মাদুরোর পতনই চূড়ান্ত লক্ষ্য?

লাতিন আমেরিকার রাজনীতিতে ভেনেজুয়েলা বহুদিন ধরেই এক অস্বস্তিকর নাম। তেলসমৃদ্ধ এই দেশটি একসময় ছিল মার্কিন প্রভাব বলয়ের তুলনামূলক স্থিতিশীল অংশ। কিন্তু হুগো শাভেজের উত্থানের পর থেকে, ভেনেজুয়েলা ধীরে ধীরে সেই বলয় থেকে সরে এসে নিজস্ব এক সমাজতান্ত্রিক পথ বেছে নেয়। শাভেজ পরবর্তী সময়ে নিকোলাস মাদুরোর নেতৃত্বে সেই পথ আরও কঠিন ও সংঘাতপূর্ণ হয়ে ওঠে। এমন প্রেক্ষাপটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমলে যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা সম্পর্ক কার্যত শীতল যুদ্ধের রূপ নেয়। প্রশ্ন উঠেছে, ভেনেজুয়েলার কাছে আসলে কী চায়  ট্রাম্প? প্রকাশ্যে বলা অভিযোগ আর আড়ালের ভূ-রাজনৈতিক লক্ষ্য কি এক? বাস্তবতা কী বলছে? সম্প্রতি ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা আবারও চরমে পৌঁছেছে। ট্রাম্প প্রশাসন প্রকাশ্যে মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে মাদক পাচার, চোরাকারবার এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষ এমনকি ভেনেজুয়েলার শীর্ষ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে পুরস্কার ঘোষণার মতো নজিরবিহীন পদক্ষেপও নিয়েছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করে, এই অভিযোগগুলো আসলে রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল। কারণ ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, অর্থনৈতিক বিপর্যয় ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতাকে কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটন বহুদিন ধরেই মাদুরো সরকারকে উৎখাত করতে চায়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের ভেনেজুয়েলা-বিরোধী অবস্থান কেবল কোনো একক ঘটনা বা আকস্মিক সিদ্ধান্ত নয়।  বরং এটি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের লাতিন আমেরিকা নীতির ধারাবাহিকতা। যুক্তরাষ্ট্র ঐতিহাসিকভাবেই এই অঞ্চলকে তার ‘ব্যাকইয়ার্ড’ হিসেবে দেখে এসেছে। কিউবার সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকে ওয়াশিংটনের কাছে লাতিন আমেরিকায় বামপন্থি সরকার মানেই, এক ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে সেই আশঙ্কা আরও গভীর। কারণ দেশটি শুধু বামপন্থি আদর্শেই বিশ্বাসী নয়, বরং রাশিয়া ও চীনের মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছে।

মাদুরো সরকার,  যুক্তরাষ্ট্রের চোখে মূলত তিনটি কারণে অগ্রহণযোগ্য। প্রথমত, এটি একটি সমাজতান্ত্রিক সরকার। যা মার্কিন পুঁজিবাদী ও উদার গণতান্ত্রিক আদর্শের সরাসরি বিরোধী। দ্বিতীয়ত, ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদ। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেল মজুদ থাকা সত্ত্বেও এই সম্পদের ওপর মার্কিন কোম্পানিগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেই। বরং রাষ্ট্রীয় মালিকানায় পরিচালিত পিডিভিএসএ ও রাশিয়া-চীনের সঙ্গে জ্বালানি সহযোগিতা যুক্তরাষ্ট্রকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। তৃতীয়ত, মাদুরো সরকারের রাজনৈতিক  বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ করে, ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরে সরকারবিরোধী শক্তিকে উসকে দেওয়ার সুযোগ ওয়াশিংটন বরাবরই খুঁজে এসেছে।  ট্রাম্প প্রশাসন এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক তিন ধরনের চাপই প্রয়োগ করেছে। একদিকে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি কার্যত পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে কূটনৈতিকভাবে দেশটিকে একঘরে করার চেষ্টা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে অনেক লাতিন আমেরিকান দেশ ও ইউরোপীয় মিত্ররা মাদুরো সরকারকে বৈধ সরকার হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এর পাশাপাশি ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেতা হুয়ান গুইদোকে ‘অন্তর্র্বর্তী প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে ওয়াশিংটন স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, মাদুরোকে তারা ক্ষমতায় দেখতে চায় না।

