২০২৪ সালের ৫ আগস্ট, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বড় ধরনের বাঁক পরিবর্তন হয়েছে। প্রায় ১৬ বছর ক্ষমতায় থাকার পর গণআন্দোলনের তোড়ে সেদিন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে আগামী বছর ১২ ফেব্রুয়ারি হওয়ার কথা জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। নির্বাচন সামনে রেখে দেশের রাজনীতিতে চাপা অস্থিরতা বিরাজ করছিল। এরই মধ্যে রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে দুর্বৃত্তরা গুলি করার পর দেশ অশান্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, হঠাৎ কোন উদ্দেশ্যে হাদিকে গুলি করা হলো? কারা রয়েছে এ নৃশংসতার নেপথ্যে? তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৮ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে শুরু করেন প্রচারণা। এমনই এক প্রচারাভিযানের সময় গত ১২ ডিসেম্বর গুলি করা হয় তাকে। কিছুদিন দেশে চিকিৎসার পর, উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। কিন্তু রাজনৈতিক অবস্থা অতিমাত্রায় উত্তপ্ত হলো তখন, যখন সিঙ্গাপুরের হাসপাতাল থেকে গত বৃহস্পতিবার রাতে হাদির মৃত্যু সংবাদ পাওয়া যায়। গতকাল দেশে নিয়ে আসা হয়েছে হাদির মরদেহ। এ ঘটনায় সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন শোক বার্তা দিয়েছে।
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এ নৃশংস হত্যাকা-ের সঙ্গে জড়িত সব অপরাধীকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে এবং তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। আমরা প্রধান উপদেষ্টার এ কথার পূর্ণ বাস্তবায়ন দেখতে চাই। অপরাধীকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা না হলে, আগামীতে এ ধরনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে। যে কারণে এখনই এর রাশ টানতে হবে। হাদির মৃত্যুতে আজ শনিবার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছে সরকার। বৃহস্পতিবার রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রধান উপদেষ্টা জানান, হাদির স্ত্রী-সন্তানের দায়িত্ব সরকার নিয়েছে। হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃহস্পতিবার রাতে বিক্ষোভ হয়েছে, যা গতকালও অব্যাহত ছিল। হাদিকে গুলি করার ধরনে এটা মনে হয়েছে, তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই গুলি করা হয়েছে। তার মৃত্যুর ঘটনায় কিছু প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। মূলত যে প্রশ্নটি বেশি উত্থাপিত হচ্ছে, তা হলো হাদিকে হত্যা করে আদতে কোন শক্তির আপাত লাভ হয়েছে? পাশাপাশি এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে, এরকম ঘটনা নাকি আরও ঘটতে পারে! দেশি-বিদেশি কোন অপশক্তি এর নেপথ্যে রয়েছে, তা খুঁজে বের করা জরুরি।
আজ আমরা যতটুকু কথা বলতে পারছি, তার অবদান চব্বিশের গণআন্দোলনে বিজয়ীদের। তারাই বিগত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। বর্তমানে দেশে একটি নির্বাচনী আবহ তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করে, কোন রাজনৈতিক শক্তি ফায়দা লুটতে চায়, তা চিহ্নিত করা জরুরি। হাদির মতো দেশপ্রেমিক এবং দায়বদ্ধ তরুণ রাজনীতিকের ভীষণ প্রয়োজন। তাদের সংখ্যা যত বাড়বে দেশের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিও তত পরিবর্তিত হবে। বিশেষ করে রাজনীতির প্রতি তারুণ্য শক্তি জাগ্রত হবে। হাদি জীবন দিয়ে সচেতনতার যে ধারা তৈরি করে গেলেন, তাতে নতুন রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির লড়াই থামবে না। বলা যায়, এর বেগ আরও দ্রুত হলো। হাদিকে জাতীয় নির্বাচন বানচাল করার জন্য হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে, এমনটাও বলছে কিছু দল। তবে হাদির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি থেকে যে বার্তা এলো, তা হলো তিনি একটি গণতান্ত্রিক ও সর্বজনীন নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমানে চলমান রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তির পথ খুঁজছিলেন। দেশের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের জন্য সময়মতো নির্বাচন হওয়াই এখন অতি প্রয়োজন। আমরাও এটাই চাই।