বাড়ছে ঘন কুয়াশা, আরও ২-৩ দিন থাকার আশঙ্কা

দেশজুড়ে বাড়ছে ঘন কুয়াশার চাদরের পরিধি। এতে সূর্যের আলো প্রবেশ করতে পারছে না। ফলে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বাড়তে না পারার কারণে শীতের অনুভবতা বাড়ছে। ভারতের উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, উত্তরখণ্ড ও বিহার থেকে আসা কুয়াশার চাদর দেশের উত্তরবঙ্গ, সিলেট, ঢাকার উত্তরাংশ হয়ে কুমিল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। 

গত চার দিন ধরে অব্যাহত থাকা এই ঘন কুয়াশা আরও দুই থেকে তিন দিন থাকতে পারে বলে আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের ধারনা। এদিকে ঘন কুয়াশা বাড়লে মহাসড়কগুলোতে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

ঘন কুয়াশার পরিমাপ কি হতে পারে ?

কিভাবে আমরা বুঝবো ঘন কুয়াশা পড়ছে? এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর জানতে কথা হয় আবহাওয়াবিদদের সাথে। তাদের মতে, দৃষ্টি সীমার দূরত্বের উপর নির্ভর করে কুয়াশা ঘন না পাতলা হবে। সাধারণত দৃষ্টি সীমা (ভিজিবিলিটি) ১০০০ মিটার দূরত্ব পর্যন্ত দেখা গেলেই বিমান উঠা-নামার অনুমোদন পেয়ে থাকে। এর নিচে নামলেই বিমান উঠানামায় সমস্যা দেখা দেয়।

ভিজিবিলিটির উপাত্ত জানতে কথা হয় ঢাকা শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের আবহাওয়া স্টেশনের ইনচার্জ আতিকুর রহমানের সাথে।

তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এই মৌসুমে আজ বুধবার সকাল ৬টা ৩০ মিনিট থেকে ৯টা পর্যন্ত ভিজিবিলিটি ছিল ৮০০ মিটার। যদিও পরবর্তীতে বেলা বাড়ার সাথে সাথে ভিজিবিলিটি বেড়েছে।’

কুয়াশার কারণে বিমান ঢাকা বিমান বন্দরে না নেমে অন্য কোথাও নেমেছে কিনা জানতে চাইলে  তিনি বলেন, এ মৌসুমে এখন পর্যন্ত তা হয়নি। তবে আগামীতে ঘন কুয়াশা বাড়লে তা হতেও পারে। তবে এখন অনেক আধুনিক বিমান থাকে যেগুলো ৬০০ মিটার ভিজিবিলিটিতেও নামতে পারে।

কোথায় কতো ভিজিবিলিটি ?

দেশের ৬২টি আবহাওয়া স্টেশনে ভিজিবিলিটি উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়ে থাকে।

আবহাওয়াবিদরা জানান, দিনের সবচেয়ে বেশি কুয়াশা থাকে সূর্যোদয়ের সময়। এর কারণ জানতে চাইলে ঢাকা বিমান বন্দর আবহাওয়া স্টেশনের পূর্বাভাস কর্মকর্তা এস এইচ এম মোসাদ্দেক বলেন, ‘রাতের তিনটার পর থেকেই ঘন কুয়াশা বাড়তে থাকে। তবে এই কুয়াশার সাথে সূর্যোদয়ের সময় একটি লাভা যুক্ত হলে কুয়াশার ঘনত্ব দ্রুত বেড়ে যায়। এজন্য সূর্যোদয়ের আগ থেকে শুরু করে সকাল প্রায় ৯টা পর্যন্ত ঘন কুয়াশা বেশি থাকে।’

এ দিকে দেশের কুয়াশার ভিজিবিলিটি উপাত্ত নিয়ে থাকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৬২টি স্টেশনে। দেশের  বিভিন্ন এলাকায় থাকা এসব স্টেশন থেকে কি উপাত্ত পাওয়া গেছে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস কর্মকর্তা ও আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, বিকেলের তুলনায় সকালে ভিজিবিলিটি সবচেয়ে কম থাকে। উপাত্তে দেখা যায় গতকাল বুধবার সকাল ৬টায় পঞ্চঘরের তেঁতুলিয়ায় ও ময়মনসিংহে সবচেয়ে কম ভিজিবিলিটি ছিল। এই দুই স্থানে রেকর্ড হয়েছে মাত্র ২০০ মিটার। অর্থাৎ সকাল ৬টায় ২০০ মিটারের দূরে আর কিছু দেখা যায়নি।

তিনি আরও বলেন, এছাড়া একই সময়ে রাজশাহীর বদলগাছীতে ছিল ৪০০ মিটার, রংপুরে ৫০০ মিটার, যশোর ও সিলেটে ছিল ৬০০ মিটার এবং ঢাকায় ছিল ৩০০০ মিটার। এসব এলাকায় আবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে ভিজিবিলিটি অনেক বেড়ে গেছে।

কখন ঘন কুয়াশা হয় ?

