২৯ জানুয়ারি থেকে ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নেদারল্যান্ডসের রটারডাম শহরে বসবে রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব। উৎসবের ৫৫ আসরের জন্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের চার সিনেমা। এগুলো হলো ‘মাস্টার’, ‘রইদ’ এবং ‘দেলুপি’। উৎসবের দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা বিভাগের একটি ‘বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন’-এ লড়বে ‘নোনাজলের কাব্য’খ্যাত নির্মাতা রেজওয়ান শাহরিয়ার সুমিতের পলিটিক্যাল থ্রিলার ‘মাস্টার’। শৈল্পিক মান এবং বাণিজ্যিক আবেদন উভয়কেই ধারণ করে এমনসব চলচ্চিত্রই ঠাঁই করে নেয় ‘বিগ স্ক্রিন কম্পিটিশন’-এ। এই বিভাগে বিজয়ী চলচ্চিত্র পাবে ৩০ হাজার ইউরো (প্রায় ৩৮ লাখ টাকা) সমমূল্যের পুরস্কার। এটি সুমিতের দ্বিতীয় পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র।
রাজনীতি, সংঘাত ও মানবিকতার গল্প নিয়ে নির্মিত ১২২ মিনিট দৈর্ঘ্যরে এই ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে জহির নামের এক আদর্শবান শিক্ষককে ঘিরে। স্কুল, পরিবার আর নিজের আদর্শ নিয়ে বাঁচতে চাওয়া জহির পরিস্থিতির চাপে একসময় উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার পর তার জীবনে শুরু হয় নানামুখী ঘাত-প্রতিঘাত। জনমানুষের প্রত্যাশা, অন্যায্য আবদার এবং নিজের বিবেকের দ্বন্দ্বে জহির কি তার আদর্শ ধরে রাখতে পারেন, নাকি বদলে যান অন্য এক মানুষে তাই উঠে এসেছে এই সিনেমায়।
ছবিটির প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন নাসির উদ্দিন খান। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে রয়েছেন আজমেরী হক বাঁধন, জাকিয়া বারী মম, ফজলুর রহমান বাবু, শরীফ সিরাজ, তাসনোভা তামান্না, আমিনুর রহমান মুকুল ও মাহমুদ আলম। চিত্রগ্রহণে ছিলেন তুহিন তামিজুল এবং প্রোডাকশন ডিজাইনে ভারতের জোনাকি ভট্টাচার্য।
নির্মাতার পক্ষ থেকে জানানো হয়, ‘মাস্টার’ বড় পর্দার কথা মাথায় রেখেই নির্মিত, তাই এর কারিগরি দিকগুলোয় দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ গুরুত্ব। সিনেমাটির সম্পাদনা করেছেন অস্কার মনোনয়নপ্রাপ্ত ছবির (জুডাস অ্যান্ড দ্য ব্ল্যাক মেসায়া) সম্পাদক এবং একাডেমি মেম্বার ক্রিস্টান স্প্রাগ। সংগীত পরিচালনা করেছেন লস অ্যাঞ্জেলেসে কর্মরত তাইওয়ানিজ কম্পোজার হাও টিং শি, যিনি দেশি ও বিদেশি সুরের সংমিশ্রণে ছবির আবহে ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছেন। জাতীয় চলচ্চিত্র অনুদানপ্রাপ্ত এই ছবিটি প্রযোজনা করেছে ‘মাইপিক্সেলস্টোরি’।
উৎসবের ‘ব্রাইট ফিউচার’ বিভাগে স্থান করে নিয়েছে তাওকীর ইসলামের ‘দেলুপি’। খুলনার মাটির গন্ধ, নদীর গল্প আর মানুষের সংগ্রামকে কেন্দ্র করে নির্মিত সিনেমা পরিচালনা করেছেন মোহাম্মদ তাওকীর ইসলাম।
