১১ ডিসেম্বর, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার লাকসাম, নাঙ্গলকোট, চৌদ্দগ্রামের কিছু অংশ, সদর দক্ষিণ, মনোহরগঞ্জ ও লালমাই—এই ছয় উপজেলার মানুষের কাছে দিনটি শুধু ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, এ দিনটিতে মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্ব, বেদনা, রক্ত ও অশ্রুর গল্প যেন নতুন করে ফিরে আসে। ১৯৭১ সালের এ দিনে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি হানাদারদের হটিয়ে দক্ষিণাঞ্চলকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করে।
দিনটি উপলক্ষে বিভিন্ন স্থানে চলছে পতাকা উত্তোলন, আনন্দ র্যালি, আলোচনা সভা ও দোয়া মোনাজাত। কিন্তু এসব আনুষ্ঠানিকতার আড়ালেও রয়ে গেছে মুক্তিযোদ্ধা ও নিরীহ মানুষের ওপর হানাদার বাহিনীর নৃশংসতার ইতিহাস—যা আজও বুক কাঁপিয়ে দেয়।
লাকসাম মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার মো. আবদুল বারী মজুমদার স্মৃতি হাতড়ে বলেন, লাকসাম–নাঙ্গলকোট–লালমাই সীমান্ত জুড়ে ছিল টানা সম্মুখ যুদ্ধ। পাকিস্তানি বাহিনীকে আটকে রাখতে লাকসাম রেলওয়ে জংশনে আমরা সশস্ত্র বাহিনী গঠন করি।
১০ ডিসেম্বর রাতে ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা সীমান্ত ঘেঁষা চৌদ্দগ্রাম ও নাঙ্গলকোট হয়ে লাকসামের দিকে অগ্রসর হলে হাঁড়াতলীতে ঘটে ভয়াবহ যুদ্ধ। এ যুদ্ধে শহীদ হন দেলোয়ার হোসেন, হারুনুর রশিদ, মোখলেছুর রহমান ও মনোরঞ্জন দাস—চার বীর সৈনিক। তাদের রক্তাক্ত দেহ পড়ে থাকলেও সামনে এগিয়ে যেতে থেমে থাকেনি মুক্তিবাহিনী। পরদিন ভোরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুক্তিযোদ্ধারা লাকসামে প্রবেশ করেন। শহরের মানুষ হাতে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে যোগ দেন বিজয়ের উল্লাসে। কিন্তু সেই আনন্দেও ছিল প্রিয় সহযোদ্ধাদের হরানো বেদনা।
১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল লাকসাম দখল করে পাকবাহিনী রেলওয়ে জংশনের পাশে চাঁদপুর টোবাকো কোম্পানির (থ্রি-এ সিগারেট ফ্যাক্টরি) ভেতরে ক্যাম্প স্থাপন করে। এখানেই শুরু হয় দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হত্যাযজ্ঞ। কামড্ডার আবুল খায়ের, মিশ্রি গ্রামের আবদুল খালেকসহ বহু সাধারণ মানুষকে ধরে এনে চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন। তাদের লাশ পরে বেলতলীর বধ্যভূমিতে গর্ত খুঁড়ে রাখা হতো। মুক্তিযোদ্ধাদের কথায়, বেলতলীর মাটির নিচে হাজারো মানুষের আর্তনাদে চাপা পড়ে আছে।
সূত্র জানায়, এখানে প্রায় ১০ হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করে পাশেই মাটি চাপা দেওয়া হয়—যা এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় গণহত্যার স্থান হিসেবে পরিচিত।
এ দিকে নাঙ্গলকোট উপজেলার ইতিহাসও ভরপুর মৃত্যুকথায়। জুলাইয়ের শুরুতে পাকবাহিনী বাঙ্গড্ডার পরিকোট সেতুর কাছে ‘ভূঁইয়া পুকুরপাড়ে’ মিনি ক্যান্টনমেন্ট স্থাপন করে। সেখানেও মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষকে ধরে এনে চলে অমানবিক নির্যাতন। অনেকের লাশ ফেলে দেওয়া হয় ডাকাতিয়া নদীতে। মৌকরা ইউনিয়নের তেলপাই গ্রামের মনু দিঘীরপাড়ে পাঁচ অজ্ঞাত মানুষের গণকবর আজও অবহেলায় পড়ে আছে। ঢালুয়া ইউনিয়নের তেজের বাজারে দুই নিরীহ মানুষকে হত্যা করে গণকবর দেওয়া হয়—যার তত্ত্বাবধান নেই বহু বছর।
লাকসামের আজগরায় বড়বাম এলাকায় হানাদারদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি লড়াইয়ে শহীদ হন দু’জন বীর সৈনিক। খিলা রেলওয়ে স্টেশনে চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ থেকে আসা ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন ও আকরাম আলী শহীদ হন—রেললাইনের পাশে তাদের কবর এখনও গ্রামবাসীর চোখে জল আনে। মনোহরগঞ্জের গজরাপাড়া গ্রামের দুই সহোদর মোস্তফা কামাল ও সোলাইমানকে ধরে নিয়ে যায় পাকবাহিনী, আজও তাদের সন্ধান মেলেনি।
নাঙ্গলকোটের দৌলখাঁড় গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল আলম ওরফে আকমত আলী দারোগার মৃত্যুর গল্প আরও হৃদয়বিদারক। তাকে ধরে নতুন মসজিদের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয় নির্যাতনের পর। তার কবর আজও চিহ্নিত নয়, শুধু একটি সাইনবোর্ড জানান দেয় বীরের শেষ ঠিকানা।
২০০৬ সালে পরিকোট বধ্যভূমির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন হলেও পরে তা রয়ে যায় অরক্ষিত। স্থানীয়দের দাবি—গণকবর, বধ্যভূমি ও স্মৃতিচিহ্নগুলো সরকারিভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি, না হলে ইতিহাস হারিয়ে যাবে।
লাকসামের ইউএনও নার্গিস সুলতানা জানান, হানাদারমুক্ত দিবস উপলক্ষে শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা ও দোয়া মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে। নাঙ্গলকোটের ইউএনও লিজা আক্তার বিথী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতেই নানা আয়োজন করা হয়েছে।
কুমিল্লা দক্ষিণাঞ্চলের হানাদারমুক্ত দিবস শুধু বিজয়ের স্মৃতিই ফিরিয়ে আনে না—এ অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে থাকা বধ্যভূমি, গণকবর, অপহৃত যোদ্ধা ও নিরীহ মানুষের আর্তনাদ আজও মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার মূল্য কতটা রক্তমাখা ছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের একটাই আক্ষেপ—যারা শহীদ হয়েছেন, তাদের গল্প যেন ভুলে না যায় কেউ।