বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাই

সা ক্ষা ৎ কা র

বিশিষ্ট ইসলামি সংগীতশিল্পী মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ। তার কণ্ঠে একাধিক বাংলা ও আরবি ইসলামি গান প্রকাশিত হয়েছে। ‘ফিদাকা কালবি’, ‘ওয়া রাফানা লাকা জিকরাক’, ‘হৃদয়ের গহিনে’, ‘ইয়া হাবিবি’-সহ অনেকগুলো হৃদয়স্পর্শী নাতে রাসুল গেয়েছেন। তার গানগুলো ইউটিউবে লাখ লাখ বার দেখা হয়েছে। সব শ্রেণির শ্রোতার কাছ থেকে ভালোবাসা পাচ্ছেন। ইসলামি সংগীত সাধনা নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহমুদুল হাসান

দেশ রূপান্তর : আপনার নাশিদের বেশিরভাগই ভক্তিমূলক। এর কারণ কী?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : আমি গান করি মনের আনন্দে, হৃদয় তাজা রাখতে। এ কারণে গানে ফুটে ওঠে সেই আকুলতা, যা মানুষের আরাধ্য বিষয়। আরাধ্য মানে এমন কিছু যা ভক্তি, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার পাত্র। আমাদের ভালোবাসার পাত্র নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আমার সবকিছু প্রিয় নবীজির জন্য উৎসর্গীকৃত। তাই গানের কথা ও চিত্রায়ণে এটাই প্রকাশ পায়। গানের মাধ্যমে আমি চাই, ইসলাম ও নবীজির প্রতি ভালোবাসা এবং তরুণদের হৃদয় জাগ্রত হোক।

আমার গানগুলো ইসলামি বিশ্বাস ও মূল্যবোধকেন্দ্রিক। আমি গানের কথা এবং ভিডিওতে ইসলাম ও আধুনিকতার সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করি। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আধুনিকতা ইসলামের পথে বাধা নয়। আমি ইউরোপে বড় হয়েছি। ফলে আমার গানে আরব, মুসলিম এবং ইউরোপীয় এই তিন পরিচয়ের প্রতিফলন চোখে পড়ে। ভিডিওর পোশাক, গানের কথা ও গল্পে ইসলামি ঐতিহ্য ফুটে ওঠে।

দেশ রূপান্তর : আপনার জন্ম ও বেড়ে ওঠা কোথায়?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : আমার জন্ম সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজারে। পরিবারের উপাধি আকন্দ। পারিবারিক বর্ণনা অনুযায়ী আমাদের বংশধারা ইয়েমেন থেকে এসেছে। ‘আকন্দ’ মূলত ধর্মীয় শিক্ষক বা আলেমদের একটি উপাধি। আমার পূর্বপুরুষদের একজন ছিলেন বদিউজ্জামান আকন্দ। তিনি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের অমর কাজ ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি সংকলনের কাজে যুক্ত পাঁচশ আলেমের একজন ছিলেন। আমি ১১ বছর বয়সে কোরআনে কারিম হিফজ সম্পন্ন করি। এরপর ১২ বছর বয়সে ফ্রান্স চলে যাই এবং প্যারিসে পড়াশোনা শুরু করি। সেখানেই আমার বড় হওয়া, পড়াশোনা এবং মানসিক বিকাশ।

আমি একজন উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। ২০১৬ সাল থেকে ফ্রান্সে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছি। একই সঙ্গে আমি একজন ইসলামিক আর্টিস্ট, যেখানে আমার শৈশবের ভালোবাসা এবং আজকের মিশন, দুটোকে একসঙ্গে বহন করছি। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মধ্যে থেকে ইসলামভিত্তিক গান করার মতো চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করছি। এটা আমার মনের খোরাক জোগায়। গান গেয়ে খ্যাতি অর্জন করতে হবে, এটা নয়।