রটারডামে দেলুপির যাত্রা নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে পরিচালক তাওকীর বলেন, ‘রটারডাম থেকে আমরা যখন প্রথম মেইল পেয়ে জানতে পারি তারা সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার করতে চায়, তখন একটু বিপাকেই পড়ে গিয়েছিলাম। কেননা আমরা সিনেমা বানানোর সময় দেলুটি ইউনিয়নের মানুষদের কথা দিয়েছিলাম যে সিনেমাটা তাদেরই প্রথমে দেখাব। আমাদেরও ইচ্ছা ছিল আগে বাংলাদেশের মানুষদের সিনেমাটা দেখানোর। আমাদের এই ইচ্ছাটা ফেস্টিভ্যালের অর্গানাইজারদের জানিয়েছিলাম। তারাও রাজি হয় এ ব্যাপারে। রটারডামের মতো বিশ্বমানের প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের অংশগ্রহণ দেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য গর্বের বিষয়। বিশ্বের সেরা নির্মাতা, উদীয়মান প্রতিভা ও আর্ট হাউজ সিনেমার প্রতিনিধিত্বকারীরা অংশ নেবেন। এতে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি আনন্দিত।’
খুলনার দেলুটি ইউনিয়নের মানুষ ও তাদের জীবনের বাস্তবতাকে উপজীব্য করে নির্মিত ‘দেলুপি’ গত ৭ নভেম্বর খুলনায় মুক্তি পায়। সিনেমার চিত্রনাট্যে উঠে এসেছে দেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যাত্রাশিল্পীদের সংগ্রাম এবং এ সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
সিনেমায় অভিনয় করেছেন চিরণজিৎ বিশ্বাস, অদিতি রায়, রুদ্র রায়, মো. জাকির হোসেনসহ অনেকে। তারা প্রত্যেকেই খুলনার বিভিন্ন ইউনিয়নের বাসিন্দা। নির্মাতা জানান, দেলুপি নামটি এসেছে খুলনার পাইকগাছা উপজেলার দেলুটি ইউনিয়ন থেকে। সেই অঞ্চলের মানুষের জীবন, বাস্তবতা আর সম্পর্কের গল্প থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তৈরি হয়েছে দেলুপির গল্প, যা শুধু এই অঞ্চলের নয়, বরং একই সঙ্গে দেশের সর্বস্তরের মানুষের জীবনের গল্প।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বেইলি রোডে পার্বত্য চট্টগ্রাম কমপ্লেক্স অডিটোরিয়ামে এক অনুষ্ঠানে পরিচালক মেজবাউর রহমান সুমন জানালেন, তার দ্বিতীয় সিনেমা ‘রইদ’ এবারের রটারডাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে স্থান পেয়েছে। সিনেমাটি নির্বাচিত হয়েছে আসরের মূল প্রতিযোগিতা বিভাগ ‘টাইগার কম্পিটিশন’-এ।
‘রইদ’ প্রযোজনা করেছে ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান বঙ্গ, সহ-প্রযোজক ফেসকার্ড প্রোডাকশন। অনুষ্ঠানে প্রযোজক মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘চলচ্চিত্র শিল্পের সবচেয়ে ক্ষয়িষ্ণু অবস্থায় যে স্বল্পসংখ্যক নির্মাতা আমাদের আশার আলো দেখিয়েছেন, মেজবাউর রহমান সুমন তাদের অন্যতম। রইদের এমন খবরে প্রযোজনা সংস্থা হিসেবে বঙ্গ’ও বেশ আনন্দিত এবং গর্বিত।
ছবিটির বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করেছেন মোস্তাফিজুর নূর ইমরান, নাজিফা তুষি, গাজী রাকায়েত, আহসাবুল ইয়ামিন রিয়াদ প্রমুখ। যৌথভাবে রইদের গল্প লিখেছেন মেজবাউর রহমান সুমন ও সেলিনা বানু মনি। সেটিকে চিত্রনাট্যে রূপ দিয়েছেন মেজবাউর রহমান সুমন, জাহিন ফারুক আমিন, সিদ্দিক আহমেদ এবং সুকর্ণ শাহেদ ধীমান। আগামী বছর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাবে ‘রইদ’।