ভয়কে পুঁজি করে ক্ষমতা ধরে রাখার ভোট আয়োজন

পাঁচ বছর পর জাতীয় নির্বাচনের নামে আবার ভোটের আয়োজন করল মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। কিন্তু ২০২০ সালের নির্বাচনের যে উচ্ছ্বাস, অংশগ্রহণ আর উৎসবমুখর পরিবেশ দেশটি দেখেছিল, তার কোনো ছাপই নেই এবারের ভোটে। বরং আতঙ্ক, শূন্যতা আর ভয়ভিত্তিক উপস্থিতির মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে জান্তা আয়োজিত জাতীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপ। গণতন্ত্রের উৎসব যেখানে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখর থাকার কথা, সেখানে ভোটকেন্দ্রগুলো ছিল ফাঁকা। কোথাও কোথাও কেন্দ্রের আশপাশে নির্জনতা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে ভোটার উপস্থিতি চোখে পড়েনি বললেই চলে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ইরাবতী, বিবিসি ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—ভোট দিতে আসা মানুষদের বড় অংশই নিজের ইচ্ছায় নয়, বরং শাস্তির ভয় এড়াতে কেন্দ্রে হাজির হয়েছেন। পথে পথে ও ভোটকেন্দ্রের আশপাশে উর্দিবিহীন সেনাসদস্যদের মোতায়েন ছিল। কে ভোট দিচ্ছেন, কে দিচ্ছেন না—সেটি নজরদারির মধ্যেই ছিল ভোটগ্রহণ। সরকারি চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে ওপরের নির্দেশ মানা ছাড়া কোনো বিকল্প ছিল না। এককথায় বলা যায়, মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ভোটার হাজির করেছে জান্তা সরকার।

রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) মান্দালয় শহরের একটি কেন্দ্রে ভোট দেন ৪২ বছর বয়সি সরকারি কর্মচারী ওয়াই ইয়ান অং। তবে তার উপস্থিতি কোনো রাজনৈতিক পছন্দের বহিঃপ্রকাশ নয়। তিনি জানান, তার দপ্তর থেকে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে—কর্মীরা ভোট দিয়েছেন কি না, সেটি যাচাই করা হবে। জান্তার সম্ভাব্য শাস্তি এড়াতেই ভোট দিতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। ইয়ান অং বলেন, ‘আমার মতো মানুষের জন্য এটা আসলে কোনো পছন্দের বিষয় নয়।’

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এএফপি ও আল-জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, এই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করতে অনেক আগেই মাঠ প্রস্তুত করে রেখেছে সেনাবাহিনী। সরকারি চাপ, সার্বক্ষণিক নজরদারি, গ্রেপ্তার এবং শাস্তির ভয় ভোটারদের মানসিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলেছে। এতসব কৌশলের পরও ভোটার উপস্থিতি ছিল অত্যন্ত সীমিত—হাতে গোনা।

ভোটের ছয় মাস আগেই সারা দেশে ভয়ভীতি ছড়িয়ে দিতে ‘নির্বাচন সুরক্ষা আইন’ প্রণয়ন করে জান্তা সরকার। চলতি বছরের জুলাইয়ে পাস হওয়া এই আইনে নির্বাচন নিয়ে সমালোচনাকে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ভোটবিরোধী কোনো অবস্থান নিলে এক বছর থেকে শুরু করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ আইনের আওতায় ইতোমধ্যে ৩২৯ জনকে আটক করা হয়েছে। এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বেশির ভাগ মানুষই সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন।

অনেক অনুরোধের পর ইয়াঙ্গুন শহরের ৪১ বছর বয়সি খুচরা দোকানি নিলার নয়ে এএফপিকে বলেন, ‘না চাইলেও, সবাই জানে যে তাদের ভোট দিতে আসতেই হবে।’ তার ভাষ্য অনুযায়ী, বড় শহরগুলোতে ভোটের আগের রাতেই ভোটকেন্দ্রগুলো ঘিরে ফেলা হয়। স্টেশনগুলোতে রাতে কড়া পাহারা বসানো হয় এবং প্রতিটি কেন্দ্রের বাইরে নিরাপত্তাকর্মীদের পাশাপাশি সড়কের মোড়ে মোড়ে সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন থাকে।

