শান্তিপূর্ণ সমাবেশ প্রতিবাদের ভাষা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সমাবেশ ও বিক্ষোভের ঐতিহ্য বেশ প্রাচীন। স্বাধীনতার আগে ও পরে, গণঅধিকার প্রতিষ্ঠার অনেক সংগ্রামই রাস্তাঘাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। সেই ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা আজও বজায় আছে। যে কোনো দাবি-দাওয়া, অসন্তোষ বা পেশাগত ন্যায্যতা সামনে এলে বিভিন্ন সংগঠন ও গোষ্ঠী রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু যেখানে, ১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে নগর হিসেবে রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা ছিল ১.৭৭ মিলিয়ন সেখানে ২০২৫ সালের জাতিসংঘের নতুন ‘World Urbanization Prospects 2025’ রিপোর্ট অনুযায়ী, ঢাকার জনসংখ্যা আনুমানিক ৩ কোটি ৬৬ লাখ। ঢাকার আয়তন তখনো যা ছিল এখনো তাই-ই আছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্রতিবাদ সংস্কৃতির একটি অসুবিধে ক্রমান্বয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। সড়ক অবরোধ, হরতাল, কর্মবিরতি বা দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান কর্মসূচি, যা প্রায় সবক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত করে।

প্রতিবাদের অধিকার বৈধ হলেও, সড়ক অবরোধের ফলে যে ক্ষতি হয় তা বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই,  অবরোধের কারণে অ্যাম্বুলেন্স আটকে যায়, জরুরি সার্জারি বিলম্ব হয়, ক্যানসার/ডায়ালাইসিস রোগীর ক্ষতি হয়। ফলে সমাবেশের নামে রাস্তা দখল করলে জরুরি স্বাস্থ্য খাতের ওপর সরাসরি প্রভাব পড়ে। আবার সমাবেশের নামে রাস্তাঘাট দখলের ফলে অর্থনীতিবিদদের হিসাবে ঢাকায় ১ ঘণ্টার রাস্তার যানবাহন চলাচলের স্থবিরতা বা অচলাবস্থার ফলে প্রায় ২৯০ কোটি টাকা ক্ষতি হয়। আর যদি দেশের ব্যবসা খাত বিবেচনা করা হয় তবে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব, রপ্তানি অর্ডার বাতিল, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের দৈনিক আয় কমে যাওয়া, এসব তো আছেই। আন্দোলন/অবরোধের নামে রাস্তাঘাট দখলের কারণে শিক্ষাক্ষেত্রেও অসীম ভোগান্তি পোহাতে হয়। স্কুলে সময় মতো পৌঁছানো যায় না, পরীক্ষা বাতিল হয়, চাকরির পরীক্ষা দিতে আসা গ্রাম থেকে শহরে আসা শিক্ষার্থীদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব না। এগুলো তো মাপা যায়, কিন্তু মানসিক ক্ষতি? সমাবেশের নামে হুট করেই রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে গেলে নিরাপত্তাহীনতা, অনিশ্চয়তা, স্ট্রেস লেভেল বৃদ্ধিসহ মনের ওপরে কত চাপ পড়ে, আমরা বিবেচনাই করি না। তাই, নির্দ্বিধায় বলা যায় সড়ক অবরোধ প্রতিবাদের অধিকার প্রয়োগের একটি ক্ষতিকর মাধ্যম। তাই প্রশ্ন ওঠে, গণতন্ত্রে মানুষের প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে সত্য, কিন্তু সেই অধিকার প্রয়োগের পদ্ধতিতে কি জনগণের স্বার্থ বিবেচনা করা হচ্ছে? আর প্রতিবাদের এমন কঠোর ভাষা আজও আমাদের স্বাধীন দেশে বিরাজমান থাকার পেছনে সরকার কি তার দায় এড়াতে পারে?