দেশ রূপান্তর : নিজেকে শিল্পী হিসেবে তৈরির লক্ষ্য কী?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : আমি নিজেকে শুধু একজন ‘গায়ক’ ভাবি না, গায়ক হিসেবে দেখি না, নিজেকে পথ দেখানো শিল্পী হিসেবে ভাবি। আমার মূল লক্ষ্য হলো, আজকের তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে কাজ করা। যারা কখনো কখনো অন্ধকারে হারিয়ে যায়। নেশা আর অবসাদে জড়িয়ে পরিচয় সংকটে ভোগে। তাদের কাছে আধুনিক ভাষা, অত্যাধুনিক ভিজ্যুয়াল ও উন্নতমানের সাউন্ড দিয়ে আল্লাহর দয়ার কথা এবং নবীজি (সা.)-এর বার্তা পৌঁছে দিতে চাই। আমি চাই, আমার কাজ দেখে বা শুনে একজন তরুণ মনে করুক, ‘হ্যাঁ, আমি ভুল করেছি, কিন্তু আমার জন্য তওবার দরজা এখনো খোলা আছে।’ শিল্পী হিসেবে পূর্ব-পশ্চিমের দূরত্বটা কমাতে চাই, সেই সঙ্গে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে চাই। ধর্মীয় বিশ্বাসের জায়গা অটুট রেখে, ইসলামি অনুশাসন মেনে জীবনযাপন করে, অন্তরে রাসুলপ্রেম জাগ্রত রেখে ভালো কিছু করার চেষ্টা করছি।

দেশ রূপান্তর : কতদিন যাবৎ গজল গাচ্ছেন?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : শিশুকাল থেকেই আমি হামদ-নাত গাইতাম। শখের বশে মাদ্রাসার বিভিন্ন প্রোগ্রাম ও সামাজিক নানা অনুষ্ঠানে গান গেয়েছি। তবে কয়েক বছর ধরে আমি পেশাদার শিল্পী হিসেবে গান করছি। গানের সঙ্গে ভিজ্যুয়াল, কনসেপ্টচুয়াল স্টোরি, বিদেশের বিভিন্ন লোকেশনে চিত্রায়ণ এবং টিমওয়ার্ক সংযুক্ত করেছি। যেন নাশিদ শোনার সঙ্গে সঙ্গে দেখাও যায়, হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়। এক কথায়, শৈশব থেকে ইসলামি গানের সঙ্গে আছি, সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামি গানকে পূর্ণ সময়ের মিশন বানিয়ে ফেলেছি। আমার জীবনের সঙ্গে ইসলামি গান ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সারা জীবন ইসলামি গানের সঙ্গেই থাকতে চাই।

দেশ রূপান্তর : এই কাজে কাকে আদর্শ মনে করেন?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : আমার কাজের আদর্শ সবসময়ই রাসুলুল্লাহ (সা.)। তার চরিত্র, তার জীবনালেখ্য ও মিশনই আমার কাজের কেন্দ্র। আমি চাই, আমার প্রতিটি কাজে কোনো না কোনোভাবে তার প্রতি ভালোবাসা প্রতিফলিত হোক। শিল্পীর দৃষ্টিকোণ থেকে আমি একক কোনো ব্যক্তিকে নয়, বরং বিভিন্ন নাশিদ শিল্পী, নির্মাতা, বক্তা ও লেখকদের কাজ থেকে নানা শিক্ষণীয় বিষয় গ্রহণ করি। কারও টেকনিক, কারও ভিজ্যুয়াল সেন্স, কারও লিরিক্স, কারও স্পিরিচুয়াল ডেপথ, এসব মিলিয়ে নিজের পথটা তৈরি করছি। সবচেয়ে বড় কথা, আমি চাই নিজের একটি স্বতন্ত্র স্বর তৈরি করতে, যেখানে বাংলার মাটি, আরবের ভাষা, ইউরোপের অভিজ্ঞতা এবং ইসলামের রুহ, সব একসঙ্গে কথা বলবে।

