এই বিজয়ের মাসেও গর্বের ঘটনা স্মরণের বদলে হীনম্মন্যতার পরিচয়। চলনে-বলনে নানা ফের। চোর-বাটপারের নামের আগে মুক্তিযোদ্ধা শব্দটি লিখে মহান মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান। একজন মুক্তিযোদ্ধা কখনো জাতীয় সম্পদ লোটে না, চোর বাটপার হয় না। নির্বাচনসহ নানা বিষয়ে সুবিধাবাদের অন্তহীন সমীকরণ। আবার অসুস্থতা নিয়েও খোদার আরশ কাঁপানো কথাবার্তা। একজন মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার তেমন উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলেও যতটুকু হয়েছে, তিনি যে বেঁচে আছেন তা কম নয়। তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের চিকিৎসকরা আপডেট তথ্য জানিয়েছেন, খালেদা জিয়ার ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের জটিলতা ওঠানামা করছে। তা বিমান জার্নির উপযুক্ত নয়। দীর্ঘ যাত্রার ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া এই সিদ্ধান্ত এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে তার শারীরিক অবস্থার পরিবর্তনের ওপর। তাদের ভাষায় : বর্তমান অবস্থাটি পরিস্থিতির উন্নতি নয়, অবনতিও নয়। এমনকি স্থিতিশীলও নয়। তাই তার অবস্থার প্রতিটি পরিবর্তন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন চিকিৎসকরা। পুত্রবধূ তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান চিকিৎসা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তার সংকটাপন্ন এ শারীরিক অবস্থা অবশ্যই উদ্বেগের। যেখানে চিকিৎসা আর দোয়াই প্রাসঙ্গিক।
খেয়াল করার বিষয় হচ্ছে, গুজবের ডালপালা। সে সঙ্গে নানা অবান্তর কথা। বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ছাড়াও বিএনপির নেতৃবৃন্দের মধ্যে অনেকেই অনেক রকম কথা বলছে। কারও বক্তব্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বক্তব্যকেও হার মানায়। কারও বক্তব্য আজ ও আগামীর দর্শনে (ফিলোসফি) সমৃদ্ধ। এ নিয়ে টিভি এবং ফেসবুকে রীতিমতো একটা প্রতিযোগিতার মতো অবস্থা। এর মধ্যে সবচেয়ে দর্শনীয় এবং আকর্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, সেসব কথাবার্তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশিত ফটোকার্ডে বক্তার চমৎকার হাস্যোজ্জ্বল এবং নজরকাড়া ছবি। শোককে উৎসবের আমেজ দেওয়ার এ অপচেষ্টা বড় নোংরামি। মানুষের আগ্রহকে বিজনেসের সুযোগ মনে করে মূল ধারার গণমাধ্যমের কেউ কেউ যে ভিউ ব্যবসায় নেমেছে, তা কেবল দৃষ্টিকটু নয়, রীতিমতো অপরাধ। রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটা ক্ষুদ্র অংশ তার নেতা বা নেত্রীর অসুস্থতা পুঁজি করে ভাইরালের ভাইরাস ছড়াচ্ছেন। আপাতত এটাকে নেতৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধা বা ভক্তি মনে হলে, এটা নিজেকে তুলে ধরার সুযোগের ব্যবহারের কদর্য চেষ্টা। অবশ্য সেটা গোপন থাকছে না। আর বাড়তি হিসেবে যোগ হয়েছে, তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রসঙ্গ। তা নিয়েও ওপেনে কথার খই ফোটানো হচ্ছে। যেখানে তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘(১) ... কিন্তু অন্য আর সবার মতো এটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। (২) স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত।’ নিজের অবস্থা-অবস্থান জানাতে এর বেশি কিছু বলা লাগে না। কর্মী-সমর্থকদের খুশি করতে তার যেসব নেতা ওপেনে বলছেন, ‘তারেক রহমান দ্রুত দেশে ফিরবেন’, তারাও ঠিকই জানেন, ‘স্পর্শকাতর’ এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। অবশ্যই সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন এই স্পর্শকাতর বিষয়টি বিস্তারিত প্রকাশ পাবে। এ সময় নির্বাচন সামনে রেখে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তাকে দল পরিচালনাও করতে হচ্ছে। কথা বলতে হচ্ছে নিয়মিত। কারও নাম উল্লেখ না করে এরই মধ্যে তিনি বলেছেন, ‘একটি রাজনৈতিক দলের কিছু ব্যক্তি বা বেশ কিছু ব্যক্তি বিভিন্ন জিনিসের টিকিট বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন। বিভিন্ন জিনিসের কনফারমেশন দিয়ে বেড়াচ্ছেন।’ তিনি বলেন, ‘দোজখ, বেহেশত, দুনিয়া সবকিছুর মালিক আল্লাহ। যেটার মালিক আল্লাহ, যেটার কথা একমাত্র আল্লাহতায়ালাই বলতে পারেন, সেখানে যদি আমি কিছু বলতে চাই, আমার নরমাল দৃষ্টিকোণ থেকে আমি বুঝি যে, সেটি হচ্ছে শিরক। সেটি শিরকের পর্যায়ে পড়ে।’
