সর্বনাশা মাদক থেকে নিজেকে রক্ষা করুন

মাদকাসক্তি আজ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের এক নীরব ঘাতক। এটি শুধু ব্যক্তিজীবন নয়, জাতির ভবিষ্যৎ গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছে। বিশ^ জুড়ে তারুণ্য যখন মেধা ও প্রগতির প্রতীক, তখন দেশে মাদকের ছোবল সম্ভাবনাময় জীবনকে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে। গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৯-২০২৩ সালের তথ্যানুযায়ী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিরাময় কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের প্রায় ৬৯ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ মাদকাসক্তদের সবচেয়ে বড় অংশ দেশের তরুণ ও যুবসমাজ। ইয়াবা, ফেনসিডিল থেকে শুরু করে ক্রিস্টাল মেথের মতো নতুন ও শক্তিশালী মাদকের সহজলভ্যতা এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। মাদক কেবল জীবন কেড়ে নেয় না, এটি সম্ভাবনাময় মানুষকে তার প্রিয়জন থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দেয়, যা একটি সামাজিক ও মানসিক ট্র্যাজেডি। মাদকের আগ্রাসন কেবল সরবরাহ নয়, তরুণদের মনোজাগতিক শূন্যতা পূরণের ব্যর্থতা থেকেও সৃষ্টি। এই শূন্যতার অন্যতম কারণ হলো ডিজিটাল প্রযুক্তি ও স্ক্রিন আসক্তি। সোশ্যাল মিডিয়া ও অনলাইন গেমিংয়ের অতিরিক্ত ব্যবহার তরুণদের বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকিত্ব ও মানসিক অবসাদ তৈরি করে। এ শূন্যতাই অনেক সময় মাদকের দিকে ঠেলে দেয়। সুতরাং মাদকের আগ্রাসন মোকাবিলায় শুধু সরবরাহ বন্ধ নয়, চাহিদা সৃষ্টির মূল কারণ, অর্থাৎ তরুণদের মনোজাগতিক দুর্বলতা দূর করা অত্যাবশ্যক।

মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই হওয়া উচিত মানসিক ও আত্মিক। এটি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং মূল্যবোধের শিক্ষা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, শিল্পকলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমে তরুণদের সক্রিয়ভাবে যুক্ত করতে হবে। সৃজনশীল পরিবেশে মননের স্বাভাবিক বিকাশ ঘটলে, তারা মাদক থেকে দূরে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে সহজলভ্য ও সংবেদনশীল কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা করা অপরিহার্য। মানসিক চাপ মোকাবিলা এবং হতাশা দূর করার কৌশল শেখানোই মাদকের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় টিকা। কর্মসংস্থান অনিশ্চয়তা কমাতে কর্মমুখী শিক্ষা ও বাস্তবভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে জোর দিতে হবে। সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকলে, তরুণরা ভবিষ্যৎ নিয়ে আত্মবিশ্বাসী হয় এবং মাদকের প্রলোভন এড়াতে পারে। সন্তানদের সঙ্গে পিতা-মাতার খোলামেলা আলোচনা ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মাদকের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরক্ষা। পারিবারিক উষ্ণতা হতাশা ও একাকিত্ব দূর করে। তরুণদের জন্য মাদকমুক্ত ও স্বাস্থ্যকর বিনোদনের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। পাঠাগার, কমিউনিটি সেন্টারসহ উন্মুক্ত স্থানে গঠনমূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে অবসর সময়কে ইতিবাচক কাজে ব্যয় করার সুযোগ দিতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে মননের জয় নিশ্চিত করতে, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ডিটক্স এবং স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করে তরুণদের বাস্তবমুখী বিনোদনে উৎসাহিত করতে হবে।

মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ার মহৎ কাজটি শুধু সরকারের একার নয়। এটি সরকার, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও গণমাধ্যম সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। এক্ষেত্রে সরকারকে অবশ্যই আইন প্রয়োগে আরও কঠোর হতে হবে। সীমান্ত ও অভ্যন্তরীণ মাদক নেটওয়ার্ক নির্মূলে শূন্য সহনশীলতা নীতি কার্যকর রাখতে হবে। শুধু ধরপাকড় নয়, পুনর্বাসন ব্যবস্থাকেও ঢেলে সাজাতে হবে। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্রে আসক্তদের শুধু শারীরিক চিকিৎসা নয়, দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ও সামাজিক পুনর্বাসনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।  যাতে তারা মূলস্রোতে ফিরে আসতে পারে। মাদকাসক্তদের স্বাস্থ্য বীমা বা সরকারি সহায়তা কর্মসূচির মাধ্যমে, সমাজের অংশ হিসেবে তাদের আপন করে নিতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবার হলো সন্তানের প্রথম শিক্ষালয়। পিতা-মাতাকে সন্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও খোলামেলা সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। কারণ সন্তানরা যাতে নির্ভয়ে তাদের মানসিক চাপ বা সমস্যাগুলো আলোচনা করতে পারে। সন্তানদের জীবনে মূল্যবান সময় দেওয়া জরুরি। স্থানীয় সামাজিক কমিটি ও যুব সংগঠনগুলোকে সচেতনতা বৃদ্ধি ও মাদকবিরোধী প্রচারে সক্রিয় হতে হবে। সামাজিক নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে পাড়া-মহল্লায় মাদকের আড্ডা জমতে না পারে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত মাদকবিরোধী ওয়ার্কশপ, বিতর্ক ও সেমিনারের আয়োজন করতে হবে। পাঠ্যক্রমে মাদকের ভয়াবহতা ও এর মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব অন্তর্ভুক্ত করা সময়ের দাবি। মাদককে কোনোভাবেই আকর্ষণীয় বা চমকপ্রদভাবে করা চলবে না, বরং এর ভয়াবহ সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দিকগুলো তুলে ধরে সচেতনতা তৈরি করতে হবে।

মাদকমুক্ত প্রজন্ম গড়ার সম্মিলিত উদ্যোগে ইতিবাচক পিয়ার ইনফ্লুয়েন্স তৈরি করা একটি কার্যকর হাতিয়ার। বন্ধুদের নেতিবাচক চাপ যেমন মাদকের দিকে টানে, তেমনি সফল রোল মডেল ও সমবয়সীদের প্রেরণা সঠিক পথে চালিত করতে পারে। খেলাধুলা, বিজ্ঞান বা সমাজসেবায় সফল তরুণদের আইকন হিসেবে তুলে ধরতে হবে। স্কুল-কলেজে এমন সফল তরুণদের দিয়ে নিয়মিত পিয়ার এডুকেশন (সচেতনতামূলক কর্মসূচি) পরিচালনা করা যেতে পারে। এতে মাদকের বিরুদ্ধে তরুণদের নিজেদের কণ্ঠস্বর জোরালো হবে এবং তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে প্রলোভন প্রত্যাখ্যান করতে শিখবে। মাদকাসক্তি জাতির অস্তিত্ব সংকটেরর প্রশ্ন। কিন্তু এই সংকটকে আমরা সুযোগে পরিণত করতে পারি একটি সুস্থ, সবল এবং মননশীল প্রজন্ম গড়ে তোলার জন্য। এই লড়াইয়ে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য। যদি আমরা একযোগে কাজ করি এবং আমাদের তরুণদের হাতে মাদক নয়, মেধা ও মননের শক্তি তুলে দেই, তবেই সম্ভব ‘মাদক নয়, মননের জয়’ নিশ্চিত করা। মননের জয়ই হবে, মাদকের সর্বশেষ পরাজয়। মাদকাসক্ত মানুষ কখনো সমাজে কোনো ধরনের উপকার তো দূরের কথা, নিজেকেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এটি তার অপরাধ নয়। যে পরিস্থিতিতেই হোক, সে আসক্ত হয়েছে। কিন্তু সমাজ এবং সরকারের কাজ, তাকে এই সর্বনাশা পথ থেকে রক্ষা করা। যে কারণে শুধু লোক দেখানো আইন করে মাদকের বিস্তার রোধ করা সম্ভব না। দরকার মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। মানুষ যখন নিজ থেকে সচেতন হবেন, যখন টের পাবেন তিনি ধ্বংসের পথে পা বাড়িয়েছেন তখন নিজেই সেই পথ থেকে দূরে আসবেন। এক্ষেত্রে প্রথমেই দরকার সার্বিক প্রচারণা। নিজেকে সচেতন করুন। কিন্তু প্রথমে উদ্যোগ নিতে হবে সরকারকে। কারণ বুদ্ধিবৃত্তিসম্পন্ন এবং মেধাবী প্রজন্ম গড়ে না উঠলে, দেশের ভবিষ্যৎ কার হাতে থাকবে? রাজনৈতিক নেতৃত্ব দেবেন কারা? সচেতন হোন, প্রজন্ম রক্ষা করুন দেশ বাঁচান।

লেখক : প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ জয়পুরা এসআরএমএস স্কুল অ্যান্ড কলেজ রামগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর

jasim6809786@gmail.com