আমরা গর্বের সঙ্গে রংপুরের হয়ে খেলি: আকবর আলী

টি-টোয়েন্টির পর চারদিনের ম্যাচের জাতীয় ক্রিকেট লিগের শিরোপাও জিতেছে রংপুর বিভাগ। নেতৃত্বে আকবর আলী মানেই যেন শিরোপা। অধিনায়কের কাছ থেকে সাফল্যের নেপথ্যের গল্প শুনেছেন সামীউর রহমান

শেষ রাউন্ড যখন শুরু হয়, রংপুর তখন পয়েন্ট টেবিলের তিনে। ওপরে সিলেট এবং ময়মনসিংহ। ফর্ম, প্রতিপক্ষ ও সম্ভাবনার বিচারে এই দুই দলই শিরোপার দৌড়ে এগিয়ে। সেখান থেকে শিরোপা জয়, কখন ভেবেছিলেন যে রংপুরও চ্যাম্পিয়ন হয়ে যেতে পারে?

আকবর আলী: দেখুন আপনি যদি আমাদের ষষ্ঠ রাউন্ডটা বাদ দেন, যখন আমরা পঞ্চম রাউন্ড শেষ করি তখনো আমরা পয়েন্ট টেবিলে শীর্ষে ছিলাম। প্রথম ৩ রাউন্ডে আমাদের ম্যাচগুলো ড্র হয়েছিল। তখন হয়তো আমরা টেবিলের মাঝামাঝি ছিলাম, তারপর যখন আমরা চার নম্বর ও ৫ নম্বর ম্যাচ দুটো জিতলাম, তখন কিন্তু আমরা শীর্ষেই উঠে এসেছিলাম। ষষ্ঠ রাউন্ডে যখন আমরা ম্যাচটা হেরে যাই তখন আমরা একটু ব্যাকফুটে চলে গিয়েছিলাম। কারণ শেষ রাউন্ডে এসে ফলটা শুধু আমাদের ম্যাচের হারজিতের ওপরই নির্ভর করছে না, সিলেট এবং ময়মনসিংহের নিজ নিজ খেলার ফলের ওপরও নির্ভর করছে। আমাদের শুধু কাজটা ছিল যে আমাদের নিজেদের ম্যাচটা জিততে হবে, সেটা ছলে-বলে-কৌশলে যেভাবেই হোক। আর তারপর দেখতে হবে সিলেট এবং ময়মনসিংহের ম্যাচগুলোর ফল কী হয়। আমরা গোটা আসর জুড়েই একটা ভালো ভারসাম্য বজায় রেখে খেলে গেছি, শুধু চট্টগ্রামের বিপক্ষে ম্যাচটা বাদে।

এসব তো ছিল সম্ভাবনার অঙ্ক। এরপর খেলা যখন মাঠে গড়াল, খুলনা আপনাদের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে একটা ভালো লিডও নিয়ে নিল, সেখান থেকে ম্যাচটা যেভাবে নাটকীয়ভাবে জিতে গেল রংপুর, দ্বিতীয় ইনিংসে তাদের ৯৬ রানে অলআউট করে দিয়ে এরপর ইকবালের সেঞ্চুরি...সেখানেই কি শিরোপার দিকে এগিয়ে যাওয়া রংপুরের?

