বিয়ের মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই বাংলাদেশে নববিবাহিত প্রতি পাঁচজন নারীর মধ্যে চারজন স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ বা কোনও না কোনও ধরনের সহিংসতার মুখে পড়ছেন। এমন উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) এর এক গবেষণায়।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) রাজধানীর আইসিডিডিআরবির সাসাকাওয়া অডিটোরিয়ামে ‘বাংলাদেশের নির্বাচিত গ্রামীণ ও শহরাঞ্চলে নববিবাহিত দম্পতিদের যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য ও অধিকার’ বিষয়ক এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করা হয়।
দুই বছর মেয়াদি এ গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে কানাডার গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের অর্থায়নে। গ্রাম ও শহরের বস্তি এলাকায় নবদম্পতিদের বিয়ের পরবর্তী জীবন ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা এটিই দেশের প্রথম দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বলে জানিয়েছে আইসিডিডিআরবি।
গবেষণায় দেখা যায়, গ্রামীণ এলাকায় ৪৩ শতাংশ এবং শহরের বস্তি এলাকায় ৬৫ শতাংশ নারী ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বিয়ে করছেন। বিয়ের প্রথম বছরের মধ্যেই প্রায় ৭৩ শতাংশ নারী গর্ভধারণ করছেন, যদিও শহরের অনেক নারী অন্তত দুই বছর সন্তান নেওয়া পিছিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। প্রায় অর্ধেক গর্ভধারণ ছিল অনিচ্ছাকৃত বা সময়ের আগেই।
দাম্পত্য সহিংসতার চিত্র আরও ভয়াবহ। বিয়ের প্রথম ছয় মাসেই ৭৯ শতাংশ নারী স্বামীর নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণের কথা জানান। দুই বছরের মধ্যে ৫২ শতাংশ নারী আর্থিক সহিংসতা, ২৩ শতাংশ মানসিক নির্যাতন, ১৫ শতাংশ শারীরিক সহিংসতা এবং ১৪ শতাংশ যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছেন। মাত্র ৪ শতাংশ নারী জানান, তারা কোনও ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হননি।
২০২২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণায় কক্সবাজারের চকরিয়া, চাঁদপুরের মতলব এবং ঢাকার মিরপুর ও কড়াইল বস্তি এলাকার ৬৬৬ নববিবাহিত দম্পতি অংশ নেন। প্রতি চার মাস অন্তর মোট ছয় দফায় তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, বিয়ের পরপরই গ্রামে ৬০ শতাংশ এবং শহরে ৬৬ শতাংশ নারী পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হন। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির আপত্তি, সামাজিক রীতি, বাসস্থান পরিবর্তন এবং আর্থিক সীমাবদ্ধতা এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কর্মজীবনের ক্ষেত্রেও নারীদের ওপর পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলছে।
গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন আইসিডিডিআরবির বিজ্ঞানী ড. ফৌজিয়া আখতার হুদা, সহকারী বিজ্ঞানী তারানা-ই-ফেরদৌস এবং গবেষক সৈয়দ হাসান ইমতিয়াজ। সেমিনারে প্যানেল আলোচনায় বক্তারা বলেন, দেশে বাল্যবিবাহ এখনো বড় সামাজিক সমস্যা, বিশেষ করে গ্রাম ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে। সচেতনতা বাড়াতে সারাদেশে বিভিন্ন কার্যক্রম চললেও কার্যকর সামাজিক পরিবর্তনের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
বক্তারা আরও জানান, বাল্যবিবাহের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে পরিবার ও সমাজকে সচেতন করতে পারলে নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অধিকার সুরক্ষায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।