বাংলাদেশের প্রখ্যাত আমলা, চিন্তাবিদ ও লেখক কাজী ফজলুর রহমান ইন্তেকাল করেছেন। ১৩ ডিসেম্বর (শনিবার) তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। দেশ ও মানুষের সেবায় নিবেদিত এক অসামান্য উত্তরাধিকার রেখে গেছেন তিনি।
১৯৩২ সালে ফেনীতে জন্মগ্রহণকারী কাজী ফজলুর রহমান ছিলেন তাঁর প্রজন্মের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আমলা ও জনবুদ্ধিজীবী। দরিদ্র ও নিপীড়িত মানুষের সেবায় ছিলেন আজীবন অঙ্গীকারবদ্ধ। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র হিসেবে এসএসসি ও এইচএসসি উভয় বোর্ড পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনেও ছিল তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ। পরবর্তীতে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস, অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তান সেন্ট্রাল সুপিরিয়র সার্ভিস (সিএসএস) পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকারকারী প্রথম বাঙালি হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এরপর দীর্ঘ কর্মজীবনে শিক্ষা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, খনিজ ও জ্বালানি এবং অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে গণশিক্ষা কর্মসূচি ও সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরিচালনা পর্ষদের সদস্যসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের প্রথম নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারে মন্ত্রীর মর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবেও কাজ করেন তিনি।
সরকারি দায়িত্বের বাইরেও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ছিলেন অগ্রণী। ব্র্যাকের প্রথম পরিচালনা পর্ষদের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্বসহ নানা সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
একজন প্রখ্যাত লেখক হিসেবেও খ্যাতি ছিল তাঁর। স্মৃতিকথা, প্রশাসন ও উন্নয়ন বিষয়ে ৩০টিরও বেশি গ্রন্থ রচনা করেছেন। ‘আমলার দিনলিপি’ ও ‘দিনলিপি একাত্তর’সহ তাঁর রচনাগুলো প্রশাসনিক ইতিহাসের মূল্যবান দলিল।
তিনি প্রয়াত সমাজসেবী লিলি রহমানের স্বামী। চার কন্যা, এক পুত্র ও দশ নাতি-নাতনীসহ এক বৃহৎ পরিবার রেখে গেছেন তিনি।
দুই স্থানে জানাজা
ঢাকায় আজ সোমবার (১৫ ডিসেম্বর) আসর নামাজের পর ধানমন্ডি ৭ নম্বর সড়কের বায়তুল আমান মসজিদে তাঁর প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হবে।
ফেনীতে আগামীকাল মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) যোহর নামাজের পর শিলুয়াস্থ পারিবারিক মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
কাজী ফজলুর রহমানের জীবন ছিল মেধা, নৈতিকতা ও সেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রশাসন, সামাজিক সংস্কার ও সাহিত্যে তাঁর অবদান দেশের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।