আকবর: সৎভাবে বললে, ওদের (খুলনা) রানটা ৩০০’র ওপরে হলেও বোলিং ইউনিট হিসেবে আমরা খুব ভালো বোলিং করেছিলাম। আমরা বেশ কিছু ক্যাচ ফেলি, কিছু সুযোগ নষ্ট করি, যে কারণে ওদের রানটা প্রথম ইনিংসে ৩০০’র বেশি হয়ে যায়। ওসব না হলে তাদের ২২০-২৫০ রানের ভেতর অলআউট করতে পারতাম। আমাদের প্রথম ইনিংসের ব্যাটিংটা ভালো হয়নি। তারপর দ্বিতীয় ইনিংসে যখন তাদের ১৩০-১৩৫ রানের লিড হলো, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল খুলনাকে ১৫০-১৭০ রানের ভেতর দ্বিতীয় ইনিংসে আটকে দিতে পারলে আমাদের সামনে চতুর্থ ইনিংসে লক্ষ্য থাকবে ৩০০ রানের মতোÑ যেটা করা সম্ভব। ইকবালের ব্যাটিং তো বটেই, তবে আমাদের বোলাররা মূল কাজটা করে দেয় তাদের ১০০’র নিচে অলআউট করে, যার ফলে আমাদের লক্ষ্যটা দাঁড়ায় ২৩০ রানের মতো। আমরা জানতাম মাত্র দুটো জুটি হলেই এই রানটা আমরা করে ফেলতে পারব। যেটা নাঈম ভাই-ইকবাল এবং আমার এবং ইকবালের মধ্যে হয়েছে, যে কারণে আমরা ম্যাচটা জিততে পেরেছি।

ইকবালের প্রসঙ্গে একটু জানতে চাই, তার তো এটাই প্রথম সেঞ্চুরি। চাপের মুখে, দলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। তার সঙ্গে ব্যাটিংও করলেন। কেমন দেখলেন তাকে?

আকবর: আসলেই আমি বেশ অবাক হয়েছি। খুবই সম্ভাবনাময় মনে হয়েছে। এনসিএল টি-২০ এর আগে এবারই ওকে প্রথম দেখেছিলাম। যখন প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লিগ চলছিল, সবশেষ মৌসুমে, তখন রংপুরের ক্রিকেটাররা কে কোথায় খেলছিল সেটা লক্ষ্য রাখছিলাম। এদের ভেতর ৩-৪ জন ক্রিকেটার খুবই ভালো করছিল, তাদের পরিসংখ্যান খুব আশাব্যঞ্জক ছিল। এরপর আমরা যখন জাতীয় লিগের জন্য ক্যাম্প করি রংপুরে, টি-টোয়েন্টির আগে তখনই আমরা বুঝতে পেরেছিলাম, যে তার মধ্যে বিশেষ কিছু একটা আছে। তখন তাকে আমরা টি-২০ দলে নেই। ইকবালকে ওখানেই প্রথম দেখা, দেখেই মনে হয়েছে রংপুরের হয়ে সে বেশ ভালো করার সামর্থ্য রাখে।

খুলনার বিপক্ষে ম্যাচটা তো আপনারা তিনদিনেই জিতে গিয়েছিলেন, সিলেট ও ময়মনসিংহের খেলা তখনো শেষ হয়নি। ময়মনসিংহের ম্যাচের ফলটা কী হতে পারে সেটা বোঝা যাচ্ছিল, তবে সিলেট-বরিশাল ম্যাচে তখনো অনেক কিছু হতেই পারত। ঠিক কখন বুঝতে পারলেন যে রংপুর চ্যাম্পিয়ন হতে যাচ্ছে?

আকবর: খুলনার বিপক্ষে জেতার পর, আমরা স্বাভাবিকভাবেই সবকিছু ক্লোজ করে দিয়েছিলাম, ম্যাচের পর যেসব আলোচনা হয় কোচরা সেসব আলোচনা করে নিজেরা আলাপ করছিলাম যে বরিশাল যদি ম্যাচটায় চতুর্থ দিনের লাঞ্চ পর্যন্ত ব্যাটিং করতে পারে তাহলে সিলেটের পক্ষে বাকি দুই সেশনে রানটা তাড়া করা সম্ভব হবে না। কারণ চতুর্থ দিনে সিলেটকে তখন ৩০০’র ওপরে রান তাড়া করতে হবে, তৃতীয় দিন শেষেই বরিশালের ২০০’র ওপরে রান হয়ে গিয়েছিল। আমরা আশা করছিলাম যে ওরা যদি কোনোরকমে মধ্যাহ্ন বিরতি পর্যন্ত ব্যাট করে তাহলেই হয়ে যাবে। যখন তারা মধ্যাহ্ন বিরতির আগে ইনিংস ঘোষণা করে দেয় তখন একটু অবাক হয়েছিলাম কারণ তাদেরও জেতার একটা সুযোগ ছিল, জিতলে তারাও রানার্স আপ হতে পারত। আমরা খেলা দেখছিলাম, সিলেটের ব্যাটিং অনেক ভালো বলতে পারেন তবে চতুর্থ দিনে ৩০০’র বেশি রান করা, তাও ৬০ ওভারের মধ্যে; অনেকটা অসম্ভবই বলা যায়।

বাংলাদেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে সব রকম প্রতিযোগিতাতেই তো খেলেছেন; জাতীয় লিগের টি-২০, চারদিনের ম্যাচ, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, বিসিএলের দুটো সংস্করণ, বিপিএল... সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক প্রতিযোগিতা কোনটা মনে হয়?

আকবর: আমি বলব প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিচারে সেরা ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ, ওখানকার প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান বলেন, পরিবেশ বলেন, সবার অংশগ্রহণ বলেন... এটা অনেক অন্য পর্যায়ের। তারপর যদি বলেন, বিপিএল আছে; সবশেষ দুই বছর ধরে এনসিএল টি-২০ টুর্নামেন্টটাও বেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হচ্ছে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের কথা বললে এই বছরের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতাটাকে আমি অন্যরকম বলব, দেখেন শেষ রাউন্ড পর্যন্ত ৫টা দলের যে কেউ চ্যাম্পিয়ন হতে পারত। এতেই বোঝা যায় যে এই বছর কতটা কঠিন ছিল এই আসরটা।

যেটা বললেন, দেখা যাচ্ছে সাদা বলের সীমিত ওভারের টুর্নামেন্টগুলোই বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হয়। এটা কি এসব ম্যাচে গণমাধ্যমের নজর বেশি থাকে, খেলা সম্প্রচার হয়; এসব কারণেই কি খেলোয়াড়রা বেশি এফোর্ট দেন?

আকবর: গণমাধ্যমের আগ্রহের ব্যাপারটা আপনারা ভালো বলতে পারবেন, তবে খেলোয়াড় হিসেবে আমার মনে হয়, পেশাদার হিসেবে যে যেখানেই খেলুক প্রত্যেকটা খেলোয়াড় যখন পাড়ার ক্রিকেটেও খেলতে যায় সেখানেও সে জিততেই চায়, ভালো করতে চায়। এই মনোভাবটা সবসময়ই থাকে। তবে এবারের জাতীয় লিগে যেটা হয়েছে, ঢাকা বিভাগ শেষ ম্যাচ পর্যন্ত পয়েন্ট টেবিলের নিচে ছিল। তাদের দলটার দিকে যদি তাকান, তাহলে টুর্নামেন্টের শুরুতে এই দলটার খেলোয়াড় তালিকা দেখলে মনে করতেন যে এই দলটা শীর্ষ তিনে থাকবেই থাকবে। অথচ শেষ পর্যন্ত তারা তলানিতেই আসর শেষ করেছে। এটাই বোঝায় কতটা আনপ্রেডিক্টেবল ছিল এবারের মৌসুমটা। প্রতি বছর বরিশাল বিভাগকে দেখি আমরা যে তারা খুব স্ট্রাগল করে, তবে এই বছর তারা যেভাবে খেলেছে তাতে মনে হয় প্রতিটা দলের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বরিশাল। আর আমাদের দলের কথা যদি বলেন, সবাই খুব ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিল। গত কয়েক বছরে আমরা দুবার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে চ্যাম্পিয়ন হলাম, একবার অপরাজিত রানার আপ হয়েছিলাম, দুবার টি-২০ চ্যাম্পিয়ন হলাম। আমাদের দলের পরিবেশ বলেন, সংস্কৃতি বলেনÑ সবকিছুই খুব ভালোভাবে আগাচ্ছে। সিনিয়র ক্রিকেটাররা অনেকদিন ধরেই আছেন, বেশ কিছু তরুণ ক্রিকেটারও উঠে আসছে। এবারে ইকবালের কথা বলা যায়, হাশেম ভাই একদম নতুন না হলেও এই জায়গাটায় নতুন খেলছেন, বর্ষণ (রোহনাত দৌলা), মুশফিক ওরা চোটের কারণে খেলতে পারেনি। তারপরও আমাদের দলে অনেক ভালো ভালো খেলোয়াড় উঠে আসছে আমি বলব।

