আজ তোমাদের এমন তিনটি বইয়ের কথা বলব, যে বইগুলো পড়লে তোমরা জানতে পারবে আমাদের দেশটি কীভাবে আমাদের হলো। এক সময় আমাদের দেশটি বর্তমান পাকিস্তান নামের দেশটির সঙ্গে একই দেশ হিসেবে ছিল। বর্তমান পাকিস্তানের নাম ছিল পশ্চিম পাকিস্তান আর আমাদের দেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। একই দেশ হলেও শাসক শ্রেণির মানুষরা পশ্চিম পাকিস্তানের হওয়ায় তারাই বেশি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যেত। পূর্ব পাকিস্তানে তখন প্রচুর পাটের চাষ হতো। বিশে^র তখন পাটের ব্যাপক চাহিদা ছিল এবং মোট চাহিদার সিংহভাগ জোগান দিত পূর্ব পাকিস্তান। কিন্তু সেই বিপুল অর্থ তারা ব্যয় করত পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে। একের পর এক শহরকে রাজধানী করে নতুন নতুন অট্টালিকা, রাস্তা তৈরি করত, তারপর আরেকটি শহরকে রাজধানী করে সেটিরও ব্যাপক উন্নয়ন করত। সবই পূর্ব পাকিস্তানের পাট বিক্রির টাকায়। এ দিকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অনাবৃষ্টিতে খাদ্যাভাবে মারা গেলেও তেমন সহযোগিতা করত না। পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ তাই নির্বাচনে এ অঞ্চলের মানুষকে শাসক হিসেবে নির্বাচন করল। শাসন ক্ষমতা হারানোর ভয়ে তারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চালায় ব্যাপক গণহত্যা। বাংলার মাটি থেকে পাকিস্তানিদের উৎখাত করতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সে বছরেরই ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পরাজয় স্বীকার করে আত্মসমর্পণ করে। কিন্তু এই দীর্ঘ নয় মাস দেশ জুড়ে তারা যে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তা আমাদের জাতির বুকে তৈরি করে এক গভীর ক্ষত।
বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে এই দেশটির জন্ম ইতিহাস জানা আমাদের সবার কর্তব্য। এজন্য তোমাদের পড়তে হবে মুক্তিযুদ্ধের গল্প। প্রথমেই যে বইটির কথা বলব সেটির নাম ‘একাত্তরের যোদ্ধা কিশোর’। লেখক মোস্তফা হোসেইন খুঁজে খুঁজে বের করেছেন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী কিশোরদের। তাদের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে লিখেছেন এই বইটি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারবে এমন যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে খুঁজে খুঁজে মেরে ফেলত। কিন্তু তারা ভাবতেও পারেনি এদেশের কিশোররাও অসম সাহসে অস্ত্র ধরে দেশকে স্বাধীন করবে। একটি যুদ্ধে যে এত বিপুল পরিমাণে শিশু-কিশোর নেওয়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু কেন তারা অস্ত্র হাতে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ল? বইটি পড়লেই জানতে পারবে।
দ্বিতীয় যে বইটির কথা বলব তার নাম ‘গল্প নয় সত্যি’। এই বইয়ে বর্ণিত ঘটনাগুলো সবই সত্য ঘটনা, কিন্তু সেগুলোর অভিনবত্ব হার মানায় গল্পকেও। মানুষের কাছে সবচেয়ে আপন হলো, তার নিজের প্রাণ। এই প্রাণ বাঁচাতেই ১৯৭১ সালে মানুষ ঘর ছেড়ে অজানার পথে পা বাড়িয়েছিল। কিন্তু সেই প্রাণ কি কেউ অচেনা মানুষের জন্য ত্যাগ করতে পারে? পারে! লেখক-সাংবাদিক তুষার আবদুল্লাহ এই বইয়ে অপরাজিতা বাংলাদেশ শিরোনামে তেমন একটি ঘটনার কথাই বলেছেন। তিনি তার নাম দিয়েছেন অপরাজিতা। এমন অসংখ্য অপরাজিতাদের ত্যাগেই দেশটি পেয়েছি আমরা। তাদের কয়েকজনের কথা জানতে পারবে গল্প নয় সত্যি বইটিতে।
শিশু-কিশোরদের নিয়ে একটি বাহিনী গঠিত হয়েছিল। সেই বাহিনীকে আদর করে মুক্তিযোদ্ধারা ডাকতেন বিচ্ছু বাহিনী। তারা লুকিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তথ্য নিয়ে আসত, অস্ত্র বহন করত, যুদ্ধও করত। তাদের সত্য ঘটনাই তুলে ধরেছেন লেখক আহমেদ রিয়াজ। লিখেছেন তার ‘একাত্তরের বীরবিচ্ছু’ বইতে। রহস্য রোমাঞ্চ ঘরানার বই তো অনেক পড়েছ। কিন্তু এই বইটি পড়লে বুঝতে পারবে বাস্তব কল্পনার থেকেও আরও বেশি রোমাঞ্চময়।