নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে আছে গুলশানের বাসা ‘ফিরোজা’। এই বাড়িতেই থাকতেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া।
২০১০ সালের ১৩ নভেম্বর সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল রোডের বাড়ি থেকে উৎখাত করা হয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে। ঢাকা সেনানিবাসে শহীদ মইনুল সড়কের যে বাসাটিতে জিয়াউর রহমান সেনা প্রধান হিসেবে ছিলেন, যে বাসাটিতে রাষ্ট্রপতি হিসেবে ছিলেন তার মৃত্যুর পর ওই বাসাটি ছিল খালেদা জিয়ার একমাত্র ঠিকানা।
কিন্তু ওয়ান ইলেভেন বা ১/১১’র পরে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হাসিনা ক্ষমতা আসার পর এই বাসা থেকে উচ্ছেদ হন খালেদা জিয়া। এরপর গুলশানের এই বাসা ‘ফিরোজা‘ ভাড়া করা হয় বিএনপি চেয়ারপারসনের জন্য।
২০১৮ সালে এই বাসা থেকে পুরান ঢাকার আদালতে গিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলা রায়ে সরাসরি কারাগারে যান খালেদা জিয়া।
করোনা প্রাদুর্ভাবের সময়ে শেখ হাসিনার সরকার বিশেষ শর্তে সাময়িক মুক্তি দিলে হাসপাতাল থেকে ফিরোজাতেই উঠেন বিএনপি চেয়ারপারসন।
ফিরোজার নিরাপত্তা কর্মীরা এখনো পাহারা দিচ্ছেন বাড়িটি। প্রহরী ছাউনি রয়েছে ঠিক আগের মতই। কিন্তু পুরো এলাকা নীরব-নিস্তব্ধ।
বিএনপি মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের অনেক স্মৃতি এই বাসায় জড়িয়ে আছে, যারা বাড়ির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত তাদের আবেগ-অনুভূতিও রয়েছে উনাকে ঘিরে।
তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আছে যারা দীর্ঘ ৪০ বছরের বেশি সময়ে বিশেষ করে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্যারের ঢাকা সেনানিবাসের বাসভবনে ভালোবাসার পরশ নিয়ে এখনো আছেন ফিরোজার চারপাশে।
চেয়ারপারসনের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে আমিও সেই অনুভূতিটা উপলব্ধি করছি যা ভাষায় প্রকাশ করা এই মুহূর্তে মানসিকতা আমার নেই। সত্যিই এই বাসা যেন ম্যাডামকে এখন দেখি জীবন্ত ম্যাডাম হিসেবে।
বিএনপি চেয়ারপারসনের সিকিউরিটি ফোর্সের (সিএসএফ) একজন সদস্য বলেন, ম্যাডামের ডিউটি করতাম।
আজকে ম্যাডাম নেই, পুরো বাড়িটাই খালি। বাড়ির ভেতরে ঢুকলে কেমন জানি একটা শূন্যতা, কেমন জানি একটা নিস্তব্ধতা কানে আসে। ভাই এই কষ্ট ও বেদনার কথার বলার ভাষা নেই। দোয়া করি, আল্লাহ যেন ম্যাডামকে ভালো রাখেন পরপারে।
আরেক নিরাপত্তা কর্মী বলেন, ম্যাডাম সব সময় আমাদের খোঁজ-খবর রাখতেন। বিকাল অথবা দুপুরে খবর নিতেন আমরা ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করছি কিনা। ‘‘উনি ছিলেন আমাদের প্রাণের মা।”
ফিরোজায় দায়িত্বপালনরত নিরাপত্তার কর্মীরা বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেছে। তাদের চোখে-মুখে শোকের ছায়া ফুটে উঠেছে।
‘চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকের ছায়া’
গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে কালো পতাকা উড়ছে। বিএনপির পতাকা এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়েছে। এখানে শোক বই খোলা হয়েছে। বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, রাজনীতিবিদরা আসছেন তাদের শোক জানাতে।
আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) সমাজ কল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুর্শিদ, যুক্তরাষ্ট্রের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন, ইরানের রাষ্ট্রদূত মনসুর চাভুশি, ছারছীনা দরবার শরীফের পীর মাওলানা মুফতি শাহ আবু নছর নেছার উদ্দিন আহমেদ, জাতীয় পার্টির মহাসচিব শামীম হায়দার পাটোয়ারি।
গুলশানে চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা গেছে, কার্যালয়ের বাইরে নেতা-কর্মী ও গণমাধ্যম কর্মীদের ভিড়। যারা শোক বইতে স্বাক্ষর করতে যাবেন তাদের প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে।
রাস্তার দুই ধারেই কর্মীরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। বনানী যুবদলের কর্মী আলতাফ হোসেন বলেন, নেত্রী নাই, মনটা ভালো নেই। কতদিন এই নেত্রীর দূর থেকে দেখে নিজে শক্তি সঞ্চয় করেছি, শত নিপীড়ন-নির্যাতনের মধ্যে আশা দেখেছি সেই নেত্রী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন এই শোক কীভাবে কাটাব জানি না।
কৃষক দলের সহ-সভাপতি ভিপি ইব্রাহিম বলেন, ম্যাডামের চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই আল্লাহর হুকুম। তবে একটা ঠিক বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের ম্যাডামের জনপ্রিয়তার রেকর্ড কেউ ভঙ্গ করতে পারবে না। তিনি চলে গেছেন ঠিকই তবে তিনি আমাদের মনের ভেতরে থাকবেন চিরঞ্জীব হয়ে সবসময় প্রতিক্ষণে।
গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানী এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গতকাল বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) মানিক মিয়া এভিনিউতে তার নামাজে জানাজার পর দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের কবরের পাশেই খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সমাহিত করা হয়েছে।