বিলোপের বিরুদ্ধে অদম্য বিদ্রোহ

মানবসভ্যতা জ্ঞানের অনন্ত সাধনায় বিস্তৃত। জ্ঞান বিস্তৃতির অগ্রযাত্রাই তার অন্বেষণের চিরন্তন স্বাক্ষর। সেই জ্ঞান সূর্যোদয়ের পর একফোঁটা শিশিরবিন্দু মতো নয়। বিলোপের বিরুদ্ধে মানব মনের যে এক অদম্য বিদ্রোহ, যে এক গভীরতম অন্তর্ঘাত, তারই সুবিশাল, সুদীর্ঘ ও মহিমান্বিত রূপ হচ্ছে গ্রন্থাগার। গ্রন্থাগারের আরেক রূপ হিসেবে আমাদের অন্তর্দৃষ্টিতে ভেসে আসে প্রস্তরফলক, প্যাপিরাস কিংবা মুদ্রিত গ্রন্থের সংগ্রহালয়। গ্রন্থাগারের আরেক রূপ মৃত্যুঞ্জয়ী  চেতনার বিরুদ্ধে বিস্মৃতির নিরন্তর যুদ্ধ। গ্রন্থাগার মানেই, জানা-অজানার বীরত্বব্যঞ্জক সংগ্রহশালা। জ্ঞান মানেই, স্মৃতির সংকট থেকে উদ্ভূত স্মৃতিকে শৃঙ্খলিত করা, ধরিত্রীর গর্ভে প্রোথিত করা, কালের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করার চিরন্তন এক দুঃসাহসিক প্রয়াস। আর এই প্রয়াসের সর্বোচ্চ ও সর্বোৎকৃষ্ট সাংস্কৃতিক রূপ হচ্ছে গ্রন্থাগার। এই গ্রন্থাগার মানে শব্দের পিরামিড, চিন্তার মহাকাশসদৃশ গম্বুজ, বিস্মৃত-প্রায় মানবজাতির সম্মিলিত স্মৃতির মহাআলয়। এখানে শব্দরা খেলা করে, শব্দ সংরক্ষিত হয়, শব্দের পুনর্জন্ম হয় এখানে শব্দের চঞ্চলতা স্থির থাকে না। এর প্রতিটি সেলফ, ক্যাটালগ কার্ড, ডিজিটাল আর্কাইভ আসলে একেকটি সময়-পরিবহনের যন্ত্র। এই যন্ত্র অতীতকে বর্তমানের কাছে নিয়ে আসে। বর্তমানকে ভবিষ্যতের কাছে জামানত রাখে। এই যন্ত্র সভ্যতার হৃদস্পন্দন, জাতিস্মর চেতনার অক্সিজেন এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের অদৃশ্য ভিত্তিপ্রস্তর। গ্রন্থাগার এমনই এক অনন্য মানবসৃষ্ট অলৌকিক স্থান, যেখানে মৃত্যুঞ্জয়ী দার্শনিক, কবি, বৈজ্ঞানিক ও ঋষিরা নিঃশব্দে কথোপকথন চালিয়ে যান শতাব্দীর পর শতাব্দী।

মানুষ যখন প্রথম উপলব্ধি করল যে স্মৃতি নশ্বর, ভঙ্গুর, অস্থায়ী বা ক্ষণস্থায়ী, তখনই সে স্মৃতিকে স্থায়ী করার পথ খুঁজতে শুরু করে। সেই অনুসন্ধান থেকেই জন্ম নিয়েছিল লিখনপদ্ধতি। লিখনের প্রয়োজন থেকেই জন্ম নিল সংরক্ষণ। আর সংরক্ষণের ধারাবাহিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গ্রন্থাগার মানবসভ্যতার অপরিহার্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। টাইগ্রিস ও ইউফ্রেটিস নদীর মধ্যবর্তী মেসোপটেমিয়ার উর্বর ভূমিতে মানুষ প্রথম লিখনীর চিহ্ন সৃষ্টি করেছিল। সুমেরীয়রা পোড়ামাটির ফলকে কিউনিফর্ম লিপিতে লিখে রাখত অর্থনৈতিক হিসাব, সামাজিক চুক্তি এবং ধর্মীয় আচার। এই ফলকগুলোই ছিল মানব ইতিহাসের প্রথম নথিভাণ্ডার। তখনো কাগজ আবিষ্কৃত হয়নি। তবু জ্ঞান সংরক্ষণের তাগিদ থেমে থাকেনি। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ সহস্রাব্দেই বোঝা গিয়েছিল, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য জ্ঞান অপরিহার্য। এই উপলব্ধি থেকে গ্রন্থাগার ধীরে ধীরে ক্ষমতার অংশ হয়ে ওঠে। আসিরীয় রাজা আসুরবানিপাল নিনেভেহে বিশাল গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন। সেখানে সংরক্ষিত ছিল চিকিৎসাবিদ্যা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও আইনসংক্রান্ত হাজার হাজার নথি। প্রায় ত্রিশ হাজার কিউনিফর্ম ফলকের এই সংগ্রহ আধুনিক গবেষকদের কাছে অমূল্য ঐতিহাসিক উৎস। প্রাচীন বিশ্বেও যে জ্ঞানকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করত তাই দেখিয়ে গেছেন আসুরবানিপাল। আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার মানব ইতিহাসে এক ব্যতিক্রমী অধ্যায়। আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের স্বপ্ন ছিল এমন এক নগর গড়ে তোলা, যেখানে পৃথিবীর সমস্ত জ্ঞান একত্র হবে। তার মৃত্যুর পর টলেমীয় শাসকরা সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে উদ্যোগী হন। দার্শনিক দিমেত্রিয়াসের তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠা এই গ্রন্থাগারে গ্রিস, মিসর, পারস্য, ভারত ও ফিনিশিয়া থেকে পা-ুলিপি সংগ্রহ করা হয়। ঐতিহাসিকদের ধারণা, এখানে কয়েক লাখ গ্রন্থ সংরক্ষিত ছিল। নাট্যকার ঈসকাইলাস, সোফোক্লিস ও ইউরিপিদিসের রচনাসমূহ এখানেই সংরক্ষিত ছিল।