কেবল কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপেই সীমাবদ্ধ থাকেনি ট্রাম্প প্রশাসন। সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও মাদকবিরোধী যুদ্ধের নামে ক্যারিবীয় সাগর ও আশপাশের সমুদ্র অঞ্চলে মার্কিন নৌবাহিনীর তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছে, ভেনেজুয়েলার জলসীমা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক মাদক চক্র কার্যক্রম চালাচ্ছে, আর মাদুরো সরকার নাকি এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। এই অভিযোগকে সামনে রেখে মার্কিন বাহিনী ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জাহাজে তল্লাশি, এমনকি আক্রমণও চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ভেনেজুয়েলা একে সরাসরি সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার প্রতিক্রিয়াও এসেছে দ্রুত। যদিও দেশটির সামরিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত, তবুও মাদুরো সরকার সৈন্য মোতায়েন জোরদার করেছে এবং জাতীয় প্রতিরক্ষার কথা জোরালোভাবে উচ্চারণ করছে। ভেনিজুয়েলার রাজনৈতিক ভাষ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনকারী হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে, যা দেশটির অভ্যন্তরে জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দিতে সহায়ক। ‘যুদ্ধ লেগে যাবে লেগে যাবে’ এমন এক টানটান পরিস্থিতির কথা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও ঘুরেফিরে আসছে। এই উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে চীন ও রাশিয়ার অবস্থান। দুই দেশই প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়েছে যে তারা ভেনেজুয়েলার পাশে রয়েছে এবং প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। রাশিয়া ভেনেজুয়েলাকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে, যৌথ মহড়া করেছে, আর কূটনৈতিকভাবে মাদুরো সরকারের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। চীন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত কারণে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। বিশাল ঋণ, তেল বিনিময় চুক্তি এবং ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগের সম্ভাব্য সম্প্রসারণ সব মিলিয়ে ভেনেজুয়েলা বেইজিংয়ের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ভেনেজুয়েলা সংকট কেবল দ্বিপক্ষীয় বিরোধে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্রমেই বহুপাক্ষিক শক্তির সংঘাতে রূপ নিচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা, অন্যদিকে রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, এই মেরূকরণ বিশ্বরাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক একে লাতিন আমেরিকায় ‘প্রক্সি কনফ্লিক্ট’-এর সম্ভাব্য ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন, যেখানে সরাসরি যুদ্ধ না হলেও পরোক্ষ সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। তাহলে প্রশ্ন থাকে এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্প আসলে কী চান? সবচেয়ে সরল উত্তর হলো, মাদুরো সরকারের পতন। ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য ভেনেজুয়েলায় এমন একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করা, যা যুক্তরাষ্ট্রপন্থি হবে, পশ্চিমা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে এবং তেল ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদে মার্কিন প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করবে। মাদক ও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ মূলত এই রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য নৈতিক ও আইনি বৈধতা তৈরির হাতিয়ার।  তবে বিষয়টি এত সহজ নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিও এই নীতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে। ট্রাম্পের ভোটব্যাংকে লাতিন আমেরিকান অভিবাসী, বিশেষ করে কিউবান ও ভেনেজুয়েলান বংশোদ্ভূত জনগোষ্ঠীর একটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ।

সমাজতান্ত্রিক সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে ট্রাম্প নিজেকে ‘কমিউনিজমের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ’ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। ভেনেজুয়েলা ইস্যু তাই ট্রাম্পের কাছে কেবল পররাষ্ট্রনীতি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কৌশলের অংশ। অন্যদিকে, ভেনেজুয়েলার জনগণ এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েনের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সম্ভাব্য সামরিক সংঘাত দেশটির মানবিক পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। খাদ্য সংকট, ওষুধের অভাব, মুদ্রাস্ফীতি সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ। আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ঘুঁটি হয়ে ভেনেজুয়েলার মানুষ যেন হারিয়ে যাচ্ছে মূল আলোচনার বাইরে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সেখানে কি সত্যিই যুদ্ধ বাধবে? পূর্ণমাত্রার সামরিক সংঘাতের সম্ভাবনা এখনো তুলনামূলকভাবে কম, কারণ তার পরিণতি হবে ভয়াবহ ও অনিশ্চিত। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আক্রমণে গেলে রাশিয়া ও চীনের প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। আবার ভেনেজুয়েলার সামরিক দুর্বলতা সত্ত্বেও দীর্ঘমেয়াদি গেরিলা প্রতিরোধ বা আঞ্চলিক অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই সম্ভবত এই সংঘাত সীমিত সামরিক তৎপরতা, অর্থনৈতিক চাপ ও কূটনৈতিক লড়াইয়ের মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে।

আন্তর্জাতিক রাজনীতির ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রেও ভেনেজুয়েলা সংকট একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে। এটি দেখিয়ে দিচ্ছে যে, ঠা-া যুদ্ধ-পরবর্তী একমেরু বিশ্বব্যবস্থা আর আগের মতো নেই। যুক্তরাষ্ট্র এখনো শক্তিশালী, কিন্তু তার সিদ্ধান্ত এককভাবে বাস্তবায়ন করা আগের মতো সহজ নয়। রাশিয়া ও চীনের সক্রিয় উপস্থিতি বিশ্বরাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভেনেজুয়েলা সেই জটিলতার এক প্রতীকী মঞ্চ। তাই বলা যায়, ভেনেজুয়েলার কাছে ট্রাম্প যা চান, তা কেবল কোনো অপরাধ দমন বা সন্ত্রাসবিরোধী সাফল্য নয়। তিনি চান একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন, একটি আদর্শিক বিজয় এবং একটি কৌশলগত লাভ। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে ঝুঁকি যেমন রয়েছে, তেমনি মানবিক ও নৈতিক প্রশ্নও কম নয়। ভেনেজুয়েলা সংকট তাই শুধু লাতিন আমেরিকার সমস্যা নয়। এটি সমসাময়িক বিশ্বরাজনীতির শক্তির দ্বন্দ্ব আদর্শের সংঘাত এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

লেখক: শিক্ষক ও কলাম লেখক

sultanmh17@gmail.com