ভাসানী ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি: সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী 

প্রবীণ শিক্ষাবিদ ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, মওলানা ভাসানী ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করেননি। তিনি মন্ত্রী ও রাষ্ট্রদূত হতে চাননি, বরং মেহনতি মানুষের পাশে এবং তাদের মুক্তির সংগ্রামে আজীবন যুক্ত ছিলেন।

মঙ্গলবার (২৩ ডিসেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘বি-উপনিবেশায়ন ও মওলানা ভাসানী’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমরা বর্তমানে যে বিউপনিবেশিকরনের আলোচনা করছি সেখানে ভাসানীর বিশ্বাস প্রথম দিক থেকেই ছিল। এই উপমহাদেশে বিখ্যাত রাজনৈতিকরা জন্মগ্রহণ করলেও মওলানা ভাসানী ওই রকমের খ্যাতি পাননি। কিন্তু মওলানা তাদের থেকে স্বতন্ত্র ও অসাধারণ ছিলেন। ভাসানীর মতো মেহনতি মানুষের সমর্থনে রাজনীতি করার দ্বিতীয় মানুষ এই উপমহাদেশে আমরা দেখিনি।

সিরাজুল ইসলাম আরো বলেন, মওলানা ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে বিশ্বাস করতেন না বরং সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিলেন। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে ভাসানী কংগ্রেসে থাকলেও পুঁজিপতির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় তিনি কংগ্রেস ত্যাগ করেন। তার কল্পিত পাকিস্তান ছিল কায়েদে আজমের পুঁজিবাদী পাকিস্তানের বিপরীতে একটি গণতান্ত্রিক ও মুক্তির পাকিস্তান, যেখানে একাধিক জাতিসত্তার সমান অধিকার ও সুযোগ নিশ্চিত হবে এবং ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটবে। এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন দেখা যায় তার ২১ দফা, ১৪ দফা ও ১১ দফা কর্মসূচিতে, যেখানে নদী, পানি ও বন্যা সমস্যায় জনগণের পাশে থেকে।

তিনি আরো বলেন, পাকিস্তানকে তিনি বিভিন্ন জাতিসত্তার কারাগার হিসেবে দেখতেন এবং শুধু বাঙালির নয় পাঞ্জাবি, সিন্ধি, বেলুচ ও পাঠানসহ সব জাতিসত্তার মুক্তির কথা বলেছেন। এই কারণেই তাকে একটি নির্দিষ্ট পরিচয়ে নয়, বরং একজন সমাজ বিপ্লবী হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, মওলানা ভাসানী কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একটি নৈতিক কন্ঠস্বর ও বিবেক। তিনি বিশ্বাস করতেন ধর্ম মানুষের নৈতিক শক্তির উৎস হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা করা নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে সাম্য, ন্যায়বিচার এবং মানবিক মর্যাদায় হতে হবে মূল ব্যক্তি। এই দৃষ্টিভঙ্গি তাকে তার সময় অন্যান্য নেতার চেয়ে আলাদা করে তুলেছিল।

উপদেষ্টা আরো বলেন, ভাসানী বুঝেছিলেন রাজনৈতিক স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ যখন তা মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক মর্যাদা এবং আত্মসম্মান রক্ষা করতে পারে। এই নীতিগত অবস্থান থেকেই তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পাকিস্তানি শাসন ব্যবস্থার ভেতরে বৈষম্য অবিচার চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন। ভাসানী ক্ষমতার প্রশ্নে আপোষ করেনি।

সম্মেলনে আরো বক্তব্য দেন অধ্যাপক আহমেদ কামাল। মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন ইউনিভার্সিটি ব্রুনাই দারুস সালাম-এর সহযোগী অধ্যাপক ড. ইফতেখার ইকবাল। স্বাগত বক্তব্য দেন কারাস-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. আশফাক হোসেন।