মনোনয়ন-অসন্তোষে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ নির্বাচনী এলাকার বিএনপি। দলটির নেতাদের পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ, মিটিং-মিছিল ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজনীতির মাঠ। ধানের শীষের প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করাই এখন দলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন স্থানীয় নেতারা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাবনা-১ ছাড়া বাকি চারটি আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করেছে বিএনপি। পাবনা-২ আসনে সাবেক এমপি সেলিম রেজা হাবিব, পাবনা-৩ আসনে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সভাপতি হাসান জাফির তুহিন, পাবনা-৪ আসনে বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হাবিবুর রহমান হাবিব এবং পাবনা-৫ আসনে চেয়ারপারসনের বিশেষ সহকারী শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
পাবনা-২ ও পাবনা-৫ আসনে প্রকাশ্য কোনো অসন্তোষ না দেখা গেলেও পাবনা-৩ ও পাবনা-৪ আসনে দল মনোনীত প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করে প্রার্থী পরিবর্তনের দাবিতে কার্যত বিদ্রোহে নেমেছে নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ।
চলনবিল অধ্যুষিত পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় কৃষক দলের সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন। ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে নির্বাচনী মাঠে নিজের অবস্থান জানান দিলেও তার বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম, চাটমোহর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরাসহ বিএনপির তৃণমূলের বড় একটি অংশ। তুহিনের পৈতৃক নিবাস পাবনা-২ আসনে হওয়ায় তাকে ‘বহিরাগত’ আখ্যা দিয়ে লাগাতার কর্মসূচি পালন করছেন তারা। সাধারণ ভোটাররাও অন্য এলাকার প্রার্থীকে মেনে নিচ্ছেন না বলে দাবি তাদের।
সম্প্রতি চাটমোহরে এক জনসমাবেশে উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা ঘোষণা করেন, ‘দলের মনোনয়ন পরিবর্তন না হলে আমরা আনোয়ার ভাই অথবা আমি যে কেউ একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকব। বহিরাগত কাউকে কিছুতেই মেনে নেওয়া হবে না।’
সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘তিন উপজেলার জনগণ ও ভোটাররা আমাকে চাইছেন। তাদের সিদ্ধান্তই আমার সিদ্ধান্ত। দল যদি তৃণমূলের মনোভাবের মূল্যায়ন না করে, তাহলে কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হবো। হাইকমান্ডের কাছে আবেদন, পাবনা-৩ আসনের যেকোনো স্থানীয় নেতাকে মনোনয়ন দিন। ভাড়াটে এমপি এলাকার মানুষ মেনে নেবে না।’
হাসাদুল ইসলাম হীরা বলেন, ‘গত দেড় দশক ধরে ফ্যাসিস্ট সরকারের নির্যাতন-নিপীড়ন, হামলা-মামলা, জেল-জুলুম সহ্য করেছি। আমাদের কর্মীরা কেউ লুটপাট-চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিল না। অথচ এবার একজন বহিরাগতকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, যার এলাকায় জনসমর্থন মাত্র ৫ শতাংশ। বহিরাগত কিছু লোক এসে প্রচারণা চালাচ্ছে, কিন্তু ভোট দেবে এখানকার মানুষ।’
জবাবে কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন বলেন, ‘আমি বহিরাগত নই। চাটমোহরের ভোটার হয়েছি, আমার স্ত্রী-সন্তানরাও এখানকার ভোটার। আমি চাটমোহরেই স্থায়ীভাবে বসবাস করতে চাই। কৃষক দলের সভাপতি হিসেবে দল আমাকে যেখানে প্রয়োজন সেখানেই দায়িত্ব দিতে পারে। কৃষিপ্রধান এই এলাকায় বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে আমাকে পাঠানো হয়েছে। তৃণমূলের নেতাকর্মীরা আমাকে আপন করে নিয়েছেন। অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি না করে সবাইকে ধানের শীষের পক্ষে কাজ করার আহ্বান জানাই।’
বিদ্রোহের আগুনে পুড়ছে ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া নিয়ে গঠিত পাবনা-৪ আসনের বিএনপিও। দল মনোনীত প্রার্থী হাবিবুর রহমান হাবিবকে ‘জনবিচ্ছিন্ন’ আখ্যা দিয়ে মাঠে নেমেছেন সাবেক এমপি ও জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সরদার এবং জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টুর নেতৃত্বাধীন গ্রুপ।
জাকারিয়া পিন্টু বলেন, ‘নকশাল, বাকশালসহ বিভিন্ন দলের লোকজন এনে বিএনপিতে মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে। গত ১৫ বছরে তৃণমূলে যারা নির্যাতিত-নিপীড়িত হয়েছে, তাদের চাওয়ার প্রতিফলন মনোনয়নে হয়নি। এত সহজে আমরা সংগঠন ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেব না। প্রয়োজনে বিদ্রোহ করব, যেকোনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে প্রস্তুত।’
সাবেক এমপি সিরাজুল ইসলাম সরদার বলেন, ‘দখলবাজি-চাঁদাবাজি ও নানা কারণে এ আসনের বিএনপি ভোটাররা অভিমানী। বিএনপির ভোট যেন বাইরে না যায়, সে জন্য অসুস্থ শরীর নিয়েও মাঠে নেমেছি। বিএনপির ঘাঁটি এই আসন পুনরুদ্ধার করতে হলে মনোনয়নে তৃণমূলের প্রাধান্য দিতেই হবে।’