মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার হাতছাড়ার শঙ্কা

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ আছে; কবে আবার তা চালু হবে কেউ বলতে পারছে না। কূটনৈতিক দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের ঢালাও মামলার কারণে এ শ্রমবাজারের পুনরায় চালু হওয়ার পথ সংকুচিত করেছে। এ অবকাশে নেপালসহ কয়েকটি দেশের শ্রমিকরা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে ঢুকছে।

আটকেপড়া ১৮ হাজার শ্রমিকের মাত্র ১৯০ জনকে মালয়েশিয়ায় পাঠিয়েছে বোয়েসেল। এর আগে মালয়েশিয়া সরকার বেশ কয়েকটি শর্ত দিলেও সেসব পূরণ করতে পারছে না বাংলাদেশ। ফলে ৩১ ডিসেম্বর মধ্যে সব শ্রমিককে পাঠানোর বিষয়টি অনিশ্চিত।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, যেসব এজেন্সি মালয়েশিয়ায় শ্রমিক পাঠাবে তাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা সে দেশে পাঠাতে বলা হয়েছে। মালয়েশিয়া বলেছে, একেকটি এজেন্সির অফিস ১০ হাজার স্কয়ার ফুটের হতে হবে; এক ফুট কম হলেও তাদের নাম পাঠাতে বারণ করা হয়েছে। শর্তের রেকর্ডপত্র তালিকার সঙ্গে দিতে হবে জানিয়ে গত ২৭ অক্টোবর মালয়েশিয়া সরকার বাংলাদেশকে চিঠি দিয়েছে। মালয়েশিয়ার এ উদ্যোগকে আপাতদৃষ্টিতে শ্রমবাজারকে স্বচ্ছ ও নৈতিক করার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হলেও শর্ত পূরণে বাংলাদেশের অধিকাংশ এজেন্সি হিমশিম খাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট মহলে নতুন করে ‘সিন্ডিকেট’ ফিরে আসার জল্পনা শুরু হয়েছে।

শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন বিশ্লেষক দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া সরকারের উচিত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর কার্যক্রম কঠোরভাবে মনিটর করা, যাতে শ্রমিকরা প্রতারিত না হন। যারা অপকর্ম করছে তাদের আইনের আওতায় নিতে হবে। গ্রামাঞ্চলে সহজ-সরল লোকদের সঙ্গে যেসব দালাল প্রতারণা করছে, তাদের তালিকা তৈরি করে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের প্রতিরোধ করতে না পারলে সমস্যা বাড়তেই থাকবে। নষ্ট হবে বাংলাদেশের সুনাম। তারা বলেন, মালয়েশিয়ার শর্ত বেশিরভাগ এজেন্সিই তা পূরণ করতে পারবে না।

অভিযোগ উঠেছে, বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ক্ষেত্রে সরকার ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। দুই দেশের সরকারপ্রধান, উপদেষ্টা, মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ধারাবাহিক বৈঠক ও সফর সত্ত্বেও আশা জাগানিয়া অগ্রগতি দেখা যায়নি। বাংলাদেশের কূটনৈতিক দুর্বলতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলা শ্রমবাজার পুনরায় চালু করার পথ সংকুচিত করেছে।

নিবন্ধনেও পিছিয়ে বাংলাদেশ : বায়রা সূত্র জানায়, ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেলেও গত এক বছরে বাংলাদেশ পাঠাতে পেরেছে মাত্র ২৯০ জন। অন্যদিকে ২০২৪ সালে নেপাল থেকে ২১ হাজার ১৮৩, ইন্দোনেশিয়া থেকে ২৯ হাজার ৯০০ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় গেছে। গত নভেম্বরে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ৮ হাজার ৩৩৪ জন মালয়েশিয়ায় গেছে আর এ সময়ে বাংলাদেশ থেকে গেছে মাত্র ৯০ জন। মালয়েশিয়া সরকার জানিয়েছে, আগামী জানুয়ারিতে নেপাল ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আরও ৫০ হাজার শ্রমিক নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার জন্য নিবন্ধন (১৪ সোর্স কান্ট্রি) করেছে ১ লাখ ১৩ হাজার ২২২ জন। তার মধ্যে নেপালের ৬০ হাজার, ইন্দোনেশিয়ার ২২ হাজার ৬৮৫, ভারতের ১২ হাজার ২৭ ও পাকিস্তানের ৭ হাজার ৪২৮ জন। বাংলাদেশ থেকে নিবন্ধন করেছে মাত্র ১ হাজার ৮৫৩ জন।

হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগ : মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ বলছে, বিভিন্ন এজেন্সির সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে মানব পাচার ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগে ‘হয়রানিমূলক’ মামলা হয়েছে, যা মালয়েশিয়া সরকারের অভিবাসন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মালয়েশিয়ার ভাবমূর্তি ক্ষুণœ করেছে। মালয়েশিয়া দ্রুত মামলাগুলোর নিষ্পত্তি চেয়েছে।

রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সংগঠন বায়রার সাবেক মহাসচিব মুক্তিযোদ্ধা আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘কর্মীদের নিরাপদ কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা এবং কম খরচে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের কে ব্যবসা করল, কে করল না সেটাকে প্রাধান্য না দিয়ে দেশের স্বার্থ ও শ্রমিকের স্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের বায়রার কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলকভাবে অর্থ ও মানব পাচারের মামলা দেওয়া হয়েছে। অনতিবিলম্ব এসব মামলা প্রত্যাহার করা বা নিষ্পত্তি করা জরুরি। মামলা থাকলে কোনো এজেন্সি স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে না। তাদের মধ্যে ভীতি কাজ করবে।’

বোয়েসেলের ব্যর্থতা ও ধীরগতি : ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত কলিং ভিসা, নিয়োগ অনুমতি, বিএমইইটির ছাড়পত্রসহ যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরও প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি। গত বছর ৪ অক্টোবর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের বাংলাদেশ সফরের সময় বিষয়টি উত্থাপন করা হলে তিনি এসব শ্রমিককে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল দুবার মালয়েশিয়া সফর করেছেন। কয়েক দফায় যৌথ ওয়ার্কিং কমিটির সভাও হয়েছে। কিন্তু শ্রমবাজার খোলার লক্ষণ দেখা যায়নি। গত বছর মে মাসে আটকেপড়া শ্রমিকদের মালয়েশিয়ায় পাঠানোর দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ ওভারসিস এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল) এসব শ্রমিককে পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা নির্ধারিত সময় গত জুলাইয়ের পর মাত্রা ১৫০ জনকে পাঠাতে পেরেছে। ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে অন্য শ্রমিকদের পাঠাতে না পারলে তাদের মালয়েশিয়ায় যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হবে না।

বিনা খরচে পাঠানোর কথা বলে হাতিয়ে নিচ্ছে অর্থ : আটকেপড়া শ্রমিকদের বিনা খরচে পাঠানোর কথা। কিন্তু তাদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে ১ লাখ ৬২ হাজার ৫০০ টাকা। গত ৪ সেপ্টেম্বর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সার্কুলারে এ খরচ নির্ধারণ করা হয়। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের ৩১ মে পর্যন্ত বেসরকারি রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর জন্য সরকার অনুমোদিত খরচ ছিল ৭৮ হাজার ৯০০ টাকা। বোয়েসেল তাদের বোর্ডসভায় মালয়েশিয়ার একটি সংস্থাকে ভিসা ক্রয়ের জন্য জনপ্রতি ৭৫ হাজার টাকার অনুমোদন দিয়েছে। এ টাকা মালয়েশিয়ান নাগরিক জসওয়ান সিং নামের ব্যক্তির মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে। টাকা পাঠানো হয়েছে হুন্ডির মাধ্যমে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। অভিযোগ, বোয়েসেল অবৈধ ভিসা ট্রেডিং ও মানব পাচারে জড়িত। অথচ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তরা এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

বায়রার সিনিয়র সদস্য মোবারক উল্লাহ শিমুল বলেছেন, ‘আমরা যখন লোক পাঠাই তখন ভিসা ট্রেডিংয়ের জন্য আমাদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং ও মানব পাচারের অভিযোগে সিআইডি এবং দুদক মামলা করে। এখন সরকারি সংস্থাও একই কাজ করছে। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবে কারা?’ তিনি বলেন, ‘দুই দেশের সরকারপ্রধান পর্যায়ের সভায় আটকেপড়া ১৮ হাজার শ্রমিককে পাঠানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়, যা বোয়েসেলের কাজ। তারা বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে মাত্র ১৯০ জনকে পাঠাতে পেরেছে। বাকিদের যাওয়ার বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়।’

বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব পুত্রামালয়েশিয়ার গবেষক সৈয়দ কামরুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছর মে মাসে মালয়েশিয়ায় শ্রমিক নেওয়া বন্ধ হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার নতুন করে শ্রমবাজার খুলতে পারেনি। এ সুযোগটি নিচ্ছে নেপাল, ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ। অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় আমরা বেশ কিছু বিধি ও শর্ত জুড়ে দেওয়ার বিষয়ে অবহিত হয়েছি। কিন্তু নতুন বাজার খোঁজা ও বিদ্যমান বাজারগুলোর সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখিনি।’