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭ অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রত্যেক নাগরিক শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্রভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার ভোগ করবেন। তবে জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসংগত বাধানিষেধ সাপেক্ষে। এই অনুচ্ছেদের দুটি ভাগই সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সমাবেশ মৌলিক অধিকার আর জনস্বার্থে সমাবেশের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আরোপ করাও অবৈধ নয়। বাংলাদেশে এই সীমাবদ্ধতা কার্যকর করতে যে আইনগুলো প্রচলিত, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুলিশ অ্যাক্ট, ১৮৬১ ধারা ৩০ ও ৩১ যেগুলোর মূল কথা জনসমাবেশ, শোভাযাত্রা বা মিছিলের আগে পুলিশ সুপারের অনুমতি নিতে হবে এবং অনুমতি ছাড়া সমাবেশ বা মিছিল হলে পুলিশ তা ভেঙে দিতে পারে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) অধ্যাদেশ, ১৯৭৬-এর ২৯ ধারা অনুযায়ী রাজধানীতে যেকোনো সমাবেশ বা শোভাযাত্রা নিয়ন্ত্রণে পুলিশের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু এই আইনগুলোকে কাজে লাগিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ক্ষেত্রে শোষক শ্রেণির বাধা প্রয়োগ করার এক অপচেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার প্রথাও কিন্তু আমাদের সামনে বিদ্যমান। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, ২০২৪-২৫ সালে বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন, রাজনৈতিক গোষ্ঠী ও শিক্ষার্থী আন্দোলনে দেখা গেছে শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন, সমাবেশ বা মিছিলের অনুমতি পেতে দেরি বা শর্ত জটিলতা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে অনুমতি না দিয়ে বা ভেন্যু বাতিল করে প্রশাসন সমাবেশের পথ সংকুচিত করেছে। ফলে সংগঠনগুলো বাধ্য হয় সরাসরি সড়ক অবরোধে যেতে, যা দ্রুত মিডিয়ার এবং সরকারের মনোযোগ আকর্ষণ করে। সরকারের এই ধরনের মানসিকতায় আপামর জনগোষ্ঠী ধারণা করে নিয়েছে শান্তিপূর্ণ পথে নয়, বরং চাপ তৈরি করলেই দাবি আদায় সহজ। যা প্রতিবাদের মূল নীতিকে বিকৃত করেছে। ফলস্বরূপ, আমরা সাম্প্রতিক সময়ে দেখতে পেয়েছি, ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা চাকরিজনিত দাবি নিয়ে একাধিকবার সড়ক অবরোধ করেছেন। যদিও আইন অনুযায়ী থানা থেকে অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সমাবেশ করা উচিত ছিল, তা তারা অনুসরণ করেছে কি না এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত আমার জানা নেই। তবে তাদের এই প্রতিবাদে সাধারণ মানুষকে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে, অস্বীকার করার উপায় নেই। একইভাবে, বাস্তবতা হচ্ছে, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের সামনে বেতন পুনর্বিন্যাসের দাবিতে অবরোধ হয়, ফলে রোগীদের অ্যাম্বুলেন্স চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়। ২০২৫ সালের মার্চে মাননীয় হাইকোর্ট একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেয়। শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গুলি বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা যাবে না। পুলিশের ভূমিকা হবে ‘facilitator’ দমনকারী নয়। বিচারব্যবস্থার এই স্পষ্ট অবস্থান মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়ন না হলে জনগণের আস্থা অর্জন করা কঠিন। বিশ্বের অন্যান্য দেশে নাগরিক সমাবেশের অধিকার প্রয়োগের পদ্ধতিটা এখানে না টানলেই নয়। জাপানে শ্রমিক আন্দোলন ও ‘কালো ব্যাজ’ কিংবা নীরব মানববন্ধনে লাখো মানুষ অংশ নেয়, তবে রাস্তায় কোনো বিশৃঙ্খলা হয় না। এই আন্দোলন অনুমোদিত স্থানে এবং পূর্বনির্ধারিত সময়ে মানববন্ধন, পোস্টার আর্ট ও সাইলেন্ট মার্চ ব্যবহার করা হয়েছে। একইভাবে দক্ষিণ কোরিয়ায় ক্যান্ডেললাইট আন্দোলন অনুমোদিত পার্ক এবং নির্দিষ্ট রুটে সংগঠিত হয়। এ সময় জরুরি পথ সবসময় খোলা রাখা হয় এবং এই আন্দোলনে কোনো সহিংসতা হয়নি। এসব সমাবেশের ক্ষেত্রে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ আর তা হচ্ছে এসব সমাবেশ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার জন্য রাষ্ট্রও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবেছি, আমাদের দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ পথ ছেড়ে রাস্তায় কেন নেমে আসে? যে কোনো সমাবেশের পূর্বানুমতি গ্রহণ অনেক সময় অস্বচ্ছ ও রাজনৈতিক প্রভাবিত বলে জনমনে ধারণা রয়েছে।

