গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একটি দেশে জাতীয় নির্বাচন হচ্ছে রাজনৈতিক ধারাবাহিক বিশ^াসের যাত্রা। আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক উপায়ে স্বৈরাচারী ক্ষমতার পালাবদলের উপায় হচ্ছে গণআন্দোলন যা ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল ৮ আগস্ট। কিন্তু বছর হিসাবে আমরা পা দিয়েছি দুইয়ে। চলতি বছরের ৮ আগস্ট পূর্ণ হবে দ্বিতীয় বছর। দেশ-বিদেশে একটি সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বিবেচিত হয় সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে। এ বছরে বাংলাদেশসহ বিশে^র প্রায় ১৬০ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নির্ধারিত হবে। এই নির্বাচনই বৈশি^ক জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশকে সরাসরি প্রভাবিত করবে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব নির্বাচনের ফলাফল শুধু অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণে নয় বরং অর্থনৈতিক কৌশল, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক জোট-কূটনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলবে। একই সঙ্গে আমাদের দেশে নির্বাচনের সঙ্গে রয়েছে গণভোট। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে সামাজিক, রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অস্থিরতা হ্রাস পেয়ে, স্থিতিশীল বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে না আনতে পারা, সীমান্তে অস্ত্র কারবারিদের অবাধ বিচরণ এবং বহুবিধ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এখনো রয়েছে।
নির্বাচিত সরকারের জন্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতি কঠিন। তবে এই কঠিনের মধ্যেও আশা নিয়ে আগামীতে নির্বাচিত সরকার অর্থনীতিতে পুনর্জাগরণের ঢেউ আনতে সক্ষম হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। কিন্তু তার আগে, স্থিতিশীল ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে নতুন বছরের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিগত সময়ে রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও প্রতিহিংসার যে বিষবাষ্প ছড়িয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সবার জন্য সম্প্রীতির বাংলাদেশ ও সহাবস্থানের রাজনীতির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে। যে কারণে অনেকে বলছেন, দেশের ইতিহাসে নতুন বছর বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার বছর। বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচন আদায় করা সম্ভব হলে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সহজ হবে।’ এ বছরই নতুন রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার বছর। সেই সরকারের ওপর মানুষের আকাক্সক্ষার চাপ থাকবে। এগুলো রাজনৈতিক উপায়ে মোকাবিলা করতে হবে। বিনিয়োগের জন্য নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য। প্রশাসন এটি দিতে ব্যর্থ হওয়ায় উদ্যোক্তারা ঝুঁকি নিতে পারেননি। নির্বাচিত সরকার উদ্যোক্তাদের ভরসা দিতে পারবে। তবে সরকারি কর্তাদের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নয়নে আন্তরিক ও সক্ষম হতে হবে।
২০২৬ সালে নির্বাচিত সরকারের সময় বিনিয়োগ পুনর্জাগরণের প্রক্রিয়া স্বাভাবিক গতিতে এগোবে। অন্যদিকে ‘বৈদেশিক নীতি’ নতুন বছরে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দেবে। যে কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক রাশেদুজ্জামান বলছেন, ‘নতুন বছরে কূটনৈতিক সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠে পরস্পরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বাসের সম্পর্ক সৃষ্টি করতে হবে।’ সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলছেন, ‘নতুন বছরের নতুন চ্যালেঞ্জ হলো একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। গণতন্ত্রে উত্তরণ ও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের মূলোৎপাটন করা।’ সত্যিকার অর্থে, দেশ এখন নির্বাচনমুখী। সুতরাং নির্বাচিত সরকার বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং গঠনমূলক রাজনৈতিক চর্চার পথকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে সক্ষম হবে। যতই চ্যালেঞ্জ থাকুক, নির্বাচন এবং গণভোট আয়োজনের পথে সব প্রতিকূলতা ডিঙিয়ে আমরা একটি স্থিতিশীল রাজনৈতিক পথে হাঁটব এটাই সবার চাওয়া।