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন ব্যবহার করেছে জান্তা সরকার। তবে এই ব্যবস্থায় ভোটারদের নিজের পছন্দ অনুযায়ী নাম লেখার সুযোগ নেই। এমনকি ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যালট বাতিল করার কোনো ব্যবস্থাও রাখা হয়নি। গৃহযুদ্ধ চলমান থাকা অবস্থায় শুরু হওয়া এই জাতীয় নির্বাচনের প্রথম ধাপের পর আগামী ১১ জানুয়ারি ও ২৫ জানুয়ারি আরও দুটি ধাপে ভোট গ্রহণের কথা রয়েছে। তবে ফল প্রকাশের নির্দিষ্ট কোনো সময়সূচি এখনো জানানো হয়নি।

২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নোবেলজয়ী অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করার পর এটিই প্রথম সাধারণ নির্বাচন। রোববার ভোর ৬টা থেকে শুরু হয়ে বিকাল ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের মতো বড় শহরগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে কম। যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের বড় অংশ মধ্যবয়সী ও প্রবীণ। তরুণ ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো কম। অনেকেই শুরুতে ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও জান্তার ভয়ে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত বদলাতে বাধ্য হন।

সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে ভোটে অংশগ্রহণ যাচাইয়ের কথা বলে প্রকাশ্যেই হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি টম অ্যান্ড্রুজ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই সামরিক-পরিচালিত নির্বাচন প্রত্যাখ্যানের আহ্বান জানান। চলমান ভোটের মধ্যেই তিনি বলেন, ‘জান্তা বেসামরিকদের ওপর বোমা ফেলছে, রাজনৈতিক নেতাদের কারাবন্দি করছে এবং সব ধরনের ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করেছে। তাদের আয়োজিত ভোট কোনো নির্বাচন নয়, এটি বন্দুকের মুখে মঞ্চস্থ এক প্রহসন।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ নয়, বরং দমন-পীড়ন ও বিভাজনকে দীর্ঘায়িত করবে।’

জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্কও একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, মিয়ানমারে মতপ্রকাশ, সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতার কোনো পরিবেশ নেই। তার ভাষায়, সাধারণ মানুষ দুই দিক থেকেই চাপে রয়েছে—একদিকে সেনাবাহিনী, অন্যদিকে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর ভোট বর্জনের হুমকি।

ইয়াঙ্গুনের একটি ভোটকেন্দ্রের চিত্র এই নির্বাচনের বাস্তবতা স্পষ্ট করে। সেখানে সারিতে দাঁড়িয়ে থাকা ভোটারদের বেশির ভাগই ছিলেন প্রবীণ। কোলে শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছু মা, বাজারের ঝুড়ি হাতে ছিলেন গৃহিণীরাও। তবে তরুণদের উপস্থিতি ছিল প্রায় নেই বললেই চলে। ওই কেন্দ্রে প্রায় ১ হাজার ৪০০ নিবন্ধিত ভোটারের মধ্যে ভোট দিয়েছেন মাত্র ৫০০ জন।

মান্দালয়ের এক যুবক বলেন, ‘যারা ভোট দিয়েছেন, তাদের মধ্যে বেশির ভাগই বৃদ্ধ। আমি মনে করি, কেউই এই বিশৃঙ্খলার সঙ্গে জড়াতে চান না। মানুষ হয়তো এই নির্বাচনের ন্যায্যতায় বিশ্বাস করে না।’

রাখাইন রাজ্যের ৩৫ বছর বয়সি কিয়াও মিন থেইনও একই সুরে বলেন, ‘আমি মনে করি, এই নির্বাচন ন্যায়সংগত নয়। যা মানুষের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হচ্ছে। কোনো পরিবর্তন হবে না। তারা শুধু সেনাদের পোশাক পালটে সাধারণ নাগরিকের পেশাকে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা চালাচ্ছে।’