একসময়ে আমরা জানতাম প্লুটো একটা গ্রহের নাম এবং সৌরজগতে ৯টি গ্রহ। এরপর বিজ্ঞানীরা জানালেন প্লুটো আদতে গ্রহ নয় এবং এই পুরো বিষয়টি নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব
মানুষের প্রথম কৌতূহল
আদিকাল থেকেই রাতের আকাশের ওই অসীম নীলিমা মানুষের কল্পনাকে জয় করেছে। যখন বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়নি, তখনো মানুষ আকাশের ওই মিটিমিটি জ¦লতে থাকা আলোকবিন্দুর দিকে তাকিয়ে নিজের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজত। সেই বিশাল ছাদের নিচে অধিকাংশ আলোই ছিল স্থির, কিন্তু মানুষের তীক্ষè দৃষ্টি লক্ষ করেছিল যে, কিছু আলো যেন নিয়ম ভেঙে ঘুরে বেড়ায়। প্রাচীন গ্রিকরা এই বিশেষ চলনশীল আলোগুলোর নাম দিয়েছিল ‘প্লানেটেস’, যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ‘ভবঘুরে’। এই নাম থেকেই পরবর্তীকালে আমাদের আজকের ‘গ্রহ’ শব্দের উৎপত্তি। মানুষ তখন ভাবত ওই আলোগুলো হয়তো কোনো অলৌকিক শক্তি, কিন্তু আসলে সেগুলো ছিল আমাদেরই প্রতিবেশী জগৎ। প্রযুক্তির বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সৌরজগৎকে দেখার আমাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলে গেছে। এককালের ভবঘুরে আলোগুলো এখন আমাদের কাছে বিশাল পাথুরে জগৎ বা গ্যাসের গোলক হিসেবে পরিচিত। আর এই আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত এবং আবেগঘনিষ্ঠ চরিত্রটির নাম হলো প্লুটো। প্লুটোর গল্প আসলে মানুষের জ্ঞান অন্বেষণের এক দীর্ঘ পরিক্রমা, যা আমাদের শেখায় যে, মহাবিশ^ স্থির কোনো বিষয় নয়, বরং নিরন্তর পরিবর্তনের এক ক্ষেত্র।
ধূলিকণা থেকে সূর্যের পরিবার
সৌরজগতের জন্মের ইতিহাস আজ থেকে প্রায় ৪৬০ কোটি বছর আগের। মহাকাশের এক বিশাল অঞ্চলে হাইড্রোজেন ও হিলিয়াম গ্যাসের মেঘ এবং মহাজাগতিক ধূলিকণা যখন নিজেদের মাধ্যাকর্ষণের চাপে সংকুচিত হতে শুরু করে, তখন জন্ম নেয় আমাদের সূর্য। সূর্যের চারপাশের অবশিষ্ট ধুলো ও পাথরগুলো কেন্দ্রাতিক বলের প্রভাবে ঘুরতে থাকে। লাখ লাখ বছরের সংঘর্ষ, মিলন আর মাধ্যাকর্ষণের টানাপড়েনে এই ধূলিকণাগুলো ছোট ছোট পাথুরে খণ্ড থেকে ক্রমে বড় হতে থাকে। সূর্যের কাছাকাছি প্রচণ্ড তাপে হালকা গ্যাসগুলো দূরে সরে যায়, আর সেখানে গড়ে ওঠে পাথুরে গ্রহগুলো। বুধ, শুক্র,
পৃথিবী আর মঙ্গল আমাদের এই ঘরের পাশের প্রতিবেশীগুলো এভাবেই নিজেদের আকৃতি পায়। অন্যদিকে সূর্যের প্রবল তাপের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরের দিকে সৃষ্টি হয় বিশালকার দানবগুলো। বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস আর নেপচুন সেখানে রাজত্ব করতে শুরু করে। কিন্তু এই সীমানাই সৌরজগতের শেষ ছিল না। নেপচুনের ওপারেও যে একটি অন্ধকার ও হিমশীতল জগৎ অপেক্ষা করছিল, তা মানুষের জানতে আরও বহুকাল সময় লেগেছে। সৌরজগতের এই বিন্যাস ছিল মূলত গতিবিদ্যার এক মহাকাব্যিক সমীকরণ।
প্লুটোর জন্ম
বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে বিজ্ঞানীরা খেয়াল করলেন যে নেপচুনের কক্ষপথে কিছু একটা বিচ্যুতি ঘটছে। তাদের ধারণা হলো, নেপচুনের বাইরে হয়তো আরও বড় কোনো গ্রহ আছে, যার মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এই বিচ্যুতি ঘটাচ্ছে। এই রহস্যময় বস্তুর নাম দেওয়া হয়েছিল ‘প্ল্যানেট এক্স’ বা দশম গ্রহের সন্ধান। ১৯৩০ সালে মার্কিন জ্যোতির্বিদ ক্লাইড টমবফ যখন অ্যারিজোনার অবজারভেটরিতে কাজ করছিলেন, তখন তিনি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের ছবিতে একটি নগণ্য কিন্তু নির্দিষ্ট আলোকবিন্দুকে নড়াচড়া করতে দেখলেন। আর এভাবেই আবিষ্কৃত হলো প্লুটো। রোমানদের পাতালপুরীর দেবতা প্লুটোর নামে এর নামকরণ করা হলো, কারণ এটি সূর্যের কাছ থেকে সবচেয়ে দূরে এবং অন্ধকার এক অঞ্চলে অবস্থিত। আবিষ্কারের পর দীর্ঘ ৭৬ বছর ধরে প্লুটো ছিল আমাদের সৌরজগতের নবম গ্রহ। ছোটদের পাঠ্যবই থেকে শুরু করে মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রতিটি নথিতে প্লুটোর নাম ছিল অবিচ্ছেদ্য। আমরা সবাই শিখেছিলাম যে, আমাদের পরিবারে ৯টি গ্রহ আছে। কিন্তু বিজ্ঞানের ধর্মই হলো প্রতিনিয়ত নিজেকে যাচাই করা এবং পুরনো সত্যকে নতুন তথ্যের আলোকে বিচার করা।
কাইপার বেল্ট একটি নতুন দিগন্ত
নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে প্রযুক্তির প্রভূত উন্নতি ঘটলে বিজ্ঞানীরা নেপচুনের ওপারে মহাকাশের এক নতুন অঞ্চল আবিষ্কার করেন। এই অঞ্চলের নাম দেওয়া হলো কাইপার বেল্ট। এটি মূলত বরফাচ্ছাদিত অসংখ্য পাথুরে বস্তু এবং ক্ষুদ্রাকার জগতের এক বিশাল বলয়। বিজ্ঞানীরা যখন কাইপার বেল্ট নিয়ে গবেষণা শুরু করলেন, তখন তারা অবাক হয়ে দেখলেন যে প্লুটো ওই অঞ্চলের একমাত্র বাসিন্দা নয়। সেখানে প্লুটোর মতো আকার ও বৈশিষ্ট্যের আরও হাজার হাজার বস্তু ঘুরে বেড়াচ্ছে। ২০০৩ সালের দিকে ‘এরিস’ নামক একটি বস্তু আবিষ্কৃত হওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয়। কারণ এরিস ছিল ভরের দিক থেকে প্লুটোর প্রায় কাছাকাছি এবং কোনো কোনো পরিমাপে বড়। জ্যোতির্বিদদের সামনে তখন এক বড় প্রশ্ন দেখা দিল। যদি প্লুটোকে গ্রহ বলা হয়, তবে এরিসকেও গ্রহ বলতে হবে। শুধু তাই নয়, কাইপার বেল্টে থাকা আরও অনেক বস্তুই হয়তো ভবিষ্যতে গ্রহের মর্যাদা দাবি করবে। এতে আমাদের সৌরজগতের গ্রহের তালিকা অকারণে দীর্ঘ হতে থাকবে। এই সংকট কাটাতে বিজ্ঞানীদের বসতে হলো এক জরুরি সভায়।
গ্রহের মর্যাদা
২০০৬ সালে চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগে বসেছিল আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিদ ইউনিয়নের এক ঐতিহাসিক সম্মেলন। সেখানে গ্রহের একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করার প্রস্তাব তোলা হলো। অনেক তর্ক-বিতর্ক ও আলোচনার পর বিজ্ঞানীরা তিনটি নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করলেন। প্রথমত, বস্তুটিকে অবশ্যই সূর্যের চারদিকে আবর্তন করতে হবে। দ্বিতীয়ত, এর নিজস্ব মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত বেশি হতে হবে, যাতে এটি প্রায় গোলাকার আকৃতি ধারণ করে। তৃতীয়ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তটি হলো, বস্তুটিকে তার কক্ষপথের চারপাশের এলাকা পরিষ্কার রাখতে হবে অর্থাৎ তার কক্ষপথে অন্য কোনো বড় মহাজাগতিক বস্তু থাকতে পারবে না। প্লুটো প্রথম দুটি শর্ত সফলভাবে পূরণ করলেও তৃতীয় শর্তটিতে আটকে যায়। কারণ প্লুটো তার কক্ষপথে কাইপার বেল্টের অসংখ্য ছোট-বড় বরফের খণ্ডের সঙ্গেই বিচরণ করে। এটি তার প্রতিবেশী এলাকাকে নিজের মাধ্যাকর্ষণ দিয়ে দখল বা পরিষ্কার করতে পারেনি। এই একটি কারণই প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে সরিয়ে দেয়। বিজ্ঞানীরা প্লুটোকে নাম দিলেন ‘বামন গ্রহ’। এক ঘোষণার মাধ্যমে কয়েক প্রজন্মের চেনা নবম গ্রহটি চিরতরে হারিয়ে গেল।
আবেগ বনাম যুক্তি
প্লুটোকে গ্রহের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি মোটেও সহজ ছিল না। সাধারণ মানুষের মধ্যে তো বটেই, এমনকি অনেক বিজ্ঞানীর মধ্যেও এ নিয়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হয়েছিল। অনেকের শৈশবের স্মৃতি আর আবেগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গ্রহটির এই পদাবনতি মেনে নেওয়া কঠিন ছিল। এমনকি তৎকালীন সময়ে অনেক স্কুল ও লাইব্রেরিতে প্রতিবাদের ঢেউ উঠেছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের কাছে আবেগের চেয়ে যুক্তির স্থান অনেক ওপরে। জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা যুক্তি দিলেন যে, সৌরজগৎকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে আমাদের শ্রেণিবিন্যাস হতে হবে নির্ভুল। যদি প্লুটোকে গ্রহ হিসেবে রাখা হতো, তবে তা বিজ্ঞানের সংজ্ঞায় এক বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি করত। বামন গ্রহ হিসেবে চিহ্নিত করার অর্থ এই নয় যে, প্লুটোর গুরুত্ব কমে গেছে বরং একে সঠিকভাবে চেনার মাধ্যমে আমাদের মহাকাশ গবেষণার এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো। প্লুটো এখন আর একা নয়, সে এখন এক বিশাল পরিবারের প্রতিনিধি যারা নেপচুনের বাইরে সূর্যের শীতল প্রান্তরে রাজত্ব করছে।
প্লুটোর অদেখা রূপ