বিশ্বের অনেক দেশেই দেখা যায় কোনো কোনো রাজ্য দল; যেমন ভারতে রঞ্জি ট্রফির মুম্বাই দল বা অস্ট্রেলিয়ায় শেফিল্ড শিল্ডে নিউ সাউথ ওয়েলস দলে সুযোগ পাওয়াটা অনেকটা জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়ার মতোই, সেখানে এতই প্রতিযোগিতা খেলোয়াড়দের ভেতর। রংপুর বিভাগীয় দলেও কি এ রকম কোনো সংস্কৃতি তৈরি করতে চান?

আকবর: আমি ড্রেসিং রুমের কিছু কথা যদি বলি, নাঈম (ইসলাম) ভাই তো সবচেয়ে সিনিয়র, বাংলাদেশে যারা এখনো ক্রিকেট খেলছেন তাদের মধ্যেও সবচেয়ে সিনিয়র এক দুই জন হবেন, নাঈম ভাই একটা কথা সবসময় বলেন যে, আমরা যখন রংপুরের প্রতিনিধিত্ব করব তখন আমরা যেন মনে করি আমরা আমাদের ঘরকে, নিজের এলাকাকে প্রতিনিধিত্ব করছি। এই গর্ব নিয়ে আমরা যেন খেলি। গর্বের সঙ্গে দায়িত্ববোধও আসে, আমরা চেষ্টা করছি আস্তে আস্তে এই সংস্কৃতির গুরুত্বটা উঠতি খেলোয়াড়দের বোঝাতে। আমি আশাবাদী, রংপুর দলের যে পরিবেশ আছে, তাতে আগামী কয়েক বছরে এই পরিবেশ আরও ভালো হবে।

আপনি বিপিএলে খেলেছেন ৩/৪ মৌসুম। যেহেতু আগে প্লেয়ার্স ড্রাফট ছিল, অনেকটাই লটারির মতো, নিজের পছন্দের দলে বা যারা আপনাকে চাচ্ছে তাদের দলে খেলা হতো না। এবার রাজশাহী ওয়ারিয়র্সে খেলবেন, যেখানে হান্নান সরকার কোচ আপনার অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ের নির্বাচক। দলটাও বেশ গোছানো। এবার কি বিপিএল নিয়ে বাড়তি আশাবাদী, রাজশাহীতে খেলার সুযোগে নিজে কতটা খুশি?

আকবর: আমার মনে হয় খুবই ভালো একটা দল হয়েছে, যদি দলের ভারসাম্যটা দেখেন। হান্নান স্যারের সঙ্গেও কথা হয়েছে, আমাকে নেওয়ার পেছনে উনার যে চিন্তা আর কি প্রত্যাশা সেসব আমাকে জানিয়েছেন, আমার ভূমিকাটা কী হবে দলে সেটাও বলে দিয়েছেন। শান্ত ভাই (নাজমুল হোসেন) এর সঙ্গেও কথা বলব, উনি আমার কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করছেন সেটা জানতে চাইব। আমি সবসময় চিন্তা করি দল আমার কাছ থেকে কী চাচ্ছে, আমি কীভাবে সাহায্য করতে পারব। যে কোনো উপায়েই যদি দলকে সাহায্য করতে পারি, সেভাবেই চেষ্টা করব।