আবার এটাও সত্যি, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ গণমাধ্যমে কম গুরুত্ব পায়। অবরোধ, সংঘাত বা অচলাবস্থা সহজেই খবর হয়, শান্ত মানববন্ধন নয়। আর বহুল বিতর্কিত ১৪৪ ধারা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতা নেই এমন অভিযোগ বহুবারই উঠেছে। ফলে মানুষ মনে করে, ‘শান্তির পায়রা পথ খুঁজে পায় না, বিশৃঙ্খল নেকড়ে তার দাবি পূরণ করতে পারে।’  তাই শান্তিপূর্ণ সমাবেশের মানসিকতা আনার জন্য সরকারকেই এগিয়ে আসতে হবে। শাসক দল বা বিরোধী দল নির্বিশেষে, সবার সমাবেশের অধিকার নিশ্চিত করতে সরকারকেই রাজনৈতিকভাবে উদার ভূমিকা নিতে হবে। সমাবেশের অনুমতি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, সময়-সীমাবদ্ধ ও ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় আনতে হবে। সরকার চাইলে সমাবেশের ক্ষেত্রে অনলাইন পারমিট সিস্টেম, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত এবং সমাবেশ বিষয়ে স্বচ্ছ মানদণ্ড প্রবর্তন করতে পারে। একই সঙ্গে সরকারের দিকনির্দেশনায় পুলিশকে পুনঃপ্রশিক্ষণ ও নীতি সংস্কারের মাধ্যমে সহায়ক ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। সমাবেশ অনুষ্ঠানের জন্য সরকারের উচিত, নির্দিষ্ট ‘প্রতিবাদ চত্বর’ প্রতিষ্ঠা করা। এ ক্ষেত্রে মিছিলের জন্যও নির্ধারিত রুট নির্ধারণ করে রাখা সরকারেরই দায়িত্ব। দাবি অযৌক্তিক হলেও সরকারকে ধৈর্য সহকারে দাবি-দাওয়া শুনতে হবে। অতিসম্প্রতি, বাংলাদেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে ‘সচিবালয় ভাতা’র দাবি পূরণে চাপ সৃষ্টি করতে সরকারি কর্মচারীরা সচিবালয়ে অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদকে প্রায় সাত ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখার ঘটনাও যেমন মেনে নেওয়া যায় না, তেমন আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি বাদিউল কবির ও সহসভাপতি মোহাম্মদ শাহীন গোলাম রাব্বানীসহ পাঁচজনকে আটক করার ঘটনাও মেনে নেওয়া যায় না। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী এসব ছা-পোষা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামে সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এ মামলা প্রদান করাও আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে সরকারের বিরূপ মনোভাবকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

অপরদিকে, নাগরিক ও আন্দোলনকারীদের সমাবেশের অধিকার যেমন আছে, দায়িত্বও তেমনি আছে। তাদের খেয়াল রাখতে হবে যে কোনো সমাবেশ চলাকালে জরুরি যান চলাচল খোলা রাখা, সড়ক অবরোধের আগে বিকল্প পদ্ধতি বিবেচনা করা এবং অনুমতি নিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সমাবেশ করা। এমন দায়িত্বশীল মনোভাব গণতন্ত্রকেই শক্তিশালী করে। তাছাড়াও সমাবেশের মাধ্যম সড়ক অবরোধ সঠিক পথ নয় বরং বিকল্প প্রতিবাদের মাধ্যম হিসেবে নীরব মানববন্ধন, ডিজিটাল সিট-ইন, অনলাইন স্বাক্ষর, ক্যান্ডেললাইট মিছিল কিংবা আর্ট-প্রতিবাদ-কে বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশে যে প্রতিবাদ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা পরিবর্তনের সময় এসেছে। রাষ্ট্রকে নিজস্ব সাংবিধানিক ভূমিকা পালন করতে হবে। নির্দিষ্ট স্থানে অনুমোদিত শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদই হোক, আন্দোলনের নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। আমরা আশা করি,  সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারীরা দিক প্রদর্শক হয়ে দাবি-দাওয়ার অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে, সাদা গোলাপের বন্যা নিয়ে প্রতিবাদ করবেন। সরকার এবং গণমাধ্যম শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিক। কেননা, এটাই হচ্ছে প্রতিবাদের সর্বোচ্চ ভাষা। আর এ ভাষায় প্রতিবাদ কার্যক্রম পরিচালিত হলে এটাই হবে জনস্বার্থ, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য উত্তম পথ। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়, জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর করে দাবি আদায় হয়নি হবে না।

লেখক: আইন-পরামর্শক ও চেয়ারম্যান ইক্ষাণ ল’ অ্যাসোসিয়েটস অ্যান্ড কনসালট্যান্সি ফার্ম

amanjakirshashi@gmail.com