তারেক রহমান এও বলেছেন, ‘কিছু কিছু মানুষ বা কোনো কোনো গোষ্ঠীকে ইদানীং বলতে শুনেছি বা বিভিন্ন জায়গায় কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় বলে যে (রাষ্ট্রক্ষমতায়) অমুককে দেখলাম, তমুককে দেখলাম, এবার অমুককে দেখুন। যাদের কথা বলে অমুককে দেখুন, তাদের তো দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই দেখেছে। একাত্তরে তারা তাদের নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে কীভাবে লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। ঠিক যেভাবে পতিত স্বৈরাচার পালিয়ে যাওয়ার আগে হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করেছিল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য। এই যাদের কেউ কেউ বলে যে, একবার দেখুন না এদের। তাদের দেশের মানুষ ১৯৭১ সালেই দেখেছে।’ এ প্রসঙ্গে তারেক রহমান আরও বলেন, ‘লাখ লাখ মানুষকে শুধু হত্যাই করেনি, তাদের সহকর্মীরা কীভাবে মা-বোনদের ইজ্জত পর্যন্ত লুট করেছিল, এই কথা আমাদের মনে রাখতে হবে।’ হাল রাজনীতির জন্য যা বলা দরকার, যথেষ্ট বলেছেন তারেক রহমান। গোপনে নয়, ওপেনেই তিনি কোনো মেদ ছাড়াই বলেছেন কথাগুলো। যেখানে রয়েছে রাজনীতির অনেক উপাদান। বিতাড়িত শক্তিও কি বসে আছে? বসে থাকার দল নয় আওয়ামী লীগ। শেখ হাসিনা এখনো মনে করেন, তিনি ফিরবেন এবং তা আগের মতোই ‘এবসিলিউট পাওয়ার’ নিয়ে সরাসরি বাংলার সিংহাসনে। তিনি সেভাবেই দলীয় নেতাকর্মীদের মানসিক নকশা আঁকার কাজটি করে যাচ্ছেন। সে কারণেই পতন এবং সদলে পলায়নের ১৬ মাস পার হয়ে গেলেও দলের কোনো নেতৃত্ব তৈরিতে তার আগ্রহ নেই (যেমন আগেও ছিল না) এবং দলের কোনো পর্যায়ে, কোনো তরফে নেতৃত্ব তৈরির দৃশ্যমান উদ্যোগও নেই। তিনি হয়তো আগের মতোই এখনো নিজেকে দলের নেতৃত্বে অপরিহার্য, বিকল্পহীন এবং অনন্য মনে করেন। তান মন-মুখ ব্যবহার, আচরণ বরাবরই অন্য মাত্রার। তাকে আরও কত কিছুতেই মানায়। শব্দ এবং ভাষা ব্যবহারে বেপরোয়াপনায় তিনি অনন্য। তার পর্যায়ের কোনো নেতা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি এতটা নির্দয় এবং অশোভন ভাষার ব্যবহার আগে করেননি। কিন্তু তাকে হটানোর দলগুলোর কারও কারও মাঝেও এ ভাইরাস ছড়েছে। কে কী বলছেন, কতটুকু বলা যায়, সেই মাপ-পরিমাপ থাকছে না। একটা গণঅভ্যুত্থান ক্ষমতার কাঠামোয় পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ-রাজনীতি-মানুষের আচরণে পরিবর্তন আনে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশে তা অনুপস্থিত। এ সুযোগে হিডেন শক্তির অপতৎপরতা বেড়ে যাচ্ছে। গোপন ক্রিয়াকর্মও ব্যাপক। যে তরুণরা পরিবর্তনে সবচেয়ে সাহসী ভূমিকা নিয়েছিল, তাদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটা কখনো ভাবা হয়নি তারা কী চাইছে? এটা কখনো রাষ্ট্র জানার প্রয়োজন অনুভব করেনি। প্রতারিত সেই তরুণ এখন দিশেহারা হয়ে কোথাও কোথাও আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। জুলাই অভ্যুত্থানের অনেক আগে থেকে বাংলাদেশ ঘিরে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর তৎপরতা বেড়েছে বলে নানা মহলের অভিযোগ থাকলেও, সরকার সেদিকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি। বরং মাঝেমধ্যেই সরকারের বাড়তি এজেন্ডা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই অবস্থা থেকে বের হতে একটা গণতান্ত্রিক শাসনে ফিরে যাওয়ার বিকল্প নেই। আর সেটার পথ হচ্ছে নির্বাচন। এর ব্যাপক আয়োজনও চলছে। কেবল তফসিল ঘোষণা বাকি।
নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির রাজনীতিকে চাপে রেখে এই মুহূর্তে কাদের লাভ, সেটাও ভাবনার বিষয়। সেখানে এখন যোগ হয়েছে মাইনাস ফোরের কথা। এক-এগারোর সরকার গৃহবন্দি করে যে মানসিক নির্যাতন করেছে এবং তাকে মাইনাস করার হীন চক্রান্ত করেছিল, যা ছিল জাতির জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও দুঃখজনক। তার সন্তানের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালিয়েছিল। বিগত সরকার বিনা দোষে তার ওপর বিভিন্ন দিক থেকে ঈর্ষান্বিত হয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের লোমহর্ষক ঘটনা জাতিকে কাঁদিয়েছে। কারও কারও মতে, ওয়ান ইলেভেনের সময় মাইনাস টু বাজারে আনা শক্তি এখন হয় ক্ষমতায় অথবা ক্ষমতার কাছাকাছি। তাদেরও যুক্তি আছে। প্রধান উপদেষ্টার সংস্কার কমিটিগুলোর শীর্ষ পদে থাকা অনেকে ফখরুদ্দিন-মইনুদ্দিনদের সমর্থক ছিলেন। পেছনের ডিপ স্টেট তো আছেই। ডিপ স্টেট কোথাও একবার ব্যর্থ হলে, হাত গুটিয়ে চলে যায় না। বরং নতুন সুযোগের অপেক্ষা করে। গোপনে চলে তাদের নানা কারসাজি। বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার কারণে নির্বাচন পেছানোর ধুয়া তোলার একটি দরদি মহলের তৎপরতা বিশেষভাবে খেয়াল করার মতো। এ দাবি বা ধুয়া তুললে, তা তুলতে পারে বিএনপি। কিন্তু সেখানে দরদ আসছে ভিন্ন মঞ্চ থেকে। এরা নির্বাচনকে এখনো একটা ঘোরের মধ্যে ফেলতে চায়। ড. ইউনূস সরকার নির্বাচন দেবে না, করতে পারবে না পারলেও নির্বাচনটা ভালো হবে না এ রকম কিছু মুখস্থ কথা ছড়ানো হচ্ছে। পুরোদমে নির্বাচনী প্রস্তুতির মাঝেও এ ধরনের নানা খটকা, প্রশ্ন, ক্যাচালের পেছনে গোপন মতলব না বোঝার মতো বিষয় নয়।
যার রেশ টেনে কড়া হুমকি দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। বলেছেন, কেউ নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্বাচনের প্রস্তুতিতে কীরকম খাটাখাটুনি তার কমিশন করছে, তার নমুনা দেখা যাচ্ছে প্রতিদিনই। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের শক্তি-সামর্থ্যরে জানান দিচ্ছে। দেশ জুড়ে এসব নিয়ে আলোচনার পারদ চড়ছে। এখানে শ্রীলঙ্কা-নেপালের প্রেক্ষাপট বেশ প্রাসঙ্গিক। দেশ দুটিতেও প্রায় এ স্কেলেই ক্ষমতার পট বদলেছে। কিন্তু পরবর্তী দৃশ্যপট এমন হয়নি। কাদা ছোড়াছুড়ি এ পর্যায়ে যায়নি। তারা রাজনীতিকে জনমুখী করতে পেরেছে। বাংলাদেশ পারেনি। এখানে অর্থ ও ক্ষমতার প্রভাবই দৃশ্যমান। নির্বাচন পদ্ধতিতে বিগত কয়েক দশকের নমুনাই প্রবল। রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির চর্চা দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়া থেকেই। যেকোনো বড় ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন পেতে একজন প্রার্থীকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। সৎ, যোগ্য, কিন্তু আর্থিকভাবে দুর্বল প্রার্থীদের জন্য এটি রাজনীতিতে লাল সংকেত। নমিনেশনই নয়, প্রার্থীদের বিপুল অর্থ ব্যয় এখন জয়ের অন্যতম শর্তে পরিণত হয়েছে। এই বিপুল অর্থের উৎস, তা বৈধ না অবৈধ এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষেরও জানার গরজ নেই। নির্বাচনের খরচ জোগানো এই ধনী অর্থদাতা বা পৃষ্ঠপোষকরা এ ব্যবস্থাকে এক ধরনের ব্যবসায়িক বিনিয়োগ হিসেবে দেখবে এটাই স্বাভাবিক। ঘটনা এবং ইতিহাস বলছে, অর্থ রাজনীতিকে প্রভাবিত করার যত সুযোগ পেয়েছে, তা তত দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতাকে আমন্ত্রণ করেছে। এ পুরো পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুতর পরিণতির শিকার হয় দেশের শাসনব্যবস্থা।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট ডেপুটি হেড অব নিউজ, বাংলাভিশন
mostofa71@gmail.com