ঢাকা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসা ছুটিতে ফরিদপুরে অবস্থান করছেন। কুয়াশার চিত্রের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভোর থেকে সকাল ৮-৯টা পর্যন্ত কুয়াশা থাকে।

তবে আজ বুধবার সূর্যের আলো কম পাওয়া গেছে। সেহিসেবে রাতের তাপমাত্রা আরও কমতে পারে এবং কুয়াশাও বাড়তে পারে।’ 

কুয়াশা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আবাহওয়াবিদ আতিকুর রহমান বলেন, সূর্য ডোবার পর থেকেই ধীরে ধীরে কুয়াশা বাড়তে থাকে। মধ্যরাতের পর এর পরিমাণ আরও বাড়ে এবং তা সকাল পর্যন্ত বহাল থাকে। ২৩ বছরের বেশি সময় ধরে ট্রেন পরিচালনা করে আসছেন সিনিয়র লোকো মাস্টার আবদুল আউয়াল রানা।

তিনি বলেন, ভোরের দিকে সবচেয়ে ঘন কুয়াশা বেশি দেখা যায়। আর রেলাইনের উপরে যেনো কুয়াশার পরিমাণ বেশি থাকে। এতে অনেকে রেল লাইনে বসে থাকলেও ট্রেন দেখতে পায় না  এবং ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুবরণের ঘটনা ঘটছে।

রেললাইন ও মহাসড়কে ঘন কুয়াশা প্রসঙ্গে আবহাওয়াবিদ এ কে এম নাজমুল হক বলেন, রেল লাইন বা মহাসড়কের উভয় পাশে গাছপালা থেকে। এসব গাছপালাও বায়ুমন্ডলে পানি ছেড়ে কুয়াশার ঘনত্ব বাড়িয়ে দেয়। আর একারণে পার্বত্য এলাকায় উপত্যকাগুলোকে কুয়াশার মতো মেঘ ভেসে থাকতে দেখা যায়।

ঘন কুয়শা কতদিন থাকবে ?

আমাদের দেশের এই ঘন কুয়াশা কিন্তু আমাদের নয়। এগুলো ভারতের উত্তরখণ্ড, উত্তর-পূর্ব ঝাড়খণ্ড, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি ও বিহার হয়ে আমাদের দেশে প্রবেশে করেছে বলে মন্তব্য করেন সাউথ এশিয়ান মেটিওরোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্ম সম্পাদক ড. মোহন কুমার দাশ।

তিনি বলেন, এই ঘন কুয়াশা আমাদের দেশের উত্তরবঙ্গ, সিলেট, ঢাকার উত্তরাংশ ও কুমিল্লা এলাকা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে গেছে। তবে তা বড়জোর দেশের মধ্যাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। এর বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। 

কবে নাগাদ এই ঘন কুয়াশা কেটে যেতে পারে জানতে চাইলে আবহাওয়া অধিদপ্তরের সিনিয়র আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, সাধারণত যেসব এলাকায় ঘন কুয়াশা রয়েছে সেসব এলাকায় যদি বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হয় কিংবা বাতাসের প্রবাহ বাড়ে তাহলে হয়তো এই ঘন কুয়াশা কেটে যেতে পারে। তবে এখনই ভারতীয় উপমহাদেশের কোথাও বৃষ্টি হওয়ার লক্ষণ নেই, কিন্তু বাতাসের প্রবাহ বাড়তে পারে। সে হিসাবে আগামী দুই থেকে তিন দিন ঘন কুয়াশা থাকতে পারে। 

চলতি মাসে হচ্ছে না শৈত্য প্রবাহসাধারণত কোনও এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলে ওই এলাকায় শৈত্য প্রবাহ বিরাজ করে। চলতি মাসে তেতুলিয়ায় বিক্ষিপ্তভাবে তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামলেও আশপাশের কোনও এলাকায় তাপমাত্রা কমেনি। তাই শৈত্যপ্রবাহ হয়নি। আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাসে চলতি মাসের শেষার্ধে এক বা দুটি মৃদু বা মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলে বলা হয়েছিল।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবহাওয়াবিদ বজলুর রশিদ বলেন, চলতি মাসে আর শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। তবে আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। 

উল্লেখ্য, কোনও অঞ্চলে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা যদি ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয়, তখন ওই এলাকায় মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যায়। আর যদি তাপমাত্রা ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হয় তখন ওই এলাকায় মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং কোনও এলাকায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৫ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। দেশে সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত শীতকাল হলেও জানুয়ারি মাস বছরের সবচেয়ে শীতলতম মাস। বছরের এ সময়ে তাপমাত্রা সবচেয়ে কম থাকে। এ সময়ে সাধারণত উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে শীতল বাতাস প্রবেশ করে থাকে।