ভারতীয় উপমহাদেশে গ্রন্থাগার বিকাশের ইতিহাস ধর্ম ও শিক্ষার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বৌদ্ধ বিহারগুলো ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ‘ধর্মগঞ্জক’ ছিল সেই সময়ের অন্যতম বৃহৎ পুস্তকাগার। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং তার ভ্রমণকাহিনিতে নালন্দা গ্রন্থাগারের বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। তক্ষশিলার বিহারেও দর্শন ও বিজ্ঞানচর্চার জন্য পৃথক পাঠাগার ছিল। এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রমাণ করে যে উপমহাদেশে জ্ঞান সংরক্ষণের ঐতিহ্য অত্যন্ত প্রাচীন। ইসলামি সভ্যতায় গ্রন্থাগার একটি মৌলিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠে। বাগদাদের বায়তুল হিকমা ছিল অনুবাদ আন্দোলনের কেন্দ্র। গ্রিক দর্শন ও বিজ্ঞান আরবি ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপীয় নবজাগরণের ভিত্তি তৈরি করে। ইউনেস্কোর তথ্যমতে এই গ্রন্থাগারই বিশ্বের প্রাচীনতম সচল গ্রন্থাগার। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে এই গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠায় নারীদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। যা কিনা মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজের প্রগতিশীল চেতনার সাক্ষ্য বহন করে। বাংলায় উনিশ শতক ছিল বৌদ্ধিক জাগরণের যুগ। পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রভাবে গ্রন্থাগার গড়ে ওঠে সংগঠিতভাবে। ১৭৮৪ সালে এশিয়াটিক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গবেষণা ও গ্রন্থ সংরক্ষণের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। রাজা রামমোহন রায় ও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর গ্রন্থাগারকে গণশিক্ষার হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন। ১৮৩৬ সালে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠা ছিল এই ধারার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই লাইব্রেরিই ছিল উপমহাদেশের প্রথম গণগ্রন্থাগার।

বাংলাদেশের মাটি ও মানসে গ্রন্থাগার মানে মুক্তচেতনার অস্ত্রাগার, ভাষা আন্দোলনের সক্রিয় মঞ্চ এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের নীরব ও বলিষ্ঠ সহযোদ্ধা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, বাংলা একাডেমির সংগ্রহশালা বা রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর, প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আমাদের জাতীয় সত্তার স্তরসঞ্চয়কে ধারণ করে রেখেছে অত্যন্ত যতেœ। বাংলাদেশে গ্রন্থাগারের বিবর্তন মূলত একটি দ্বিবিধ ধারায় প্রবাহিত। একদিকে রয়েছে প্রাচীন পা-ুলিপির সংরক্ষণ। যেখানে চট্টগ্রামের বৌদ্ধ বিহার বা সিলেটের দরগাহে রক্ষিত ফারসি ও সংস্কৃত পা-ুলিপিগুলো ইতিহাসের নিঃশ্বাসকে আজও জীবন্ত রাখে। বর্তমানে ডিজিটাল বিভাজনের যুগে বাংলাদেশের গ্রন্থাগারগুলো এক চ্যালেঞ্জিং পর্যায় অতিক্রম করছে। ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ এর স্বপ্নের অংশ হিসেবে জাতীয় গ্রন্থাগারে আর্কাইভ ডিজিটাইজেশনের কাজ যেমন আশার সঞ্চার করে, তেমনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের বহু গ্রন্থাগার আজও চরম অবহেলা, অর্থাভাব ও পাঠকশূন্যতার কঠিন বাস্তবতায় ধুঁকছে। তবুও আশার কথা, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু যুব-উদ্যোগ, সাহিত্য ক্যাফে ও কমিউনিটি লাইব্রেরি একটি নতুন সংস্কৃতিচর্চার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠছে। যা প্রমাণ করে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম জ্ঞানের এই ঐতিহ্যবাহী ভাণ্ডারকে অকার্যকর হতে দিতে রাজি নয়।

লেখক : শিক্ষক, গবেষক ও সংগঠক

khandaker.apon@gmail.com