গৃহশ্রমিক নিযুক্তিতে সতর্কতা

 রাজধানীতে গৃহশ্রমিকদের ওপর অত্যাচারের ঘটনা আমরা জানি। প্রায় সময়ই গণমাধ্যমে তা প্রকাশিত, প্রচারিত হয়েছে। দেখা গেছে, প্রায় সময়ই তারা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বাড়ির অধিকর্তা বা স্বামী-স্ত্রী উভয়ে তাদের বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেছেন। যতটুকু সম্ভব, তার বিচার হয়েছে। কিন্তু ‘গৃহশ্রমিক’ই যে একদিন আতঙ্কের নাম হবে সম্ভবত এটি কেউ আন্দাজ করেননি। বিচ্ছিন্নভাবে অতীতে কয়েকটি বাসায় কিছু ঘটনা ঘটলেও, তা উদ্বেগের বিষয় হয়নি। কিন্তু বর্তমানে গৃহশ্রমিক নিযুক্ত করার আগে সতর্ক থাকা জরুরি হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে, যারা ফ্ল্যাটে থাকছেন। সম্প্রতি একটি ঘটনা এই ধারণাকে আরও দৃঢ় করেছে। গত সোমবার মোহাম্মদপুর শাহজাহান রোডের একটি বাসায় লায়লা আফরোজ ও তার মেয়ে নাফিসা লাওয়াল বিনতে আজিয়াকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। হত্যা ঘটনায়  সোমবার রাতেই নিহত লায়লা আফরোজের স্বামী মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন। খুনের পরই গৃহকর্মী আয়েশা স্কুল ড্রেস পরে পালিয়ে যায়। তবে গতকাল আয়েশাকে বরিশালের নলছিটি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লায়লা আফরোজের শরীরে প্রায় ৩০টি এবং নাফিসার দেহে ৪টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে, লায়লা আফরোজের ওপর প্রতিশোধে উন্মত্ত ছিল ঘাতক। কিন্তু এই খুনের সঙ্গে গৃহকর্মী আয়েশার কী সম্পর্ক সেটাই মূল বিষয়। তদন্তকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে, প্রশিক্ষিত ঘাতক ঠা-া মাথায় মা ও মেয়েকে হত্যা করেছে। আঘাতের ধরন, সংখ্যা, ঘটনার সময়সীমা এবং হত্যার পর ঘাতকের আচরণ বিশ্লেষণ করে এমন ধারণা করছে তারা। যেহেতু গৃহকর্মী আয়েশা পালিয়েছিল, সেহেতু ধারণা করা হচ্ছে কোনো অজানা ভয় তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সাধারণত, কোনো অপরাধীর ক্ষেত্রে এমন হয়। অনেকবার বলা হয়েছে, গৃহকর্মী নিয়োগের আগে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার কথা। এবারও অনুরোধ জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী। নিরাপত্তার স্বার্থে গৃহকর্মী নিয়োগের আগে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, এক কপি সম্প্রতি তোলা পাসপোর্ট ছবি ও পরিচয় নিশ্চিতের জন্য কমপক্ষে দুজন শনাক্তকারীর নাম-ঠিকানা সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য নগরবাসীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করেছেন ডিএমপি কমিশনার।

বিশ্বাসের সম্পর্ক যত গভীর হোক, নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন থাকা উচিত। রাজধানীর মা-মেয়েকে হত্যার ঘটনা হয়তো অনেককেই নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে। সবার আগে সচেতন হতে হবে আপনাকে। নিজ থেকে সচেতন না হলে, শুধু আইন করে অপরাধ দমন করা যাবে না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে এখন ২৫ লাখ গৃহকর্মী আছে। তাদের মধ্যে বড় একটি অংশ নারী। জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ অনুযায়ী, দেশে গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করে এমন শিশুর সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার, যাদের বয়স ৫ থেকে ১৭ বছর। আর এর মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই মেয়েশিশু। বাংলাদেশে গৃহশ্রমিক সুরক্ষা নীতিমালা করা হয় ২০১৫ সালে। কিন্তু সেটি কোনো আইন নয়। তাই তাদের বেতন, কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টা, বয়স, নিয়োগ কোনো কিছুই আইনের আওতায় হয় না। গৃহশ্রমিকদের যেমন আইনি নিরাপত্তা দেওয়ার সময় এসেছে, তেমনি বাড়ির মালিককেও সতর্ক থাকতে হবে গৃহশ্রমিক বিষয়ে। তাদের পূর্ণ পরিচয় এবং সরবরাহকারী কে এ বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। যে কারণেই হোক, অনেক গৃহশ্রমিক অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। সুতরাং, আপনাকেই সতর্ক থাকতে হবে। যথেষ্ট সাবধানতার সঙ্গে গৃহশ্রমিককে বিশ^স্ত করুন। না হলে, বড় ধরনের ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে।