প্রশাসনে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে 

রাষ্ট্রচক্র ঘুরবে মানুষের অধিকার, কল্যাণ, নিরাপত্তা, উন্নয়ন এবং মর্যাদা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র অর্থাৎ প্রশাসন যখন নষ্ট হতে শুরু করে, তখন রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়ে। জনগণের আস্থা নষ্ট হয় প্রবলভাবে। ‘আস্থা’ শব্দটি ছোট হলেও এর ভাঙন যে কত ভয়াবহ, তা টের পাওয়া যায় তখন যখন মানুষ মনে করে, এ রাষ্ট্র আমার নয়। এই প্রশাসন আমার পাশে নেই। এমন হতাশা থেকে জন্ম নেয় ক্ষোভ, ঘৃণা, বিরক্তি এবং রাষ্ট্রবিমুখতা। ইতিহাস বলে রাষ্ট্র তখনই বিপদে পড়ে, যখন জনগণ প্রশাসনের দিকে তাকায় সন্দেহ, ঘৃণা কিংবা অবহেলার চোখে। আজ বাংলাদেশ সেই দুঃসময়ের এক কঠিন মোড়ে দাঁড়িয়ে। দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবাজি, টেন্ডার কারসাজি, নিয়োগ বাণিজ্য, সরকারি প্রকল্পে টাকা লুট, প্রভাব খাটিয়ে আইনের অপব্যবহার এসব যেন প্রশাসনের নতুন পরিচয়। অথচ প্রশাসনের হওয়ার কথা ছিল, জনগণের সেবক। তারা অধিকাংশই সেবক নয়, বরং আচরণে প্রকাশ পায় শাসকের ভাব। এই অবস্থার কারণে নাগরিকরা ক্ষুব্ধ, হতাশ, ক্লান্ত। টিআইবির জরিপ বলছে, সরকারি সেবা পেতে দেশের প্রায় ৬৭ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ঘুষ দিতে বাধ্য হন। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয় এটি মানুষের রক্তক্ষরণ, বঞ্চনা। প্রায় সব ক্ষেত্রে ঘুষ এক অঘোষিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। নাগরিকরা মেনে নিয়েছে, ‘ঘুষ না দিলে কাজ হয় না।’ আমাদের প্রশাসনিক সিলেবাসে যেন যুক্ত হয়ে গেছে দুর্নীতির পাঠ।

যখন অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা ঘুষকে ‘অফিশিয়াল ফি’ হিসেবে চালু করেন, তখন নাগরিকদের চোখে সততার মূল্য পড়ে যায়। তরুণদের মধ্যে সততা দুর্বলতার প্রতীক হয়ে ওঠে। সমাজ তখন মেধা ও পরিশ্রম নয়, চাতুর্য ও দুর্নীতিকে পুরস্কার দেয়। ফলে একটি প্রজন্ম শিখে যায় ঘুষ ছাড়া উন্নতি নেই, সুপারিশ ছাড়া চাকরি নেই, ক্ষমতার ছায়া ছাড়া নিরাপত্তা নেই। এ ধরনের সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করে ভেতর থেকে। সবচেয়ে বড় ভয়, এই সংস্কৃতি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তার লাভ করে। মূলত উন্নয়ন কাগজে থাকে, মাঠে থাকে দুর্নীতির ফাঁদ। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশ যদি প্রশাসনিক দুর্নীতি অর্ধেকে নামাতে পারে, তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমপক্ষে ২ শতাংশ বাড়তে পারে। অর্থাৎ দুর্নীতি শুধু নৈতিক সমস্যা নয়, এটি উন্নয়নহীনতার সবচেয়ে বড় বাধা। যখন মানুষ দেখে, অভিযোগ দিলে কোনো ব্যবস্থা হয় না, ঘুষ না দিলে ন্যায্য কাজ হয় না, অন্যায়ের বিচার নেই, অসৎ কর্মকর্তারা বছরের পর বছর পদোন্নতি পাচ্ছেন তখন তাদের মনে ক্ষত তৈরি হয়। এই অবস্থায় কর দেওয়ার আগ্রহ কমে, আইন মানার ইচ্ছা কমে এবং রাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধতা কমে যায়। জনগণের বিশ্বাস হারানোই, প্রশাসনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। তখনই রাষ্ট্রের ভিত্তি ভেঙে পড়ে। শাস্তির অনুপস্থিতিই দুর্নীতির খাদ্য। প্রশাসনের বড় সমস্যা হলো, জবাবদিহির অভাব। বছরের পর বছর একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, কিন্তু তারা টিকে থাকেন ক্ষমতার ছত্রছায়ায়। সরকারি দপ্তরগুলোতে চবৎভড়ৎসধহপব অঁফরঃ বাধ্যতামূলক নয়; সম্পদের বিবরণ অনেক সময়ই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ; দুর্নীতি দমন কমিশন প্রায়শই শক্তিহীন; আর রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তারা শক্তিশালী হয়ে ওঠেন। ফলে জনগণ ভাবতে বাধ্য হয়, এদেশে দুর্নীতির বিচার হয় না। সত্য যে, সমাধানহীন কোনো সমস্যা নেই।

প্রযুক্তিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হতে পারে। ই-গভর্নেন্স, অনলাইন আবেদন, ডিজিটাল পেমেন্ট, ই- টেন্ডারিং এসব ব্যবস্থা কর্মকর্তা-নাগরিকের সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে দুর্নীতির পথ রুদ্ধ করতে পারে। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সেবা দেওয়ার আইন থাকলে ঘুষের সুযোগ কমে। অনলাইন অভিযোগ প্ল্যাটফর্ম থাকলে, নাগরিকরা দায়বদ্ধতার চর্চা করতে পারে। প্রযুক্তি শুধু সেবা সহজ করে না, এটি এক অদৃশ্য নজরদারি তৈরি করে, যা দুর্নীতিকে কঠিন করে তোলে। গণমাধ্যম দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা অনেক সময় নিজের জীবন বিপন্ন করে দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। কিন্তু সাংবাদিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কথা বলবেন কীভাবে? প্রশাসনে জনগণের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। উপজেলা বা পৌরসভায় অংশগ্রহণমূলক বাজেট সভা হতে পারে, ঈরঃরুবহ ঈযধৎঃবৎ বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে তাদের কর কোথায় ব্যবহার হচ্ছে। এটি স্বচ্ছতা তৈরি করে এবং জনগণের আস্থা বাড়ায়। অবশ্যই মনে রাখতে হবে, জবাবদিহি মানে ভয় সৃষ্টি করা নয়। বরং এটি দায়িত্ববোধ  তৈরি করে। এমন প্রশাসন চাই, যেখানে সৎ কর্মকর্তা নিশ্চিন্তে কাজ করতে পারেন, যেখানে ন্যায়পরায়ণতা পুরস্কৃত হয়। একই সঙ্গে দুর্নীতিবাজরা যেন জানে, দোষ করলে শাস্তি হবেই। বিশ্বের অনেক দেশ দুর্নীতি থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু তাদের শক্তিশালী আইন, স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থা এবং প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসনিক ব্যবস্থাই উন্নতির মডেল হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।

বাংলাদেশ চাইলেই পারে। আমাদের প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা। দুর্নীতি একটি জাতিকে শুধু অর্থনৈতিকভাবে নয়,  নৈতিকভাবেও ধ্বংস করে। একটি সৎ, জবাবদিহিমূলক, মানবিক প্রশাসন ছাড়া উন্নয়ন কখনোই টেকসই হতে পারে না। মানুষের আস্থা ফেরাতে হলে প্রশাসনের মনোভাব, সংস্কৃতি এবং কাঠামো বদলাতে হবে। যেদিন দেশের একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা আন্তরিকভাবে অনুভব করবেন ‘আমি জনগণের কর্মচারী, আমি সেবক’ সেদিন এই রাষ্ট্র পাল্টে যাবে। দুর্নীতি কমবে, ঘুষের সংস্কৃতি ভাঙবে, আর জনগণের আস্থা ফিরে আসবে রাষ্ট্রের প্রতি। একটি জবাবদিহিমূলক সৎ প্রশাসনই পারে, বাংলাদেশকে প্রকৃত উন্নয়ন, ন্যায় ও মানবিকতার পথে এগিয়ে নিতে। দেশের প্রকৃত সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে সেই দিন থেকে, যেদিন কর্মকর্তারা মনে করবেন সেবা দেওয়া তাদের দায়িত্ব, অধিকার নয়। সেদিন থেকে প্রশাসন নিয়ে কোনো ধরনের আপত্তিজনক শব্দ উচ্চারিত হবে না। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই, এমন পথে আসতে হবে।

লেখক : সমাজকর্মী ও কলাম লেখক

columnistazad@gmail.com