দেশ রূপান্তর : ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? বর্তমানে কোনো কাজ করছেন?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : আগামী কয়েকদিনের মধ্যে আমার নতুন একটি ইসলামি গান মুক্তি পাবে। এছাড়া আমি ধারাবাহিকভাবে নতুন নতুন নাশিদ প্রজেক্ট, শর্টফিল্ম, স্টাইল ভিজ্যুয়াল, ডকুস্টোরি এবং কনসেপ্টচুয়াল ভিডিও নির্মাণ করতে চাই। যেগুলো তরুণদের বাস্তব জীবন, মানসিক লড়াই, তওবা, আশা এবং আল্লাহর রহমতের গল্প বলবে। আগামী ‘রাহমান জধযসধহ’ প্রজেক্ট তার একটি বড় উদাহরণ। এরপর সিরিজ আকারে আরও বড় কাজ করার ইচ্ছা আছে।

আমি যেহেতু বাংলাদেশি, বড় হয়েছি ফ্রান্সে, কাজ করছি বিশ্ববাজারে। তাই আমার ভিশন হলো বিশ্বব্যাপী। আমি চাই বাংলাভাষী মানুষ, আরবি ভাষার মানুষ, ইউরোপসহ সবখানে বাংলাদেশি এক আর্টিস্টের কাজ সম্মানের সঙ্গে দেখা হোক। এ জন্য আমি বিভিন্ন দেশের মনোরম সব লোকেশনে নাশিদের চিত্রায়ণ করি, আমার টিমে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি, কোরিওগ্রাফার যুক্ত রয়েছে।

ইচ্ছা আছে, ভবিষ্যতে তরুণদের জন্য ট্রেনিং কোর্স, ওয়ার্কশপসহ ভিন্ন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার। যেখানে তারা হালাল আর্ট, নাশিদ, ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং ও ইসলামি কনটেন্ট ক্রিয়েশনে নিজেদের গড়ে তুলতে পারে।

দেশ রূপান্তর : নিজের সৃষ্টি যখন জনপ্রিয়তা পায়, তখন কেমন লাগে?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : নিজের সৃষ্টি আসলে নিজের সন্তানের মতো। মানুষ পছন্দ করুক বা না করুক, প্রত্যেকটা নাশিদই আমার কাছে ভীষণ পছন্দের।

দেশ রূপান্তর : এই সময়ে যখন অন্যরা ভিউ, টিকটক, রিলস মাথায় রেখে জাঁকজমক মিউজিক ভিডিওসহ গান প্রকাশ করছে, সেখানে আপনি ভিন্ন ধাঁচে ইসলামি গানের ভিডিও প্রকাশ করছেন। এই আত্মবিশ্বাস এলো কোথা থেকে?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : এটা অনেকটা বিশ্বাসের বিষয়। আমার মনে হয়, গান শুধু কানে শুনে অনুভব করার বিষয় নয়, প্রতিটি গানই একেকটা গল্প। আর এই গল্প বলার প্রয়োজনে ভিডিও দরকার। আর ভিডিওতে লোকেশন, কোরিওগ্রাফ ভালো হলে শ্রোতারা আরও বেশি কানেক্ট হয়। সে ক্ষেত্রে বাজেটের বাধা কাটিয়ে আমি ভিন্ন ও ভালো কিছু করতে চেয়েছি।

দেশ রূপান্তর : গানের চিত্রায়ণ নিয়ে অনেকেই আপনার সমালোচনা করে, বলে টাকার জোরে শিল্পী হয়েছেন, এটাকে কীভাবে দেখেন?

মুছলেহ উদ্দিন আকন্দ : সমালোচনাগুলোকে আমি খুব একটা নেগেটিভভাবে দেখি না। অডিয়েন্সের প্রতিটি ফিডব্যাক আমাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। পৃথিবীর সবকিছুই নিজস্ব গতিতে চলে। আমি বা আমার গান চাইলেও জোর করে কারও কাছে পৌঁছাতে পারব না। আবার অডিয়েন্স যদি আমাকে খুঁজে নেয় তখন লুকিয়ে রাখাও সম্ভব হবে না। তাই এমন সমালোচনা নিয়ে খুব একটা ভাবি না। এই যে আমাদের মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় ইসলামি সংগীত প্রচারণার সুযোগ কম, তাই বলে কাজ হচ্ছে না, এমন নয়। আমি ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে গান বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি। ইউটিউবে আমার গান মিলিয়নেরও বেশি হিট পেয়েছে।