্দেশ্যে রওনা হন। স্ত্রী মালাইলা আফরোজ (৪৮) স্বামীকে বিদায় দিয়ে দরজা বন্ধ করে দেন। সকাল ৭টা ৫২ মিনিটে গৃহকর্মী আয়েশা বোরকা পরে বাসায় প্রবেশ করেন। ৯টা ৩৬ মিনিটে কাঁধে স্কুলব্যাগ ও স্কুলের পোশাক পরে বের হয়ে যায় গৃহপরিচারিকা আয়েশা।

এই ১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে মা-মেয়েকে গলাকেটে নৃসংশভাবে হত্যা করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে নাফিসার বাবা বাসায় ফিরে দেখেন স্ত্রীর ও মেয়ের রক্তাক্ত নিথর দেহ পড়ে আছে। মেয়ে নাফিজার নিঃশ্বাস নিতে দেখে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান বাবা। কিন্তু হাসপাতালের চিকিৎসকরা নাফিজাকে মৃত ঘোষণা করেন।

আজ সোমবার চাঞ্চল্যকর ও নৃসংশ এই ঘটনাটি ঘটে রাজধানীর মোহাম্মদপুর শাহজাহান রোডের ৩২/২/এ (৭তম তলা) বাসায়।

পুলিশ বলছে, মাত্র চার দিন আগে নিহতের বাসায় কাজ নেয় গৃহকর্মী। নিজের নাম আয়েশা (২০) বলে পরিচয় দেয়। মা ও মেয়েকে হত্যার পর নিহত নাফিসার স্কুল ড্রেস পরে বের হয়ে যায়।

সরেজমিনে দেখা যায়, ফ্ল্যাটের প্রবেশ মুখ থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে রক্তের দাগ রয়েছে। বাসার আলমারিসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র তছনছ করা অবস্থায় দেখা যায়। তবে বাসায় নগদ টাকা, স্বর্ণ কোনও কিছুই না থাকায় সব এলামেল করে গেছে। বাসায় ধস্তাধস্তির আলামত রয়েছে, মেঝেতে এবং দেয়ালে রক্তের দাগ রয়েছে। আলমারি ও ভ্যানিটি ব্যাগ তছনছ অবস্থায় রয়েছে। আফরোজার মোবাইলটি নিয়ে গেছে। অন্য আরও কি কি জিনিস নিছে সেই বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষ জানা যাবে বলেও জানায় পুলিশ।

নিহত নাফিসার বাবা এম জেড আজিজুল ইসলাম বলেন, বাসার দরজা খুলতেই চারপাশে রক্তের ছোপ ছোপ দাগের চিহ্ন। ধারনা করছি স্ত্রী বাঁচার জন্য অনেক চেষ্টা করেছেন। ঘরের আলমিরার ভেতর ও আসবাবপত্র তছনছ করা। ওই গৃহকর্মী শুধুমাত্র ঘরের মালামাল লুট করতেই তার স্ত্রী-সন্তানকে হত্যা করেছে। যে ছুরি দিয়ে হত্যা করা হয়েছে সেগুলোও পরে আছে মেঝেতে।

তিনি আরও বলেন, চার দিন আগে একটি মেয়ে আসে। বোরকা পরিহিত মেয়েটি আমাদের বাসার দারোয়ান খালেকের কাছে কাজের সন্ধান করলে সে আমাদের বাসায় পাঠিয়ে দেয়। এরপর আমার স্ত্রী মেয়েটির সঙ্গে কথা বলে কাজে রেখে দেয়। পরে আমি স্ত্রীর মুখে শুনেছি, মেয়েটার নাম আয়েশা। বয়স আনুমানিক ২০ বছর। তার গ্রামের বাড়ি রংপুর। জেনেভা ক্যাম্পে চাচা-চাচির সঙ্গে থাকে। বাবা-মা আগুনে পুড়ে মারা গেছে। তার শরীরেও আগুনে পোড়ার ক্ষত রয়েছে।

মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঘাতক মাত্র চার দিন আগে নিহতের বাসায় কাজ নেন। নিজের নাম আয়েশা বলে পরিচয় দেন। ভবনের একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সকাল ৯টা ৩৬ মিনিটে কাঁধে স্কুল ব্যাগ ও স্কুল ড্রেস পরে বের হয়ে যান গৃহপরিচারিকা আয়েশা। বাসা থেকে রিকশার জন্য অপেক্ষা করেন তিনি। এরপর একটি রিকশায় করে চলে যান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপ কমিশনার (ডিসি) ইবনে মিজান বলেন, আমরা প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য পেয়েছি, সেসব যাচাই বাছাই চলছে। গৃহকর্মীর প্রসঙ্গে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা শুনেছি, তার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে কাজ করছি। সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করছি, হত্যার আগে পরে তার উপিস্থিতি ও অ্যাকটিভিটিজ বিশ্লেষণ করে পরবর্তী তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাব।