বই পুড়লে ইতিহাসও পুড়ে যায়

যখনই কোনো সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ে, যখনই যুক্তিকে পেশিশক্তি দিয়ে দমানোর চেষ্টা করা হয়, তখনই বইয়ের ওপর আঘাত আসে। বই পোড়ানোর ইতিহাস নিয়ে লিখেছেন অনিন্দ্য নাহার হাবীব

আগুনের দ্বিমুখী শক্তি

মানুষ যখন প্রথম পাথর ঘষে আগুন জ্বালাতে শিখল, তখন সে কেবল গুহার অন্ধকার দূর করার আলো বা শীত তাড়ানোর উষ্ণতা খুঁজে পায়নি সে খুঁজে পেয়েছিল এক অসীম শক্তি। এই আগুনই মানুষকে খাদ্য রান্না করতে শিখিয়েছে, ধাতব অস্ত্র গড়তে শিখিয়েছে। কিন্তু সভ্যতার বিবর্তনের সমান্তরালে এই আগুনই আবার হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় অভিশাপ। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, যখনই কোনো সভ্যতা অন্য কোনো সভ্যতাকে পদানত করতে চেয়েছে, তারা প্রথমেই আঘাত হেনেছে সেই জাতির মগজে, অর্থাৎ তাদের জ্ঞানভাণ্ডারে। একটি লাইব্রেরি বা গ্রন্থাগার কেবল ইট-পাথরের দালান কিংবা কাগজ-কালির

স্তূপ নয়। এটি একটি প্রজন্মের চিন্তা, প্রশ্ন, স্বপ্ন এবং অর্জিত অভিজ্ঞতার আধার। একটি বই যখন পুড়ে ছাই হয়, তখন সেই ছাইয়ের সঙ্গে মিশে যায় একজন লেখকের হাজার বছরের শ্রম আর একটি সমাজের হাজার বছরের স্মৃতি। যখন বই পুড়ে যায়, তখন প্রকৃতপক্ষে ইতিহাসই পুড়ে যায়।

আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি

প্রাচীন বিশ্বের জ্ঞানের বাতিঘর বলতে যদি কিছু বোঝায়, তবে তা ছিল মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ার রয়্যাল লাইব্রেরি। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতকে টলেমি রাজবংশের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বলা হয়, এখানে প্রায় সাত লাখ প্যাপিরাস স্ক্রোল বা পা-ুলিপি ছিল। কিন্তু এই লাইব্রেরির ধ্বংস নিয়ে যে মিথ প্রচলিত আছে, বাস্তবতা তার চেয়েও করুণ।

জনপ্রিয় ধারণা হলো, কোনো এক নিষ্ঠুর শাসক এক রাতে সব পুড়িয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসবিদরা বলছেন, আলেকজান্দ্রিয়ার পতন ছিল ধীর এবং রাজনৈতিক অবহেলার ফল। খ্রিস্টপূর্ব ৪৮ সালে জুলিয়াস সিজার যখন আলেকজান্দ্রিয়া অবরোধ করেন, তখন বন্দরে লাগানো আগুন দুর্ঘটনাবশত লাইব্রেরির কিছু অংশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বড় আঘাত আসে পরবর্তী শতকগুলোতে। খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকে যখন রোমান সাম্রাজ্যে খ্রিস্টধর্ম রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তার করে, তখন ‘প্যাগান’ বা অ-খ্রিস্টীয় জ্ঞানকে শত্রু হিসেবে গণ্য করা শুরু হয়। ৩৯১ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াসের নির্দেশে সেরাপিয়াম ধ্বংস করা হয়, যা ছিল লাইব্রেরিরই একটি শাখা।

পরবর্তী সময়ে খলিফা ওমরের ওপর যে অভিযোগ চাপানো হয়, আধুনিক ইতিহাসবিদরা তাকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা হিসেবেই দেখেন। আসলে আলেকজান্দ্রিয়ার মৃত্যু হয়েছিল পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের সমন্বয়ে। একটি জ্ঞানকেন্দ্র যখন তার রাজনৈতিক গুরুত্ব হারায়, তখন তা কত দ্রুত ধুলোয় মিশে যায়, আলেকজান্দ্রিয়া তার চিরন্তন উদাহরণ।

নালন্দা মহাবিহার

প্রাচীন ভারতের নালন্দা কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না, এটি ছিল বিশ্বতত্ত্বের এক বিশাল আধার। বর্তমান বিহার রাজ্যে অবস্থিত এই বৌদ্ধ মহাবিহারে ১০,০০০ শিক্ষার্থী এবং ২,০০০ শিক্ষক ছিলেন। এখানে দর্শন, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং জ্যোতির্বিজ্ঞানের যে বিশাল সংগ্রহ ছিল, তা তিব্বত থেকে শুরু করে ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

১১৯৩ সালে বখতিয়ার খিলজির নেতৃত্বে তুর্কি বাহিনী যখন নালন্দা আক্রমণ করে, তখন তাদের মূল লক্ষ্য ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক আধিপত্য চূর্ণ করা। পারস্য ইতিহাসবিদ মিনহাজ-ই-সিরাজ তার ‘তবাকাত-ই-নাসিরি’ গ্রন্থে লিখেছেন, নালন্দার বিশাল লাইব্রেরি ‘ধর্মগঞ্জ’ যখন জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, তখন সেই আগুন জ্বলছিল টানা তিন মাস। কয়েক লাখ পা-ুলিপি ছাই হয়ে গিয়েছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নির্বিচারে হত্যা করা হয়। এই অগ্নিকাণ্ড কেবল বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষতি করেনি, এটি ভারতীয় উপমহাদেশের মৌলিক বৈজ্ঞানিক ও দার্শনিক চিন্তার ধারায় ছেদ ঘটিয়েছিল। নালন্দার ছাই থেকে দক্ষিণ এশিয়ার জ্ঞানতত্ত্ব আর কখনোই আগের মতো জেগে উঠতে পারেনি।

কনস্টান্টিনোপল

বই পোড়ানোর ইতিহাস কেবল ভিন্ন ধর্মের বা ভিন্ন জাতির ওপর আক্রমণের গল্প নয়; এটি কখনো কখনো অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াইয়েরও বহিঃপ্রকাশ। বাইজান্টাইন সাম্রাজ্যের কেন্দ্র কনস্টান্টিনোপল ছিল প্রাচীন গ্রিক ও রোমান সাহিত্যের শেষ রক্ষাকবচ। হোমার, সোফোক্লিস বা অ্যারিস্টটলের অনেক দুর্লভ লেখা এখানেই সংরক্ষিত ছিল।

১২০৪ সালে চতুর্থ ক্রুসেডের সময় এক অদ্ভুত ট্র্যাজেডি ঘটে। ইউরোপীয় খ্রিস্টান নাইটরা পবিত্র ভূমি উদ্ধারের নামে যাত্রা করলেও তারা আক্রমণ করে বসে নিজেদেরই আরেক খ্রিস্টান শহর কনস্টান্টিনোপলকে। তথাকথিত এই ‘ধর্মযোদ্ধারা’ ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি লুট করে। অমূল্য চামড়ার পা-ুলিপিগুলো তারা পুড়িয়ে ফেলে বা বিক্রি করে দেয়। অনেক পণ্ডিত সেই সময় পালিয়ে ইতালিতে না গেলে হয়তো রেনেসাঁ বা নবজাগরণের পথ আরও কঠিন হতো। ক্ষমতার লোভে মানুষ যখন অন্ধ হয়, তখন সে তার নিজের শেকড় পুড়তেও দ্বিধা করে না।

 বাগদাদের হাউজ অব উইজডম : ১২৫৮ সালে হালাকু খানের নেতৃত্বে মোঙ্গল বাহিনী যখন বাগদাদ আক্রমণ করে, তখন তারা ধ্বংস করে দেয় ‘বায়তুল হিকমাহ’ বা হাউজ অব উইজডম। বলা হয়, মোঙ্গলরা এত বেশি বই দজলা নদীতে ফেলে দিয়েছিল যে, বইয়ের কালিতে নদীর পানি কালো হয়ে গিয়েছিল। আবার মানুষের রক্তে সেই পানি হয়েছিল লাল। মধ্যযুগের ইসলামি স্বর্ণযুগের অবসান ঘটেছিল সেই আগুনের লেলিহান শিখায়। দর্শন, বিজ্ঞান এবং অনুবাদের যে বিশাল ধারা বাগদাদকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল, তা এক ঝটকায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

হানলিন লাইব্রেরি : চীনের হানলিন লাইব্রেরি ছিল কনফুসিয়ান দর্শনের প্রাণকেন্দ্র। ১৯০০ সালে বক্সার বিদ্রোহের সময় বেইজিংয়ে যখন যুদ্ধ শুরু হয়, তখন ব্রিটিশ ও অন্যান্য বিদেশি বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে এই লাইব্রেরিটি ভস্মীভূত হয়। চীনের হাজার বছরের পুরনো ‘ইয়ংল এনসাইক্লোপিডিয়া’র অধিকাংশ খণ্ড সেই আগুনে হারিয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে, আধুনিক যুগেও সামরিক কৌশলের কাছে জ্ঞান কতটা অসহায়।

জাফনা লাইব্রেরি : ১৯৮১ সালে শ্রীলঙ্কার জাফনা পাবলিক লাইব্রেরি পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাটি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম জঘন্য সাংস্কৃতিক অপরাধ। এই লাইব্রেরিতে তামিল সাহিত্যের বিরল পা-ুলিপি ও ঐতিহাসিক দলিল ছিল। শ্রীলঙ্কার পুলিশ ও সরকারি মদদপুষ্ট গুন্ডাবাহিনী যখন এটি জ্বালিয়ে দেয়, তখন প্রায় ৯৫,০০০ বই নষ্ট হয়। এটি কোনো সাধারণ অগ্নিকাণ্ড ছিল না; এটি ছিল তামিল জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার একটি রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন, জাফনা লাইব্রেরির সেই আগুনই শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলেছিল। যখন মানুষের স্মৃতি পুড়িয়ে দেওয়া হয়, তখন সে তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।

কেন বারবার বই পোড়ে

ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, লাইব্রেরি পোড়ানোর পেছনে তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা : যখন কোনো পক্ষ মনে করে তাদের ধর্মীয় গ্রন্থের বাইরে আর কোনো জ্ঞানের প্রয়োজন নেই, তখনই অন্য সব বইকে ‘বিপজ্জনক’ মনে করা হয়।

রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ : ইতিহাসকে বিকৃত করতে হলে বা নতুন কোনো মতাদর্শ চাপিয়ে দিতে হলে পুরনো ইতিহাস মুছে ফেলা জরুরি। তাই স্বৈরাচারী শাসকরা প্রথমেই আর্কাইভ ও লাইব্রেরি লক্ষ্য করে।

সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্ব: কোনো জাতিকে মানসিকভাবে পঙ্গু করতে হলে তাদের ঐতিহ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকার ধ্বংস করতে হয়। লাইব্রেরি পোড়ানো হলো সেই মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের চূড়ান্ত রূপ।

জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনে ১৮২০-এর দশকে একটি ভবিষদ্বাণী করেছিলেন ‘যেখানে বই পোড়ানো হয়, সেখানে শেষ পর্যন্ত মানুষও পোড়ানো হয়।’ নাৎসি জার্মানিতে যখন ইহুদি লেখকদের বই পোড়ানো শুরু হলো, তার কয়েক বছর পরেই শুরু হয়েছিল কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের গ্যাস চেম্বারে মানুষ পোড়ানো। হাইনের কথাটি ইতিহাসের এক নিষ্ঠুর ধ্রুব সত্য।

ডিজিটাল যুগ

আজকের পৃথিবীতে আমরা বড় বড় লাইব্রেরি ভবনের ওপর হামলার চেয়েও সূক্ষ্ম এক বিপদের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা ভাবছি ডিজিটাল আর্কাইভে সব সুরক্ষিত। কিন্তু আজকের দিনে ‘বই পোড়ানো’র ধরন বদলেছে।

সার্ভার বন্ধ করা : কোনো দেশের সরকার যদি মনে করে কোনো তথ্য তাদের বিরুদ্ধে যাচ্ছে, তারা এক ক্লিকেই পুরো ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল আর্কাইভ ব্লক করে দিচ্ছে।

অ্যালগরিদম সেন্সরশিপ : সোশ্যাল মিডিয়া বা সার্চ ইঞ্জিনের অ্যালগরিদম ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু বই বা গবেষণাকে আড়াল করা হচ্ছে।

তথ্যের বিকৃতি : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর মাধ্যমে পুরনো টেক্সট বদলে দেওয়া বা ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া ডিজিটাল যুগের ‘আগুন’।

অতীতের আগুন দেখা যেত, কিন্তু বর্তমানের এই ‘ডিজিটাল ফায়ার’ অনেক সময় চোখেই পড়ে না। অথচ এর ধ্বংস ক্ষমতা কোনো অংশে কম নয়।

স্মৃতিই আমাদের অস্তিত্ব

একটি সমাজ যখন তার অতীত হারিয়ে ফেলে, তখন সে তার ভবিষ্যৎ গড়ার দিকনির্দেশনাও হারিয়ে ফেলে। আলেকজান্দ্রিয়া থেকে জাফনা প্রতিটি আগুনের শিখা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সভ্যতার সুরক্ষা কেবল সীমানা রক্ষা বা অস্ত্র মজুদ করায় নয়, বরং জ্ঞানকে রক্ষা করার মধ্যে নিহিত। বই রক্ষা করা মানে কেবল কাগজ বাঁচানো নয়, বরং মানুষের চিন্তা করার স্বাধীনতা এবং আগামী প্রজন্মের অধিকার রক্ষা করা। আগুনের বিপরীতে আমাদের একমাত্র ঢাল হলো ‘স্মৃতি’। পৃথিবী যতবার বই পুড়িয়ে ইতিহাস মুছে দিতে চাইবে, আমাদের ততবারই সেই ছাই থেকে শব্দ উদ্ধার করে নতুন করে লিখতে হবে। কারণ যে সমাজ বই পড়তে ভয় পায়, সেই সমাজ আসলে নিজেকেই ভয় পায়।

ইতিহাস আমাদের বারবার সতর্ক করে বই পোড়ানো কেবল অতীতের কোনো বর্বরতা নয়, এটি একটি মানসিকতা। যখনই কোনো সমাজে অসহিষ্ণুতা বাড়ে, যখনই যুক্তিকে পেশিশক্তি দিয়ে দমানোর চেষ্টা করা হয়, তখনই বইয়ের ওপর আঘাত আসে। আজ হয়তো রাজপথে বইয়ের স্তূপে আগুন দেওয়া হচ্ছে না, কিন্তু ‘নিষিদ্ধ করা’ বা ‘সেন্সরশিপ’-এর মাধ্যমে সেই আগুনেরই আধুনিক রূপ আমরা দেখছি।