প্লুটো গ্রহের মর্যাদা হারানোর পর অনেকেই ভেবেছিলেন এই ক্ষুদ্র জগতের প্রতি মানুষের আগ্রহ হয়তো কমে যাবে। কিন্তু ২০১৫ সালে নাসার ‘নিউ হরাইজনস’ মহাকাশযান যখন প্লুটোর বুক চিরে উড়ে গেল, তখন পুরো বিশ^ বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। পৃথিবী থেকে কয়েকশ কোটি কিলোমিটার দূরে থাকা এই শীতল জগতে আমরা যা দেখলাম, তা আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। সেখানে দেখা গেল বিশাল নাইট্রোজেন হিমবাহ, উঁচু উঁচু বরফের পাহাড় এবং একটি চমৎকার হৃৎপিণ্ডের আকৃতির অঞ্চল। প্লুটোর পাতলা বায়ুমণ্ডল এবং ভূ-তাত্ত্বিক সক্রিয়তা দেখে বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারলেন যে, এই বামন গ্রহটি আদতে মোটেও মৃত বা স্থবির কোনো জগৎ নয়। সেখানে হয়তো এখনো টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়া ঘটে বা জমাটবাঁধা বরফের নিচে কোনো মহাসাগর লুকিয়ে আছে। নিউ হরাইজনস আমাদের শিখিয়ে দিল যে মহাকাশের কোনো বস্তু ছোট বলেই তা তুচ্ছ নয়। প্লুটো হয়তো গ্রহ নয়, কিন্তু এর সৌন্দর্য আর রহস্য কোনো বড় গ্রহের চেয়ে কম নয়।
সৌরজগতের গতিশীলতা
আমাদের সৌরজগৎ আসলে একটি জীবন্ত এবং প্রতিনিয়ত পরিবর্তনশীল ইতিহাস। শত শত কোটি বছর ধরে এখানে গ্রহগুলোর স্থান পরিবর্তন হয়েছে, ধ্বংস হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক অনেক বস্তু, আবার জন্ম নিয়েছে নতুন সব উপগ্রহ। পৃথিবী যে আজ জলবেষ্টিত এক সজীব জগৎ, তার পেছনেও রয়েছে কাইপার বেল্ট বা তারও বাইরের ধূমকেতুদের অবদান। প্রাণের যে উপাদানগুলো আমাদের মধ্যে বিদ্যমান, তার অনেকটাই হয়তো এসেছে ওই দূরবর্তী হিমশীতল অঞ্চল থেকে। প্লুটোর গল্পটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের জ্ঞান আসলে কখনোই চূড়ান্ত নয়। আজ যা ধ্রুব সত্য বলে মনে হচ্ছে, কাল নতুন কোনো টেলিস্কোপের লেন্সে তা হয়তো ভুল প্রমাণিত হতে পারে। এই সংশোধন করার সাহসই হলো বিজ্ঞানের মূল চালিকাশক্তি। আমরা যত বেশি আমাদের চারপাশের অন্ধকার খুঁড়ব, তত বেশি নিজেদের সম্পর্কে এবং আমাদের এই ক্ষুদ্র নীল গ্রহের স্থান সম্পর্কে জানতে পারব।
প্লুটোর গ্রহ থেকে বামন গ্রহে রূপান্তর হওয়া কোনো পরাজয় নয়, বরং এটি মানুষের পরিপক্বতার নিদর্শন। আমরা এখন জানি যে আমাদের চারপাশের সীমানা শুধু আটটি গ্রহে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের সীমানা ছড়িয়ে আছে ওর্ট ক্লাউড পর্যন্ত, যা সূর্যের মাধ্যাকর্ষণের একদম শেষ বিন্দু। ভবিষ্যতে হয়তো আমরা আরও হাজার হাজার বামন গ্রহের সন্ধান পাব, যারা আমাদের আদি সৌরজগতের রহস্য উন্মোচন করবে। প্লুটো এখন কেবল একটি নাম নয়, এটি মানুষের কৌতূহলের এক অমর প্রতীক। আকাশের দিকে তাকালে আমরা যখন ওই দূরবর্তী ছায়াপথ দেখি, তখন আমরা আসলে সময়ের উল্টো দিকে তাকাচ্ছি। প্লুটোর ইতিহাস আমাদের শেখায় বিনয়। এটি আমাদের জানায় যে অসীম এই মহাবিশ্বে আমরা এক নগণ্য অভিযাত্রী মাত্র। তবু মানুষের এই ছোট ছোট পদক্ষেপগুলোই একদিন আমাদের ছায়াপথের অন্য কোনো প্রান্তে নিয়ে যাবে।
আকাশের দিকে তাকালে আজ আর আমরা কেবল স্থির আলোকবিন্দু দেখি না, আমরা দেখি লাখ-কোটি বছরের ইতিহাস, যা আমাদের প্রত্যেকের অস্তিত্বের সঙ্গে মিশে আছে।